ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতাল

এক সপ্তাহেই ছুঁয়েছে মাসের রোগী

প্রকাশিত: ১০ নভেম্বর ২০২২, ০৯:৩৫ এএম
এক সপ্তাহেই ছুঁয়েছে মাসের রোগী

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলেছে। মৃত্যুও বাড়ছে। একইসঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। যার প্রমাণ পাওয়া গেল পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে। এখানে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে যত রোগী চিকিৎসা নিয়েছে অক্টোবরে তার দ্বিগুণ রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। আবার পুরো অক্টোবরে যত রোগী ভর্তি হয়েছে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই তা ছাড়িয়ে গেছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, কোনো রোগীকে তারা ফেরত দিচ্ছেন না। প্রয়োজনে ওয়ার্ডের মধ্যে বেড বাড়িয়ে ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, কোনো রোগী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রয়োজনে তাদের এইচডিইউতে পাঠানো হচ্ছে। ফলে অন্য হাসপাতালে তাদের যাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না।

সম্প্রতি সরেজমিন হাসপাতালটি ঘুরে এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন: সোহরাওয়ার্দীতে রোগীর চাপ কম, বেড খালি

বর্তমানে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জনের মতো রোগী ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালটিতে। তবে কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, সামনের দিনগুলোতে রোগী আরও বাড়লে পরিস্থিতি সামাল দেয়া মুশকিল হবে।

হাসপাতালের ছয়তলায় মহিলা ওয়ার্ডে (ওয়ার্ড-৮) দেখা যায়, চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যস্ততা ডেঙ্গু আক্রান্ত এক রোগীকে ঘিরে। পরে জানা যায়, ওই রোগীর প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় সে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

dengue

ওয়ার্ডের নার্স ইনচার্জ ঢাকা মেইলকে বলেন, যে কোনো ডেঙ্গু রোগীকে কমপক্ষে তিনদিন হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। প্লাটিলেট ঠিক থাকলে আর মুখে রুচি পেলে ছাড় দেয়া হচ্ছে। ১০ থেকে ১২ দিনও আছেন কোনো কোনো রোগী।

নভেম্বর নিয়ে সবার মধ্যে শঙ্কা
গত দুই মাস ডেঙ্গু রোগীর চাপ ক্রমেই বেড়ে বলেছে। বিশেষ করে অক্টোবরে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে বাড়তি বিছানার ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে এখানে ১৯৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে ৯৫ জন পুরুষ ও ৭৫ জন মহিলা। আর ২৩ জন শিশু চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছেন।

আরও পড়ুন: ঢামেক হাসপাতালের ফ্লোর-বারান্দাতেও রোগী

অন্যদিকে অক্টোবরে সেপ্টেম্বরের দ্বিগুণ রোগী চিকিৎসা নিয়েছে হাসপাতালটিতে। অক্টোবরে ৪৪৪ জন রোগী ভর্তি ছিল। যাদের মধ্যে ২০৫ জন পুরুষ। ১৬০ জন নারী। ৭৯ জন শিশু। সবাই অবশ্য চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছেন।

এদিকে চলতি মাসের প্রথম ৬ দিনে ৪১৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।

হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ডা. মেহেদি হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, এবার রোগীর চাপ তুলনামূলক অনেক বেশি। সেপ্টেম্বরের চেয়ে অক্টোবরে দ্বিগুণ ছিল। নভেম্বরে হয়তো অনেকটা ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে। কারণ এক সপ্তাহে চারশ’র বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। তবে আমাদের স্বস্তির জায়গা একজনও মারা যায়নি।

সারাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ৯ নভেম্বর পর্যন্ত এ বছর দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১৮৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ৫ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ৭৯৬ জন। যাদের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৪৫৯ জন এবং ঢাকার বাইরে ৩৩৭ জন। আর বর্তমানে সারা দেশে হাসপাতালে ভর্তি রোগী তিন হাজার ১৪৪ জন।

dengue

এ বছর জানুয়ারি থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সর্বমোট ৪৫ হাজার ৫৯৮ জন।

কেন এত বেশি রোগী ঢাকা দক্ষিণে?

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে দক্ষিণের ১৪টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক জরিপে এমন চিত্র দেখা গেছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১৩টি ওয়ার্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।

গত ২১ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদফতর এমন তথ্য দিয়েছে। অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম জানিয়েছেন, ডিএনসিসির ৪০ ওয়ার্ডে ৪৮টি সাইট এবং ডিএসসিসির ৫৮টি ওয়ার্ডে ৬২টি সাইটসহ মোট ১১০টি সাইটে ৩ হাজার ১৫০টি বাড়িতে সার্ভে পরিচালনা করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ম্যালেরিয়া নির্মূল ও ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী রোগ নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার মৌসুমকালীন জরিপটি ২১টি টিমের মাধ্যমে ১০ দিন ধরে পরিচালনা করে।

৩ হাজার ১৫০টি বাড়িতে পরিচালিত এই জরিপে ২ হাজার ৮২৯টি বাড়িতেই নমুনা পরীক্ষায় ফলাফল নেগেটিভ আসে। আর ১৫৯টি বাড়িতে ডেঙ্গু ফলাফল পজেটিভ এসেছে। পজিটিভ আসা বাড়িগুলোর মধ্যে ৬৩টি বাড়ি উত্তর সিটিতে, আর দক্ষিণে ৯৬টি বাড়ি। তথ্য অনুযায়ী, দুই সিটিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে ১০ শতাংশ বাড়িতে।

জরিপের তথ্য বলছে, পড়ে থাকা বা ফেলে রাখা ভেজা পাত্রে সবচেয়ে বেশি মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এছাড়াও ঘর বা ভবনের মেঝে, প্লাস্টিকের ড্রাম বা প্লাস্টিকের নানা ধরনের পাত্রেও এই লার্ভা পাওয়া যায়। দক্ষিণের ২৬ শতাংশ এ ধরনের পাত্রে ও উত্তরের ২২ শতাংশ পাত্রে মশার এই লার্ভা পাওয়া গেছে।

তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণের এডিস মশার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ৮ নম্বর ওয়ার্ড (কমলাপুর ও মতিঝিল), ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড (নবাবপুর ও বংশাল) এবং ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে (ওয়ারী ও নারিন্দা)।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও বলছেন, এসব এলাকা থেকে তারা বেশি রোগী পাচ্ছেন। অবশ্য মতিঝিল-কমলাপুরের অনেক রোগী মুগদা মেডিকেলেও যাচ্ছেন। নবাবপুর-বংশালের অনেকে মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

ন্যাশনাল হাসপাতালের চিকিৎসক মেহেদি হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা সব বয়সী রোগী পাচ্ছি। তবে ১৪ বছর থেকে যুবক বেশি। শিশুও আছে, আবার বয়স্ক মানুষও ভর্তি হচ্ছেন। তবে সবাইকে বলব, সচেতন হতে হবে। আর ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। না হলে বিপদ বাড়বে।

বিইউ/এএস