রোববার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

জটিল সার্জারি থেকে পুনর্বাসন, চীনের সরকারি হাসপাতালেই মেলে সকল সেবা

মাহফুজ উল্লাহ হিমু, চীন থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২৩ এএম

শেয়ার করুন:

জটিল সার্জারি থেকে পুনর্বাসন, চীনের সরকারি হাসপাতালেই মেলে সকল সেবা

স্ত্রীর জটিল রক্তের ক্যানসার ধরা পড়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রথমে ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা আব্দুল্লাহ হাসান নাসিফ রবিন। কিন্তু ভিসা জটিলতায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য বেছে নেন চীনকে। সেখানে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করলেও পরে স্ত্রীকে নিয়ে যান গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালে। চীনের এই সরকারি হাসপাতালে জটিল রক্তরোগের চিকিৎসায় স্টেম সেল প্রতিস্থাপন থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক রোগ নির্ণয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বিত পরামর্শ এবং চিকিৎসা-পরবর্তী পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসাধীন তার স্ত্রী রেহনুমা তারান্নুম স্নিগ্ধা।

শুধু রবিনের স্ত্রীর চিকিৎসাই নয়, চীনের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক চিকিৎসাসেবার এমন নানা আয়োজন চোখে পড়েছে সরেজমিন পরিদর্শনে। রোগ নির্ণয়ে পিইটি-সিটি ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এমআরআই, জটিল রক্তরোগে স্টেম সেল প্রতিস্থাপন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত ওয়ার্ড, বিরল রোগে জিন থেরাপি নিয়ে গবেষণা এবং অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে উন্নত পুনর্বাসনব্যবস্থা; সব মিলিয়ে চিকিৎসাসেবায় প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়েছে দেশটির হাসপাতালগুলো। একই সঙ্গে বিদেশি রোগীদের চিকিৎসা সহজ করতে গড়ে তোলা হয়েছে পৃথক আন্তর্জাতিক চিকিৎসাকেন্দ্র।

গত ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশের ৪০ সদস্যের একটি গণমাধ্যম প্রতিনিধি দল চীনের গুয়াংডং প্রদেশের গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালের নানশা ক্যাম্পাস পরিদর্শন করে। এ সময় হাসপাতালটির বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগ, আধুনিক চিকিৎসাযন্ত্র, গবেষণা কার্যক্রম এবং রোগীদের সেবাব্যবস্থা ঘুরে দেখেন প্রতিনিধিরা। সরাসরি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকদের কাছ থেকে জটিল রোগের চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কেও ধারণা পান তারা।

4

১২৭ বছরের সরকারি হাসপাতালে বছরে ৩০ লাখ রোগীর চিকিৎসা

১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতাল চীনের অন্যতম পুরোনো সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান। ১২৭ বছরের পুরোনো হাসপাতালটি চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত। এটি গুয়াংজু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অধিভুক্ত হাসপাতাল এবং সাউথ চায়না ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির দ্বিতীয় অধিভুক্ত হাসপাতাল।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২ হাজার ৪৯০টি শয্যা রয়েছে। বছরে প্রায় ৩০ লাখ রোগী এখানে চিকিৎসাসেবা নেন। রক্তরোগ, বয়স্কদের চিকিৎসা, পরিপাকতন্ত্রের রোগ এবং মূত্রতন্ত্রের চিকিৎসায় হাসপাতালটির বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়া প্রাদেশিক পর্যায়ের ২১টি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত বিভাগ রয়েছে।

দীর্ঘ ইতিহাসের পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তি ও গবেষণাকে গুরুত্ব দিয়ে সেবার পরিধি বাড়িয়েছে হাসপাতালটি। বিশেষ করে গুয়াংজুর নানশা ক্যাম্পাসকে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখানে আধুনিক রোগ নির্ণয়, জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, চীনের গুয়াংডং-হংকং-ম্যাকাও গ্রেটার বে এরিয়ার বিশেষ নীতিগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে নতুন ওষুধ ও চিকিৎসাযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবহৃত কিছু ওষুধ ও চিকিৎসাপ্রযুক্তি নির্ধারিত অনুমোদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসায় যুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে।

5

অত্যাধুনিক যন্ত্রে রোগ নির্ণয়, রিপোর্ট দেখেন বিশেষজ্ঞরা

আধুনিক চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়। এ জন্য গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালের নানশা ক্যাম্পাসে গড়ে তোলা হয়েছে উন্নত স্বাস্থ্য পরীক্ষাকেন্দ্র। এখানে পজিট্রন এমিশন টমোগ্রাফি-কম্পিউটেড টমোগ্রাফি বা পিইটি-সিটি এবং ৩ টেসলা এমআরআইয়ের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

পিইটি-সিটি প্রযুক্তি বিশেষ করে ক্যানসারের বিস্তার, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের অস্বাভাবিক কার্যক্রম এবং চিকিৎসার ফলাফল মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এমআরআইয়ের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যুর বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়। রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য পৃথক অবকাঠামোর পাশাপাশি পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের যুক্ত রাখা হয়েছে। 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, পরীক্ষার প্রতিবেদন কয়েক ধাপে যাচাই ও মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞকে জানানো হয়। এরপর রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় পরবর্তী পরীক্ষা বা চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হয়। বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলের সদস্যরাও হাসপাতালের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নেন। এ সময় তাদের পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ এবং ফলাফল পর্যালোচনার পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

হাসপাতালের আন্তর্জাতিক চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসা সমন্বয়কারী হুয়াংহং ল্যান ঢাকা মেইলকে বলেন, “নানশা ক্যাম্পাসে উন্নত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অবকাঠামো রয়েছে। পিইটি-সিটি ও ৩ টেসলা এমআরআইয়ের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা পর্যালোচনা করেন। কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেলে রোগীকে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হয়।”

তিনি জানান, বিদেশি রোগীদের জন্য হাসপাতালের আন্তর্জাতিক চিকিৎসাকেন্দ্রে পৃথক সেবাব্যবস্থাও রয়েছে। চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, বহুভাষিক দোভাষী, ভিসাসংক্রান্ত সহায়তা এবং বিমানবন্দর থেকে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়। কয়েকটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি বিল পরিশোধের সুবিধাও রয়েছে।

3

স্টেম সেল প্রতিস্থাপনে বিশেষ সক্ষমতা, বছরে প্রায় ৩০০ চিকিৎসা

গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হেমাটোলজি বা রক্তরোগ বিভাগ। দক্ষিণ চীনের বৃহৎ হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট কেন্দ্রগুলোর একটি এটি। অ্যাপ্ল্যাস্টিক অ্যানিমিয়া, লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা ও মাল্টিপল মায়েলোমার মতো জটিল রক্তরোগের চিকিৎসা দেওয়া হয় এখানে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ বিভাগে বছরে প্রায় ৩০০টি স্টেম সেল প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে গুরুতর অ্যাপ্ল্যাস্টিক অ্যানিমিয়া ও বিভিন্ন ধরনের রক্তের ক্যানসারের চিকিৎসায় এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

স্টেম সেল প্রতিস্থাপন একটি জটিল চিকিৎসাপদ্ধতি। এতে রোগীর শরীরে সুস্থ রক্তকোষ তৈরির সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিস্থাপনের সময় রোগীর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে চিকিৎসার পাশাপাশি বিশেষ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রোগীকে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

হাসপাতালটির স্টেম সেল প্রতিস্থাপন বিভাগে রয়েছে ৩০টি গ্রেড-১০০ ল্যামিনার ফ্লো ওয়ার্ড। এসব কক্ষে বিশেষ বায়ু পরিশোধন ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিনিধি দল হাসপাতালের স্টেম সেল প্রতিস্থাপন ও সেল থেরাপি কেন্দ্র পরিদর্শন করে। সেখানে চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপ এবং রোগীদের জন্য গড়ে তোলা বিশেষায়িত ব্যবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।

হাসপাতালের ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক চেংজুয়ান ঝাং ঢাকা মেইলকে বলেন, অ্যাপ্ল্যাস্টিক অ্যানিমিয়ার চিকিৎসায় তাঁদের হাসপাতালে বছরে প্রায় ১০০টি স্টেম সেল প্রতিস্থাপন করা হয়। এ চিকিৎসায় রোগীদের বেঁচে থাকার হার প্রায় ৯০ শতাংশ।

তিনি জানান, শিশুদের বিরল রক্তের ক্যানসার জুভেনাইল মায়েলোমোনোসাইটিক লিউকেমিয়ার ক্ষেত্রেও তাদের বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে। এ রোগের চিকিৎসায় পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার ৯০ শতাংশের বেশি বলে দাবি করেন তিনি।

তবে এসব পরিসংখ্যান নির্দিষ্ট রোগ ও চিকিৎসাপদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত। সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, রোগের পর্যায় এবং চিকিৎসায় সাড়ার ওপর ফলাফল নির্ভর করে।

স্ত্রীর চিকিৎসায় চীনে রবিন, অপেক্ষা পরবর্তী মূল্যায়নের

হাসপাতালটির বিশেষায়িত রক্তরোগ চিকিৎসার সুযোগ নিচ্ছেন বাংলাদেশি রোগীরাও। তাদের একজন রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা আব্দুল্লাহ হাসান নাসিফ রবিনের স্ত্রী রেহনুমা তারান্নুম স্নিগ্ধা।

২০২৫ সালের অক্টোবরে স্নিগ্ধার মাল্টিপল মায়েলোমা শনাক্ত হয়। এটি রক্তের এক ধরনের ক্যানসার, যা অস্থিমজ্জার প্লাজমা কোষকে আক্রান্ত করে। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য স্ত্রীকে ভারতে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন রবিন। কিন্তু ভিসা জটিলতায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি।

পরে চীনের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করেন। এরপর স্ত্রীকে নিয়ে যান গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালে। সেখানে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টসহ জটিল চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে স্নিগ্ধাকে।

চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলেও এখনও পরবর্তী মূল্যায়নের অপেক্ষায় রয়েছে পরিবারটি। চিকিৎসায় স্নিগ্ধার শরীর কতটা সাড়া দিয়েছে, তা পর্যবেক্ষণ করছেন চিকিৎসকেরা। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী চিকিৎসার পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।

চিকিৎসার পাশাপাশি বিদেশে দীর্ঘদিন অবস্থান, যাতায়াত এবং বিপুল ব্যয়ের বিষয়টিও পরিবারটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রবিন ঢাকা মেইলকে বলেন, বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি শুধু একটি ভালো হাসপাতাল খুঁজে পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে চিকিৎসার ব্যয়, যাতায়াত, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা এবং ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তাও জড়িয়ে থাকে। 

তবে গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছে বলে জানান তিনি।

6

বিরল রোগে জিন থেরাপি, চলছে নতুন চিকিৎসাপদ্ধতির গবেষণা

শুধু প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতি নয়, জটিল ও বিরল রোগের চিকিৎসায় নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও গবেষণা করছে গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতাল।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সেল ও জিন থেরাপি নিয়ে ক্লিনিক্যাল গবেষণা এবং গবেষণার ফল চিকিৎসায় প্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে। বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়া ও গশার রোগের মতো বিরল বংশগত রোগে জিন থেরাপির সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

জিন থেরাপি এমন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত সমস্যাকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিছু বংশগত রোগের চিকিৎসায় এ প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে সব ধরনের জিন থেরাপি এখনও নিয়মিত চিকিৎসাসেবার অংশ নয়। অনেক পদ্ধতি গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।

একই সঙ্গে গুরুতর অ্যাপ্ল্যাস্টিক অ্যানিমিয়ার চিকিৎসায় অন্য ব্যক্তির স্টেম সেল প্রতিস্থাপন বা অ্যালোজেনিক হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্টের ক্ষেত্রেও বিশেষায়িত চিকিৎসা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে হাসপাতালটি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তির সঙ্গে গবেষণার সমন্বয় ঘটিয়ে জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য নতুন চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

অস্ত্রোপচারের পর পুনর্বাসনেও আধুনিক প্রযুক্তি

জটিল রোগের চিকিৎসা কিংবা অস্ত্রোপচার শেষ হওয়ার পরও অনেক রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন না। কারও চলাফেরায় সমস্যা হয়, কেউ শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। আবার দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত পুনর্বাসন চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

এ ধরনের রোগীদের জন্য গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালে পৃথক পুনর্বাসন বিভাগ রয়েছে। এখানে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, চলাফেরার সীমাবদ্ধতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

পরিদর্শনকালে প্রতিনিধি দলকে পুনর্বাসন বিভাগের বিভিন্ন প্রযুক্তির কার্যক্রম দেখানো হয়। চিকিৎসকেরা জানান, রোগীর অসুস্থতার ধরন, শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসার অগ্রগতি বিবেচনায় পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা হয়। এর লক্ষ্য রোগীকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।

আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসাপদ্ধতিরও ব্যবহার রয়েছে হাসপাতালটিতে। এ জন্য রয়েছে পৃথক ট্র্যাডিশনাল চাইনিজ মেডিসিন বা টিসিএম বিভাগ।

সেখানে আকুপাংচারসহ বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে প্রতিনিধি দলকে ধারণা দেওয়া হয়। ব্যথা ব্যবস্থাপনা এবং স্নায়ু ও রক্তনালিসংক্রান্ত কিছু সমস্যার পুনর্বাসনে এসব পদ্ধতির ব্যবহার তুলে ধরেন সংশ্লিষ্টরা। বিভাগটিতে গুয়াংজুর স্বনামধন্য ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের নামে প্রতিষ্ঠিত তিনটি বিশেষজ্ঞ স্টুডিও রয়েছে।

প্রতিনিধি দলের কয়েকজন সদস্য আকুপাংচার চিকিৎসার অভিজ্ঞতাও নেন। তবে এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাপদ্ধতি সব রোগের জন্য সমান কার্যকর নয়। কিছু ধরনের ব্যথা উপশমে উপকারিতার প্রমাণ থাকলেও রোগের ধরন ও রোগীর অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শে এর ব্যবহার করা প্রয়োজন।

7

বিদেশি রোগীদের জন্য আড়াই হাজার বর্গমিটারের বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র

চিকিৎসার আধুনিকায়নের পাশাপাশি বিদেশি রোগীদের জন্য সেবা সহজ করার উদ্যোগও নিয়েছে গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতাল। বিশেষ করে নানশা ক্যাম্পাসে আন্তর্জাতিক রোগীদের জন্য পৃথক বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগের ব্যবস্থা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক রোগীদের রক্তরোগের চিকিৎসা ও স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের জন্য ২ হাজার ৫০০ বর্গমিটারের বেশি জায়গাজুড়ে বিশেষায়িত অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।

এখানে জটিল রোগের চিকিৎসায় একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সমন্বিত পরামর্শ বা মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম (এমডিটি) কনসালটেশনের ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ একজন রোগীর চিকিৎসার বিষয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

বিদেশি রোগীদের জন্য দ্বিভাষিক সহায়তা, চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং বাণিজ্যিক বিমার মাধ্যমে সরাসরি বিল পরিশোধের ব্যবস্থাও রয়েছে। রোগীরা যাতে এক জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা পান, সে লক্ষ্যেও কাজ করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

চীনের গুয়াংডং-হংকং-ম্যাকাও গ্রেটার বে এরিয়ার বিশেষ নীতিগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবার পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে হাসপাতালটির। বিশেষ করে গুয়াংজু ও হংকংয়ের উন্নত চিকিৎসাসম্পদ এবং বিশেষজ্ঞ সেবার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশিদের জন্য বাড়ছে চিকিৎসার সুযোগ

চীনের বিভিন্ন হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগও সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে জটিল রোগের চিকিৎসার আগে অনলাইনে রোগীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা, প্রাথমিক পরামর্শ, চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে চীনে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি রোগেীদের ভাষাগত জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। এ সমস্যা সমাধানে ভাষাগত সহায়তার জন্য দোভাষীর ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

এ বিষয়ে আপন ফ্রেন্ডশিপ এক্সচেঞ্জ সেন্টার, বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল হেলথকেয়ার কো-অপারেশন ম্যানেজার মামুন আল নাঈম শাওন ঢাকা মেইলকে বলেন, “চিকিৎসার জন্য চীনে যাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু হাসপাতালের চিকিৎসার মান বিবেচনা করলেই হয় না। ভিসা, যাতায়াত, ভাষাগত সহায়তা এবং থাকার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি জানান, বাংলাদেশি রোগীদের জন্য চীনের বিভিন্ন হাসপাতাল আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ করছে। কিছু হাসপাতাল চিকিৎসার আগে অনলাইনে রোগীর নথি পর্যালোচনা করে প্রাথমিক পরামর্শ দিচ্ছে। দ্রুত অ্যাপয়েন্টমেন্ট, দোভাষী এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরিতেও সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে।

তবে এসব সুবিধা হাসপাতালভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে চীনে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের আন্তর্জাতিক চিকিৎসাকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে চীনের গুয়াংজু মডার্ন ক্যানসার হাসপাতালেও বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে হাসপাতালটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আন্তর্জাতিক বিভাগের পরিচালক হি ল্যাংবিং ঢাকা মেইলকে বলেন, “বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০৩টি দেশের রোগী তাদের হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন।”

তিনি জানান, কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশি রোগীরা তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন। তবে গত বছর থেকে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশি রোগী সেখানে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন।

হি ল্যাংবিংয়ের দাবি, চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের অনেকের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে। কেউ কেউ ক্যানসারমুক্তও হয়েছেন। তবে এসব ফলাফলের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা গবেষণার তথ্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতেও কাজে লাগতে পারে অভিজ্ঞতা

চীনের সরকারি হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বিত সেবা, গবেষণা এবং রোগীদের পুনর্বাসনের যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ বিনিময়, যৌথ গবেষণা, আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তি হস্তান্তর এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ ঢাকা মেইলকে বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়লে চিকিৎসক বিনিময়, যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে শুধু বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ বাড়বে না, বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি বলেন, চীনের হাসপাতালগুলো বাংলাদেশি রোগীদের সামনে চিকিৎসার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে এ সম্ভাবনার সুফল পেতে চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা, যৌক্তিক ব্যয় এবং রোগীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর