বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয়েও হুথিদের হামলা ঠেকাতে কেন ব্যর্থ সৌদি আরব?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম

শেয়ার করুন:

বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয়েও হুথিদের হামলা ঠেকাতে কেন ব্যর্থ সৌদি আরব?

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি সৌদি আরব। প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ বিনিয়োগ, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহ এবং শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না দেশটি। বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার, পাইপলাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখনো হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুল সামরিক ব্যয়ের পরও কেন সৌদি আরব তার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখতে পারছে না?

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতির পেছনের কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

স্টকহোমভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) হিসাব অনুযায়ী, গত বছর সৌদি আরব প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। এই বিপুল ব্যয়ের কারণে সামরিক খাতে বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যয়কারী ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে দেশটি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে সৌদি আরব। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ও থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য থেকেও উন্নত অস্ত্র কিনেছে রিয়াদ।

কিন্তু অত্যাধুনিক অস্ত্রের উপস্থিতি থাকলেই যে প্রতিটি হামলা প্রতিহত করা সম্ভব, সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা তার বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। গত এক সপ্তাহে রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আবারও সামনে এনেছে।

এর একটি বড় কারণ সৌদি আরবের বিশাল ভূখণ্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বিস্তৃতি। যুক্তরাষ্ট্রের আয়তনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত দেশটিকে একসঙ্গে একাধিক দিক থেকে আসা হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

পূর্ব দিকে ইরান, উত্তর দিকে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং দক্ষিণে ইয়েমেনভিত্তিক হুথিরা সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। চলতি বছরের সবচেয়ে তীব্র আঞ্চলিক সংঘাতের সময় ইরান সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল। ইরাকের ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকায় গোপন ঘাঁটি ও চলমান উৎক্ষেপণব্যবস্থা ব্যবহার করে হুথিরা দক্ষিণ দিক থেকে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর নিয়ে কাজ করা ওয়েবসাইট ভিশন২০৩০ ডট এআইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশটিকে সুরক্ষিত রাখার অর্থ কেবল রাজধানী রিয়াদ বা কোনো একটি তেল শোধনাগার রক্ষা করা নয়। বরং বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো, বিমানবন্দর ও অন্যান্য সম্পদকে একই সঙ্গে সুরক্ষা দিতে হয়।

এ ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আকাশপথে আসা হুমকি শনাক্ত করতে হয়, কোন লক্ষ্যবস্তুতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা নির্ধারণ করতে হয় এবং প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে হয়। এতগুলো কাজ একসঙ্গে সম্পন্ন করা অত্যন্ত জটিল।

সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও সব হামলা প্রতিহত করা যাচ্ছে না। দেশটির এক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকায় কোথায় কতটা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েন করা হবে, তা নির্ধারণ করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

সৌদিতে টানা তৃতীয় দিন হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত হামলায় বাড়ছে চ্যালেঞ্জ

হুথিদের হামলার কৌশল সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ভেদ করার চেষ্টা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত হামলাপদ্ধতির সঙ্গে এই কৌশলের মিল রয়েছে। রাশিয়াও বিভিন্ন সময়ে ইউক্রেনের লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করেছে।

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত তুলনামূলক নিচু দিয়ে উড়তে পারে। ফলে রাডারে এগুলো শনাক্ত করা এবং গতিপথ পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে হুথিরা নতুন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করছে, যেগুলো উড্ডয়নের সময় দিক পরিবর্তন করতে পারে।

বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র একযোগে ব্যবহার করা হলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে একসঙ্গে একাধিক গতিপথ, উচ্চতা ও গতির হুমকি মোকাবিলা করতে হয়। ফলে একটি মাত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সব ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা কঠিন।

তবে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা শুধু তাদের নিজস্ব প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ইয়েমেনে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তির উপস্থিতির কথা একাধিকবার উল্লেখ করেছে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা।

প্রায় আট বছর আগে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ইয়েমেনে এমন ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ, সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন খুঁজে পেয়েছিলেন, যেগুলোর উৎস ইরান বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। দুই বছর আগে একই বিশেষজ্ঞ দল জানায়, অর্থায়ন, যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে বাইরের সহায়তার মাত্রা ও পরিধি ছিল নজিরবিহীন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের ব্যবহৃত সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে হাতেম-২ ও ফিলিস্তিন-২-এর নকশায় ইরানি অস্ত্রের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে। এগুলো দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তৈরি।

এর আগে গত বছর হুথিদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অতিক্রম করে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হানে। এ ঘটনায় বিশ্লেষক আমির বার শালম সিএনএনকে বলেছিলেন, প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূর থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রের এত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানো বিস্ময়কর।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আল-নাজিলির দাবি, হুথিরা ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষার প্রযুক্তিও পরিবর্তন ও উন্নত করেছে, যাতে বিমান ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্য করে আঘাত হানা যায়। গত মাসে তিনি জানান, এসব ক্ষেপণাস্ত্র ২৫ মিনিট পর্যন্ত আকাশে ঘোরাফেরা করতে পারে এবং তাপ শনাক্তকারী প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত হয়।

ইরানের আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হুথিরা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে আছে। হিজবুল্লাহ, হামাস ও ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়ার সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হুথিরা নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।

তেহরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতেও হুথিরা প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিল। তবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থও রয়েছে।

২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘ সাত বছরের সংঘাতে ইয়েমেনের হুতিনিয়ন্ত্রিত এলাকায় ব্যাপক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। এরপরও অর্থনৈতিক ও পরিবহনসংক্রান্ত অবরোধের চাপ থেকে তারা পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি।

এই প্রেক্ষাপটে গত জুলাইয়ে হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলার ঘোষণা দেয়। এরপর সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়। প্রথম দিকে লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরামকোর একটি তেল শোধনাগার লক্ষ্যবস্তু হয়। পরবর্তী সময়ে সৌদি বিমানঘাঁটিগুলোতেও হামলা চালানো হয়।

হুতিদের দাবি, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তা দিয়ে সৌদি আরব যে বিমান অভিযান চালাচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে রিয়াদের কাছ থেকে বিপুল অর্থও দাবি করছে তারা।

সংঘাত প্রশমনে ইরান সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। গত সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু করতে প্রয়োজনীয় যেকোনো সহায়তা দিতে তেহরান প্রস্তুত।

তবে হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি দাবি করেছেন, সৌদি আরব মধ্যস্থতার প্রস্তাব মেনে নিলেও হুথিরা দুই সপ্তাহ ও এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

আল-বুখাইতির ভাষ্য, বর্তমান সংঘাত আগের লড়াইগুলোর মতো নয়। প্রতিদিন যুদ্ধের পরিধি ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে পারে। ফলে এখন যে সমঝোতা সম্ভব, পরিস্থিতি আরও জটিল হলে তা অর্জন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

sa

বেসামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ

হুতিদের সঙ্গে সংঘাত বাড়লেও সৌদি আরব স্বাভাবিক পরিস্থিতির ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। তবে রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার আগের সপ্তাহে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সতর্কবার্তা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল।

সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা রিয়াদের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, পরে আবার সতর্কবার্তা পাঠানো শুরু হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, গত সোমবার তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে।

রিয়াদে বসবাসকারী এক প্রবাসী জানান, চলতি সপ্তাহে তার সন্তানেরা বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছে। বিমানবন্দরে হামলার আগের দিনগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা না পাওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ ছিলেন। সোমবারের মধ্যে অবশ্য ফোনে সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে আসতে শুরু করে। বিমানবন্দরে হামলার পর সপ্তাহান্তজুড়ে কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়েও তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

নিরাপত্তার পাশাপাশি সৌদি আরবের সামনে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিমানবন্দরে হামলায় এক ডজনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পর হুথিদের সঙ্গে সমঝোতা করা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, পাল্টা বিমান হামলা আরও জোরদার করলে হুথিরা নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে পারে।

এই পরিস্থিতি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তার লক্ষ্য সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পর্যটনের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা।

কিন্তু এই পরিকল্পনার ভিত্তি শুধু তেলশিল্প নয়। ডেটা সেন্টার, পানি শোধনাগার, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। এসব স্থাপনা হামলার ঝুঁকিতে থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, প্রযুক্তিগত সম্প্রসারণ এবং পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

চলতি মাসের শেষ দিকে রিয়াদে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে সৌদি যুবরাজের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তুলে ধরার কথা রয়েছে। এমন সময়ে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এরই মধ্যে রিয়াদে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কংগ্রেস থেকে আন্তর্জাতিক কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান সরে দাঁড়িয়েছে।

রিয়াদের পর এবার দাম্মামেও হুতির হামলা

স্থলযুদ্ধে হুথিদের পরাজিত করাও কঠিন

শুধু বিমান হামলা চালিয়ে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একইভাবে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীর স্থল অভিযানেও তাদের পরাজিত করার সম্ভাবনা সীমিত।

হুথিরা দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, সংগঠিত এবং ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে ভালোভাবে জানে। গত মাসে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্র হুথিদের বিরুদ্ধে সাত সপ্তাহের বিমান অভিযানে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছিল। অভিযানের পর হুথিরা লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলা না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু এত ব্যয়বহুল সামরিক পদক্ষেপের পরও তাদের সামগ্রিক অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বদলানো যায়নি। উল্টো তারা কয়েকটি অত্যাধুনিক মার্কিন রিপার ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় হুথিদের কয়েকজন কমান্ডার ও প্রযুক্তিবিদ নিহত হলেও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।

প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার সশস্ত্র সদস্য নিয়ে হুথিরা এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের গত সোমবারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, তারা ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা তৃতীয় বৃহত্তম শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ও যোগাযোগকেন্দ্র তাইজ ঘিরে ফেলেছে।

এতে স্পষ্ট হচ্ছে, হুথিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবকে শুধু আকাশ প্রতিরক্ষার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। সামরিক সক্ষমতা, ভূপ্রকৃতি, সরবরাহব্যবস্থা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

নজিরবিহীন সংকটে সৌদি, কাজে আসছে না ৮৩ বিলিয়ন ডলারের সামরিক বাহিনী

আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইলেও অস্ত্রের সংকট বড় বাধা

হুথিদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা জোরদার করতে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আঞ্চলিক মিত্ররা প্রতিরক্ষামূলক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। সৌদি আরবকে সহায়তা করতে পাকিস্তান হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছে এবং মিসরও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে আরও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে পারে রিয়াদ। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের শুরুতে ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় নতুন সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।

তবে এখানে একটি বড় সমস্যা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরও উন্নত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও কৌশলগত অস্ত্রের ঘাটতি রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কৌশলগত অস্ত্রের মজুত কমিয়ে দিয়েছে এবং দ্রুত পুনরায় অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্প খাতের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সৌদি আরবের জন্য অনুকূল নয়। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নন। তিনি হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন হামলার সম্ভাবনা নাকচ করেননি, তবে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতিও দেননি।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মাইকেল র‍্যাটনির মতে, সংঘাতে জড়ানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনীহা থেকে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশটি তার অংশীদারকে একা ছেড়ে দিয়েছে।

রিয়াদে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত র‍্যাটনি বিমানবন্দরে হামলার আগেই এক লেখায় বলেছিলেন, সৌদি আরব হামলার মুখে পড়েছে এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে দেশটিকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। তবে শেষ পর্যন্ত সংঘাত কমাতে কূটনীতির পথেই ফিরতে হবে, সেই কূটনীতি যতই অসম্পূর্ণ বা অসন্তোষজনক হোক না কেন।

রিয়াদ বিমানবন্দরে সব ফ্লাইট স্থগিতের মেয়াদ বাড়াল সৌদি

সৌদি আরবের সামনে কঠিন সমীকরণ

সৌদি আরবের বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, সামরিক খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও সব ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি দূর করা সম্ভব নয়। বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, একাধিক দিক থেকে আসা হুমকি, তুলনামূলক কম খরচের ড্রোনের সঙ্গে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত ব্যবহার এবং হুথিদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে।

এখন রিয়াদের সামনে মূলত দুটি কঠিন পথ। একদিকে, হুথিদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করলে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, সামরিক অভিযান বাড়ালে পাল্টা হামলার ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়ে যেতে পারে।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করলেও অস্ত্রের সীমিত মজুত ও বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক হিসাব সৌদি আরবের বিকল্প সংকুচিত করছে।

সব মিলিয়ে, হুথিদের মোকাবিলা এখন সৌদি আরবের জন্য শুধু সামরিক প্রতিরক্ষার লড়াই নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখারও পরীক্ষা। অন্যদিকে, দীর্ঘ সংঘাতের মধ্য দিয়ে হুতিরা নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করার সুযোগ পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কার্যকর কূটনীতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা নির্ধারণ করবে সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ।

/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর