ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্রে তটস্থ সৌদি আরব। বিপুল অর্থ ও সামরিক শক্তিও তেমন কাজে না আসায় দেশটি অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছে। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশটির অর্থনীতি। এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দুটি দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসর পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। এতে যুদ্ধ নতুন মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে হুতিবিরোধী সরকারি বাহিনীর অর্থায়ন আবার শুরু করতে সম্মত হয়েছে আরব আমিরাত। অন্যদিকে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে দেশটিকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। এজন্য দেশটির পার্লামেন্টে জরুরি অধিবেশন আহ্বানের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: হুতিকে সাবমেরিনে করে অস্ত্র দিচ্ছে ইরান
এসব তৎপরতা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। সৌদি আরবের ভূখণ্ডে হামলা, এডেনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপত্তা-উদ্বেগ পুরো সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে সৌদি আরব, আমিরাত ও মিসরের তৎপরতা একই ধরনের নয়। আমিরাতের সম্ভাব্য ভূমিকা মূলত ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের হুতিবিরোধী বাহিনীকে সহায়তা করা; সৌদি আরবের ভূমিকা সামরিক অভিযান ও বিমান সহায়তা; আর মিসর আপাতত সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষায় সহযোগিতার কথা বলছে। এই তিন দেশের অবস্থান কতটা সমন্বিত হবে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ।
সৌদি আরবে হামলা, বাড়ছে নিরাপত্তা-উদ্বেগ
সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলা এই নতুন সমীকরণের প্রধান কারণ। শনিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, রিয়াদ, পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চারটি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে। রোববারও সৌদি জোট দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে।
এর আগে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করেও হামলা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিমানবন্দরে হামলায় প্রাণহানি ও বহু মানুষের আহত হওয়ার খবর এসেছে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বারবার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করা এখন বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেনের সংঘাতও নতুন করে তীব্র হয়েছে। গত জুলাইয়ে যুদ্ধ আবার জোরালো হওয়ার পর হুতিরা সৌদি আরবের ওপর হামলা বাড়িয়েছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল পুনর্দখলের চেষ্টা করছে। কিন্তু সামরিক শক্তি ও বিমান হামলার পরও হুতিদের অবস্থান দুর্বল করা সহজ হচ্ছে না।
আমিরাতের ঘোষণা কি যুদ্ধে নতুন মাত্রা দেবে?
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে হুতিবিরোধী বাহিনীকে অর্থায়নের বিষয়ে আমিরাতের সম্মতি সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। দুই দেশই ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করলেও দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো ও দক্ষিণাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ রয়েছে।
আমিরাত আগে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন দিয়েছে। এর মধ্যে ‘জায়ান্ট ব্রিগেডস’ হুতিবিরোধী লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু গত জানুয়ারিতে ইয়েমেনে আমিরাতের সামরিক উপস্থিতি ও সহায়তা প্রত্যাহারের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সৌদি আরব ও আমিরাতের বিরোধের কেন্দ্রে ছিল দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোর ভূমিকা এবং তাদের স্বাধীনতার দাবি। দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সহযোগিতায় আমিরাতের অর্থায়নের বিপরীতে সৌদি আরবের বিমান সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতাকে দুই দেশের সব মতবিরোধের অবসান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটের দাবি তুলেছে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ ইয়েমেন আলাদা রাষ্ট্র ছিল। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সেই পুরোনো সীমান্ত পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকলেও সৌদি আরব ও আমিরাত এ দাবির বিষয়ে এখনো স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি।
এসটিসির নেতা আইদারুস আল-জুবাইদির সঙ্গে সৌদি কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ না থাকার বিষয়টিও পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে। গত জানুয়ারিতে দক্ষিণাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ও স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি আবুধাবিতে চলে যান। এরপর এসটিসির জন্য পাঠানো আমিরাতের অস্ত্রের চালানে সৌদি হামলার খবর দুই দেশের বিরোধ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এখন হুতিদের অগ্রগতি ঠেকাতে দুই দেশ কাছাকাছি এলেও দক্ষিণ ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের অবস্থান কতটা মিলবে, তা স্পষ্ট নয়। ফলে সামরিক সহযোগিতা বাড়লেও রাজনৈতিক বিরোধ আবার মাথাচাড়া দিতে পারে।
মিসর কী ধরনের সহায়তা দিতে পারে?
সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বলেছেন, দেশটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কায়রো প্রস্তুত। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, মিসরের উদ্দেশ্য কাউকে আক্রমণ করা বা নতুন যুদ্ধে জড়ানো নয়; সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সহায়তা করাই লক্ষ্য।
এ জন্য পার্লামেন্টে জরুরি অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে। সৌদি আরব সহায়তা চাইলে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমোদন পেতে চান আল-সিসি। রোববার মিসরের জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদও সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা, সম্পদ ও ইসলামি পবিত্র স্থান রক্ষায় দেশটির পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, মিসরের সহায়তা সরাসরি ইয়েমেনের সম্মুখযুদ্ধে সেনা পাঠানোর পরিবর্তে আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো ক্ষেত্রে সীমিত থাকতে পারে। তবে ঠিক কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
আরও পড়ুন: সৌদিকে সামরিক সহায়তা দিতে প্রস্তত মিসর
মিসরের এই অবস্থানের পেছনে নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। সৌদি আরব মিসরের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার এবং দেশটিতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক মিসরীয় নাগরিকের পাঠানো অর্থ কায়রোর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অস্থিরতা মিসরের সুয়েজ খালের আয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। হুতিদের হামলার কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পাশাপাশি মিসরের রাজস্বও চাপে পড়বে।
তবে ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে মিসরের অতীত অভিজ্ঞতা সতর্ক থাকার কারণ জোগায়। ষাটের দশকে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে মিসরের সেনা অংশ নিয়েছিল; সেই অভিযান দেশটির জন্য ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তাই এবার সৌদি আরবকে সহায়তা করলেও দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চাইতে পারে কায়রো।
যুদ্ধের কেন্দ্র এখনো ইয়েমেন
সৌদি আরবের নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি ইয়েমেনের ভেতরেও লড়াই চলছে। এডেনভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার রাজধানী সানা থেকে হুতিদের হটাতে পাল্টা অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। তবে মারিবের কাছে মাজজার ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে সরকারি বাহিনীর অগ্রগতি এখন পর্যন্ত সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এডেনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইয়েমেন সরকার হুতিদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং এডেন বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে হুতিরা তাইজ ও মারিবের মতো কৌশলগত শহরগুলোর দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। এসব শহর নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে ইয়েমেনের সামরিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
এ সংঘাতের প্রভাব শুধু যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ। সেখানে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাহাজ চলাচল, জ্বালানি পরিবহন ও বিশ্ববাজারে পণ্যের সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে দুই লাখের বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও আল-জাজিরা
জেবি




