সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

হামাসের যুদ্ধ কৌশল, অবাক বিশ্ব

আবুল কাশেম
প্রকাশিত: ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ১১:১৮ এএম

শেয়ার করুন:

হামাসের যুদ্ধ কৌশল, অবাক বিশ্ব
হামাস যোদ্ধারা। ছবি: ফিনান্সিয়াল টাইমস

হামাসের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইসরায়েল বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গেরিলা যুদ্ধে হামাসের কৌশলের কাছে হার মানছে বিশ্বের সব আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ইসরায়েলি বাহিনী। ৭ অক্টোবর থেকে যুদ্ধ মাস পেরিয়েছে। শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল এক সপ্তাহের মধ্যেই এর পরিসমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টো। গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার বোমাবর্ষণে সাড়ে দশ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় সবাই শিশু ও নারী এবং বেসামরিক লোকজন। ৬০ হাজারের মতো হামাস যোদ্ধার কাছে বিশ্বের শক্তিশালী সমরাস্ত্র নিয়ে ইসরায়েলিদের লড়াই প্রথাগত সব যুদ্ধকে হার মানিয়েছে। হামাসের যুদ্ধকৌশল অবাক করছে বাকি বিশ্বকে। কী তাদের সে কৌশল? যুদ্ধবিশারদরা এ নিয়ে বিভিন্ন মতামত দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন: ১০ ছেলে থাকলে সবাইকে পাঠাতাম, নিহত ফিলিস্তিনি যুবকের মা


বিজ্ঞাপন


গাজা উপত্যকা বহু বছর যাবত অবরুদ্ধ। প্রায় ২৩ লক্ষাধিক জনসংখ্যার প্রাচীন এই শহরটির অধিবাসীরা আন্তর্জাতিক ত্রাণসামগ্রীর ওপর নির্ভরশীল। তাদের কাজের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ নেই বললেই চলে। আধুনিক কোনো মারণাস্ত্রের সম্ভার তাদের নেই। ১৯৬১ কিংবা ১৯৬৭ সালে আরব ইসরায়েল যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো হার মেনেছিল। যুদ্ধে ইসরায়েলের ক্ষিপ্র আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল মিশর, জর্দান, লেবাননসহ অন্যান্য দেশগুলো। এরপর থেকে ইসরায়েল এ দীর্ঘ সময়ে তার সম্প্রসারণ নীতি বাস্তবায়ন করেছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে কয়েক টুকরো করেছে তারা। পশ্চিমাদের সহায়তায় ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের বসিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পুরনো সব ধারণা বদলে দিয়েছে।

প্রতিদিন ইসরায়েলি সৈন্য প্রাণ হারাচ্ছে হামাস যোদ্ধাদের কাছে। হামাসের সস্তা আর সাধারণ অস্ত্রেই ইসরায়েলের অত্যাধুনিক ট্যাঙ্ক ধ্বংস হচ্ছে। হামাস থেকে এমন ক্ষতি এর আগে বিশ্বের অন্যতম প্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত বাহিনী দেখেনি। একমাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ইসরায়েল আকাশ, সাগর এবং স্থলপথে হামলা করছে। তবে তারা হামাস যোদ্ধাদের নাগাল পাচ্ছে না। হামাসকে খুঁজে না পেয়ে সরাসরি বেসামরিক লোকদের ওপর বোমা ফেলছে।

hamas_weapons
বিভিন্নভাবে সরঞ্জাম সংগ্রহ করে অস্ত্র তৈরি করেছে হামাসের প্রশিক্ষিত যোদ্ধারা। ছবি: সংগৃহীত

অস্ত্র কীভাবে পায় হামাস
ইসরায়েলের স্থল, সমুদ্র এবং বিমান অবরোধে বেষ্টিত ছোট্ট একটি জনপদ গাজা। মাত্র ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০ কিলোমিটার প্রস্থের ভূখণ্ডের নেতৃত্বে রয়েছে ফিলিস্তিনির মুক্তিকামী সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হামাস। গাজা উপত্যকার আশপাশের মানচিত্র লক্ষ করলে দেখা যায়, ইসরায়েলসহ স্থানটি মিশরের সঙ্গে একটি সীমান্ত ভাগ করেছে। পশ্চিমে আবার ভূমধ্যসাগর। সমুদ্রভিত্তিক চোরাচালান হামাসের যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহের অন্যতম উৎস। 


বিজ্ঞাপন


অস্ত্র ব্যাবসায়ীরা ভূমধ্যসাগরের তীরে গাজার উপকূলে অস্ত্র ফেলে দেয়। পরে এই অস্ত্রগুলো হামাসের হাতে আসে। দুর্ধর্ষ ইসরায়েল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্র সংগ্রহে হামাসের আরও একটি মাধ্যম গোপন টানেল নেটওয়ার্ক। ২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজার নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার পর, হামাস মিশর-গাজা সীমান্তের নিচে একটি জটিল টানেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান এবং সিরিয়ার সঙ্গে একটি গোপন সরবরাহ রুট স্থাপন করে। এই দুই দেশের সঙ্গে হামাসের বন্ধুত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন বিদেশি উৎস থেকেও  যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহ করে সংগঠনটি। ফজর-৩, ফজর-৫ এবং এম৩০২ রকেটসহ বিভিন্ন শক্তিশালী অস্ত্রগুলো এ সূত্র থেকেই আসে।

আরও পড়ুন: জীবন বাঁচাতে লবণাক্ত পানি পান করছে গাজাবাসী

তালেবান যোগসূত্রকেও হামাসের যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহের একটি মাধ্যম হিসাবে দেখা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-নির্মিত অস্ত্রগুলোই হামাস ব্যবহার করছে। আফগানিস্তান থেকে তালেবানরা হামাসকে এ যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করছে। ২০২১ সালে তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে তাদের কার্যক্রম শেষ করে। তবে দেশটিতে তাদের অস্ত্রের মজুত রেখে যায়। সেই অস্ত্রই এখন হামাস গোষ্ঠী ব্যবহার করছে বলে অনেকের দাবি। 

হামাস জানিয়েছে, তারা এখন স্থানীয়ভাবে মুতাবার-১ নামক কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য বিমান-বিধ্বংসী মিসাইল তৈরি করছে। তাদের দাবি, এটি দিয়ে অপেক্ষাকৃত নিচু দিয়ে ওড়া ইসরায়েলি ড্রোন বা হেলিকপ্টার ভূপাতিত করা সম্ভব। আল-ইয়াসিন নামক ট্যাংক-বিধ্বংসী রকেটও তৈরি করেছে হামাস। তাদের দাবি, এটি ইসরায়েলি মার্কাভা ট্যাংকের এক্সপ্লোসিভ রিয়্যাক্টিভ আর্মার ভেদ করতে সক্ষম।

hamas_tunnel
টানেলের মুখে হামাস যোদ্ধা। ছবি: দ্য অস্ট্রেলিয়ান

হামাসের টানেল রয়েছে ইসরায়েলের নিচেও!
বিশ্লেষকদের ধারণা, গাজার মাটির নিচে রয়েছে হামাসের অন্য এক জগত। শত শত কিলোমিটার সুড়ঙ্গ রয়েছে তাদের। এসব সুড়ঙ্গ দিয়েই সামরিক সরঞ্জাম গাজায় নিয়ে আসে তারা। এই টানেল নেটওয়ার্কের আকার সম্পর্কে ধারণা করা কঠিন, যাকে ইসরায়েল বলছে ‘গাজা মেট্রো’।

২০১৩ সালে ইসরায়েলি বাহিনী ১.৬ কিলোমিটার লম্বা ও ১৮ মিটার গভীর টানেল আবিষ্কার করে, যার ছাদ ও দেয়াল ছিলো কংক্রিটের তৈরি। এটি গাজা উপত্যকা থেকে শুরু করে ইসরায়েলের কিবুতয এলাকার কাছাকাছি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। স্থানীয় অধিবাসীরা বিচিত্র শব্দ শোনার পর ইসরায়েলিরা এটিকে চিহ্নিত করে।

আরও পড়ুন: গাজায় কাঁদছে মানবতা

ইসরায়েলের রিচম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়ারফেয়ার বিশেষজ্ঞ ড. ডাফনে রিচমন্ড বারাক বলেন, ‘আন্ত:সীমান্ত টানেলগুলো অনেকটা দুর্গের মতো। মূলত ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালাতে একবার ব্যবহারের জন্য এগুলো খোঁড়া হয়। নেতারা সেখানে লুকিয়ে থাকেন। তাদের কমান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার আছে। তারা এগুলো ব্যবহার করে ট্রান্সপোর্ট ও যোগাযোগের জন্য। এগুলোতে রেল ট্রাক, আলো ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকে।’

তার মতে, হামাস সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টানেল নির্মাণ ও যুদ্ধ কৌশলে আরও দক্ষতা অর্জন করেছে। ধারণা করা হয় যে, গাজায় যে টানেল নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলো ভূপৃষ্ঠ থেকে অন্তত একশ ফুট গভীরে এবং এর প্রবেশপথগুলো সাধারণ ঘরবাড়ি, মসজিদ, স্কুল কিংবা এমন ভবনে যেখানে সাধারণ মানুষের সমাগম হয়। মূলত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের যেন চিহ্নিত করা না যায় সেজন্য এগুলো ব্যবহার করে তারা।

আরও পড়ুন: হামাসের শীর্ষ নেতা কারা, শিক্ষাগত যোগ্যতা কতটুকু?

ড. রিচমন্ড বারাক বলেন, টানেল চিহ্নিত করার কোন পদ্ধতিই পুরোপুরি প্রমাণিত নয়। এজন্যই যুদ্ধে সবসময় টানেল ব্যবহৃত হয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই, কারণ এটা ঠেকানোর উপায় নেই। ইসরায়েল গাজায় হামাসের পুরো টানেল নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে পারবে এটা বিশ্বাস করাটা হবে অবাস্তব বিষয়। নেটওয়ার্কটির কোন কোন অংশ থেকে নানা কারণে অনেককে সরানো যাবে না। আবার কিছু অংশ থাকবে অজানা। আবার কিছু অংশের জন্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হবে অনেক বেশি।

গাজার সঙ্গে সীমান্তজুড়ে অনেক শক্তিশালী এবং ৩০ ফুট উঁচু বেড়া নির্মাণ করেছে ইসরায়েল। এসব বেড়ার সঙ্গে অত্যাধুনিক সেন্সরও যুক্ত আছে। কিন্তু গত ৭ অক্টোবর রকেট ছাড়াও হামাস যোদ্ধারা সশরীরে ইসরায়েলে প্রবেশ করে হামলা চালালেও সেন্সরগুলো কোনো সংকেত পাঠায়নি। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, হামাস যোদ্ধাদের কেউ কেউ প্যারাগ্লাইডিং করে ইসরায়েলের ভেতরে প্রবেশ করলেও বেশির ভাগই সুড়ঙ্গ পথ ব্যবহার করে সেখানে পৌঁছেছে।

israel_tank
ইসরায়েলের ট্যাংকের ওপর ফিলিস্তিনিদের উল্লাস। ছবি: রয়টার্স

গাজায় ইসরায়েলকে মোকাবেলায় কতটা প্রস্তুত হামাস
সম্প্রতি হামাসের রাজনৈতিক শাখার জ্যেষ্ঠ এক নেতা আলি বারাকেহ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, '(৭ অক্টোবর) আক্রমণ চালানোর অনেক আগেই আমরা ইসরায়েলি স্থল আগ্রাসন মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়েছি। শত্রুকে চমকে দেওয়ার কিছু ব্যবস্থা আমাদের রয়েছে। ইসরায়েলের মতো আকাশযুদ্ধের সক্ষমতা না থাকলেও, অনায়সেই নগরযুদ্ধ লড়তে সক্ষম আমরা — যার কোনো তুলনা পাবেন না।'

সময়ের পরিক্রমায় হামাস তার অস্ত্রশস্ত্রের মান আরও উন্নত করেছে, দরকারি উপকরণ চোরাচালানের মাধ্যমে এনে ডাম্ব রকেটকে গাইডেন প্রিসিশান ক্ষেপণাস্ত্রে রূপ দিয়েছে। এমনকি তারা এখন পানির তলায় চলতে সক্ষম ড্রোন নির্মাণ করছে। একই সময়ে, ইসরায়েলের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও বিমানশক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য মোকাবিলায় নিজস্ব নগর-যুদ্ধের কৌশল রপ্ত করেছে হামাস, প্রতিপক্ষকে শহরে ঢুকে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে অংশ নিতে বাধ্য করে এ কৌশল।

আরও পড়ুন: মাটির নিচে ‘অন্য জগৎ’, কতটা বিস্তৃত হামাসের টানেল?

লন্ডন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর আঞ্চলিক নিরাপত্তা অধ্যয়ন শাখার পরিচালক এমিলি হোকায়েম বলেন, 'হামাস সেরাদের থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছে'। এ কথার মাধ্যমে তিনি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর প্রতি ইঙ্গিত দেন।হামাসের যুদ্ধ-কৌশলকে ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রামের গেরিলা সংগঠনের সাথে তুলনা করে হোকায়েম বলেন, 'হামাসকে আইএসআইএস নয়, বরং ভিয়েতকং বলা যায়।'

ভিয়েতকং যেমনটা ভিয়েতনামে করেছিল, তেমনিভাবেই গাজাকে ব্যারিকেড ও গুপ্ত সুড়ঙ্গ বেষ্টিত এক দুর্গে পরিণত করেছে হামাস। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গের জাল, যেখানে ইসরায়েলি বিমান হামলার সময় আশ্রয় নিতে পারে হামাস যোদ্ধারা এবং ইসরায়েলের স্থল সেনাদের পেছন গিয়ে হামলা চালানোর সুযোগ পায়।

ইসরায়েলি সেনারা গাজার যত অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে, ততই মাটির ওপরে তাদের ওপর চোরাগুপ্তা হামলা বাড়াবে হামাস। দ্রুত আক্রমণ এবং লুকানো বোমার আঘাতে ইসরায়েলি সেনাদের আতঙ্ককিত, বিভ্রান্ত করবে, তাদের হতাহত বাড়িয়ে মনোবলে চিড় ধরাতে চাইবে। কারণ, ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর অধিকাংশই রিজার্ভিস্ট' – অর্থাৎ সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেসামরিক নাগরিক, যারা নির্দিষ্ট সময় বাধ্যতামূলকভাবে সেনা সার্ভিসে থাকার পর আবারো বেসামরিক জীবনে ফিরে যান।  এই নগর-যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা, শক্ত প্রতিরোধ এই সেনাদের দিশেহারা করতে পারে।

আরও পড়ুন: এক চোখ, পা হারানো দেইফেই আতঙ্কিত ইসরায়েল!

বিশ্বের বিভিন্ন গেরিলা গোষ্ঠীর অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজ সদস্যদের মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগকে গুরুত্ব দেয় হামাস। হিজবুল্লাহর আছে নিজস্ব ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক। হামাসের সেই সুবিধা না থাকায়, তারা তারের মাধ্যমে সংযুক্ত টেলিফোন ব্যবহার করে। একই সঙ্গে এড়িয়ে চলে হ্যাকযোগ্য এবং ইলেকট্রনিক সিগনেচ্যার নির্গতকারী ডিভাইস।

'ভুল লাইনগুলোয় আড়ি পাতার ফলেই' গত ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে পারেনি ইসরায়েল। অর্থাৎ হামাস সদস্যরা ইসরায়েলকে ধোঁকা দিতে হ্যাকযোগ্য ডিভাইসে বিভ্রান্তিকর তথ্য বিনিময় করে। অন্যদিকে, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পরিকল্পনার তথ্য শেয়ার করা হয় 'এনালগ' ব্যবস্থায়, অথবা ইরান থেকে আনা এমন কোন ইনক্রিপ্টেড ডিভাইসে, যা ইসরায়েলের কাছে অজ্ঞাত। হামাসের প্রযুক্তিগতভাবে ধোঁকা দেওয়ার এই সক্ষমতাই আগ্রাসী ইসরায়েলি স্থল সেনাদের জন্য আগাম এক সতর্কবার্তা।

israel_in_gaza
গাজায় স্থল অভিযানে ইসরায়েলি সেনারা। ছবি: রয়টার্স

স্থল অভিযানে এগোতে পারছে না ইসরায়েল
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় স্থল অভিযানে গিয়ে বেকায়দায় পড়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাসের সশস্ত্র শাখা বুধবার ঘোষণা করেছে যে, গাজায় ইসরায়েলের স্থল অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে তারা ১৩৬টি ইসরায়েলি সামরিক যান ধ্বংসের তথ্য নথিভুক্ত করেছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ২৭ অক্টোবর থেকে অবরুদ্ধ গাজায় স্থল অভিযানের সময় ৩৩ সেনা নিহত হয়েছে। অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় স্থল অভিযান চালাতে যাওয়া সেনারা বেশ ভালোই এগিয়েছে বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জোনাথান কনরিকাস। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের জন্য এটি খুবই চ্যালেঞ্জিং একটি যুদ্ধক্ষেত্র। দুর্ভাগ্যজনকভাবে হামাস এই যুদ্ধের জন্য খুবই ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে।’

আরও পড়ুন: গাজার ছবি দেখে চুপ থাকা মানে আপনি ‘হৃদয়হীন’: পুতিন

গাজায় নির্বিচারে বোমা হামলা চালিয়ে শত শত ভবন ধ্বংস করেছে ইসরায়েল। স্থল অভিযানে এসব ধ্বংসস্তুপও ইসরায়েলি বাহিনীর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে একপ্রকার অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে লড়ছে ইসরায়েল। যাদের কাউকে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু গুলি ও বোমা এসে তাদের সামরিক যান ও সেনাদের উড়িয়ে দিচ্ছে।

অতিতে আরব ইসরায়েল যুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলো একদিকে ছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার বিশ্ব শুরু থেকেই ইসরায়েলের সরাসরি সমালোচনা করছে। বিশ্বের অনেকগুলো দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন ও রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের মতো ব্যবস্থা নিয়েছে। বহু শহরে লাখ লাখ মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে।

ইসরায়েল ইস্যুতে একচেটিয়া সমর্থন দেওয়া পশ্চিমাদের মধ্যেও বিভেদ দেখা গেছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলো একযোগে ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়েছে। তারা যুদ্ধ ও সাধারণ মানুষকে হত্যা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের চাপে মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। এমনকি খোদ ইসরায়েলিরাও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পদত্যাগে আন্দোলন করছে। এতদিন ইসরায়েলের পক্ষে বা নিরপেক্ষ অবস্থানে যেসব দেশকে দেখা যেত, তারা এখন ইসরায়েলের বিপক্ষে কথা বলছেন।

আরও পড়ুন: অবরুদ্ধ গাজা কত বড়, কীভাবে জীবন কাটে ফিলিস্তিনিদের?

এক মাসের বেশি সময় ধরে হামাস নির্মুলের কথা বলে গাজায় নির্বিচারে হামলা করছে ইসরায়েল। নির্মমভাবে সেখানকার নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে তারা। তাদের হামলা থেকে বাদ যাচ্ছে না স্কুল, হাসপাতাল, মসজিদ, গির্জা বা খাবারের দোকানও। তবে সেই অর্থে তারা হামাসের নাগাল পাচ্ছে না। ইসরায়েলি হামলায় হামাসের ব্যাপক সদস্য নিহত হয়েছে এমন কোনো খবর এখনও পাওয়া যায়নি। যদিও ইসরায়েল দাবি করেছে যে, তাদের সীমানার মধ্যে হামলা চালানোর সময় দেড় হাজার হামাস সদস্য নিহত হয়েছে। তবে এর পক্ষে শক্ত কোনো প্রমাণ তারা দেখাতে পারেনি। এছাড়া হামাসও এমন দাবি নাকচ করেছে।

বলা হয়ে থাকে যে, হামাসের যোদ্ধাদের ৮০ শতাংশই এতিম। ইসরায়েলের কারণে তারা তাদের বাবা-মাকে হারিয়েছেন। সম্প্রতি এক ফিলিস্তিনি মা তার এক সন্তানের মৃত্যুর পর জানিয়েছিলেন যে, তিনিই তাকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। আরও সন্তান থাকলেও তিনি একই কাজ করতেন। এমন দৃঢ় মনোবল আর নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অটুট হৃদয়গুলোর জয় নিশ্চিত। হয় সেটা শিগগিরই, অথবা শুধু সময়ের অপেক্ষা।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স, আনাদুলু ও ফিনান্সিয়াল টাইমস।

একে

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর