ছয় সপ্তাহের সংঘাতের পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে আলোচনার টেবিলে বসেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল। টানা ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠক করলেও শেষ পর্যন্ত পক্ষ দুটি সমঝোতায় পৌঁছতে না পারায় ভেস্তে গেছে শান্তি আলোচনা। এজন্য দুই পক্ষ একে অপরের ওপর দায় চাপিয়েছে।
ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক ও কঠোর অবস্থান’ই আলোচনার অগ্রগতি থামিয়ে দিয়েছে। ফলে যুদ্ধবিরতির যে সম্ভাবনা নিয়ে আশার আলো দেখা দিয়েছিল, তা আবারো অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঢেকে গেছে।
বিজ্ঞাপন
ইরানের রাষ্ট্রীয় সাংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে ইরানি প্রতিনিধি দল টানা ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনা চালিয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। ইরানের দাবি, তারা একাধিক সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের জন্য আলোচনা এগোয়নি।
তেহরান জানায়, সমঝোতার টেবিল ছাড়ার অজুহাত খুঁজছিল যুক্তরাষ্ট্র। তাদের দাবিগুলো অত্যন্ত বাড়াবাড়ি এবং উচ্চাভিলাষী। তারা এমন সব দাবি তুলেছে, যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমেও অর্জন করতে পারেনি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চুক্তি করতে তারা সদিচ্ছা নিয়ে এলেও কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। ইরানের প্রতিনিধিদল তাদের শর্তগুলো মেনে নেয়নি।
বিজ্ঞাপন
২১ ঘণ্টার সমঝোতা বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, তারা ‘চূড়ান্ত এবং সেরা প্রস্তাব’ নিয়ে আলোচনা টেবিলে বসেছিলেন। সেই প্রস্তাব ইরান গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে আমাদের সীমারেখা নির্ধারণ করেছি কোন বিষয়ে আমরা সমঝোতা করতে পারি এবং কোন বিষয়ে পারি না। কিন্তু ইরানের প্রতিনিধিদল আমাদের শর্তগুলো মেনে নেয়নি।’
তার কথায়, ‘এই আলোচনা সফল হয়নি, যা ইরানের জন্যই বেশি ক্ষতিকর।’
ভ্যান্স আরো জানান, আলোচনার সময় তিনি একাধিকবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের মূল শর্তগুলোর মধ্যে ছিল, ইরান যেন পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে না এগোয়। কিন্তু সেই শর্ত মানতে রাজি হয়নি তেহরান।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘সরল সত্য হলো, আমাদের এমন একটি স্পষ্ট অঙ্গীকার প্রয়োজন যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং এমন কোনো উপায়ও অনুসরণ করবে না, যার মাধ্যমে দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করা সম্ভব।’
ভ্যান্স বলেন, ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো ‘ধ্বংস করা হয়েছে’, তবে মূল প্রশ্ন হলো-ইরান কি দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ‘মৌলিক ও দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ দেখাবে কি না। এটা শুধু এখন বা দুই বছর পরের বিষয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না-এমন অঙ্গীকার আমরা এখনো দেখিনি, তবে আশা করি দেখব’।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈঠকটি ছিল গত এক দশকের মধ্যে দুই দেশের প্রথম সরাসরি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে যেতে শুরু করে। সেই প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলে ছিলেন জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। জবাবে ইসরায়েলসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা শুরু করে ইরান। একই সঙ্গে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয় তেহরান। এতে প্রায় সারা বিশ্বে জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা শুরু হয়। এতে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়। এছাড়া পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়।
এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এরপর ইরানও যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করে। এর ধারাবাহিকতায় যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত করতে গতকাল ইসলামাবাদে আলোচনায় বসে দুই পক্ষ। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি হোটেলে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি এ আলোচনা শুরু হয়।
বৈঠকে লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলা, হরমুজ প্রণালি পরিস্থিতি, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় দেওয়ার প্রসঙ্গসহ নানা বিষয় উঠে এলেও শেষ পর্যন্ত শান্তি আলোচনা সফল না হওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে যুদ্ধ আরও তীব্র হতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার, বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের দামে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমআর




