রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৮ এএম

শেয়ার করুন:

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর?
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের অন্যতম বড় পরিবেশগত সংকট ‘প্লাস্টিক দূষণ’। তবে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন বা প্যাকেটের বাইরে আরও একটি অদৃশ্য হুমকি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সেটি হলো—মাইক্রোপ্লাস্টিক। 

এতটাই ক্ষুদ্র যে খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এটি এখন মানুষের খাদ্য, পানি, বাতাস, এমনকি রক্ত ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও শনাক্ত হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ, প্রতিদিন অজান্তেই মানুষ এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার সংস্পর্শে আসছে।

এই যেমন প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করা আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস। দাঁতের যত্নে আমরা যে জিনিসটিকে নিরাপদ মনে করি সেটিই এখন আমাদের জন্য ‘সবচেয়ে অনিরাপদ’।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বাংলাদেশে বাজারে থাকা ৩৪টি টুথপেস্ট পরীক্ষা করে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার সংখ্যা ছিল ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের জন্য তৈরি ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো পাঁচ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণা, যা খালি চোখে দেখা যায় না। এগুলো দুইভাবে তৈরি হয়। এক ধরনের কণা শিল্পকারখানায় ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট আকারে তৈরি করা হয়, যাকে প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। অন্যটি বড় প্লাস্টিক বর্জ্য সূর্যের আলো, তাপ, বাতাস ও ঘর্ষণের কারণে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হলে সৃষ্টি হয়, যাকে সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। দাঁত ব্রাশ করার সময় এসব কণার একটি অংশ মুখের ভেতর থেকে শরীরে প্রবেশ করতে পারে, আর বাকি অংশ পানির সঙ্গে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান। তবে মানুষের শরীরে এসব কণার উপস্থিতি প্রদাহ, হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। শিশুদের টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগের কারণ, কারণ শিশুরা ব্রাশ করার সময় তুলনামূলক বেশি টুথপেস্ট গিলে ফেলে।

কেন মেশানো হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক

গবেষণা থেকে জানা যায়, কাঁচামালের খরচ কমানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। যদিও অতীতে বিভিন্ন কারণে এটি মেশানো হত। তবে বর্তমানে অনেক দেশে টুথপেস্ট ও প্রসাধনীতে মাইক্রোবিডস (ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা) নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হয়েছে। কারণ, এগুলো বর্জ্য পানির মাধ্যমে নদী-সমুদ্রে চলে যায় এবং পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। তাই টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক মেশানো অসদাচরণ এবং ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে উল্লেখ করেছেন গবেষকরা। 

কীভাবে টুথপেস্ট থেকে শরীরে প্রবেশ করে

দাঁত ব্রাশ করার সময় আমরা বেশির ভাগ টুথপেস্ট ফেলে দিলেও অল্প পরিমাণ টুথপেস্ট প্রায় সবারই অনিচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা অনেক বেশি। ফলে টুথপেস্টে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে।

এ ছাড়া ব্রাশ করার পর যে টুথপেস্ট ধুয়ে ফেলা হয়, তা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে নদী, খাল ও সমুদ্রে গিয়ে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে মাছ, শামুক, ঝিনুকসহ জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যচক্রের মাধ্যমে আবার মানুষের কাছেই ফিরে আসে।

শরীরে প্রবেশ করে কোথায় যায়

মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলেই তা রোগ সৃষ্টি করবে—এমন কোনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের শরীর এই কণাগুলোকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলতে পারে না। বড় অংশ মলমূত্রের মাধ্যমে বের হয়ে গেলেও অতি সূক্ষ্ম কিছু কণা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছাতে পারে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, কিডনি, প্লাসেন্টা, শুক্রাণু এবং মস্তিষ্কের টিস্যুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। তবে এসব কণা ঠিক কোন উৎস থেকে এসেছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। কারণ মানুষ প্রতিদিন খাবার, পানি, বাতাস, পোশাক এবং অন্যান্য পণ্য থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসে।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অনুযায়ী মাইক্রোপ্লাস্টিক শ্বাসতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, হৃদ্‌রোগ-সংবহনতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এর সম্ভাব্য প্রভাবের মধ্যে রয়েছে প্রদাহ, অঙ্গের ক্ষতি, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, প্রজননক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ভ্রূণের বিকাশে বিরূপ প্রভাব।

গবেষণার অংশ হিসেবে ২ হাজার ৭৬০ জনের ওপর পরিচালিত জরিপে ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, তারা কখনো মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে শোনেননি। ২৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে সচেতন।

পরিবেশের জন্য কেন হুমকি

মাইক্রোপ্লাস্টিক নদী, খাল, হ্রদ ও সমুদ্রে জমে জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে। ছোট মাছ ও প্ল্যাংকটন এগুলো খাদ্য ভেবে খেয়ে ফেলে। পরে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে তা বড় মাছ এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের খাবারের অংশ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে মাটিতে জমে কৃষিজ উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে উদ্বেগ বেশি কেন

শিশুরা ব্রাশ করার সময় অনেক সময় টুথপেস্ট গিলে ফেলে। তাই তাদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। এ ছাড়া শিশুদের শরীর এখনো বিকাশমান থাকায় যেকোনো দূষকের সম্ভাব্য প্রভাব তাদের ওপর বেশি পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এ কারণেই শিশুদের টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

যে ২৬ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে

মেডিপ্লাস ফ্লোরাইড জেল, ক্লোজ আপ রেড হট, ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ, কোডোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলা, সিগন্যাল গ্রিন টি, পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট,  হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ার, সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্ট, পেপসোডেন্ট সেনসিটিভ এক্সপার্ট, হোয়াইট প্লাস রেড, হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভ জেল, সিগন্যাল হোয়াইটেনিং, মেরিল বেবি (স্ট্রবেরি), মেডিপ্লাস টিজিপি, এম.পিএম. হারবাল, মেডিপ্লাস ডিএস, পেপসোডেন্ট জার্মিচেক, মেরিল বেবি (অরেঞ্জ), ম্যাজিক হারবাল, মেসওয়াক ও ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ স্যাশে, ডেন্টিন জেল, পেপসোডেন্ট কিডস (অরেঞ্জ), ক্লোজআপ লেমন সি সল্ট, ব্রাশ আপ হোয়াইটেনিং জেল ও হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটি।

এর মধ্যে ‘কোডোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলা’ (স্ট্রবেরি), ‘মেরিল বেবি’ (স্ট্রবেরি), ‘মেরিল বেবি’ (অরেঞ্জ) ও ‘পেপসোডেন্ট কিডস অরেঞ্জ’ শিশুদের জন্য তৈরি।

সমাধান কী 

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রোধে উপাদান দেখে কেনা, ভেষজ বা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি বিকল্প বেছে নেওয়া এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এদিকে গবেষণায় আটটি নমুনায় শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। 

এগুলো হলো—‘প্যারোডন্ট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার’, ‘জেনফ্রেশ’, ‘প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি’ (ম্যাঙ্গো), ‘সেনসোডাইন ফ্রেশ জেল’, ‘কোলগেট ম্যাক্সফ্রেশভ’, ‘ক্লোজআপ রেড হট জিঙ্ক ফ্রেশ টেকনোলজি’, ‘কোডোমো (অরেঞ্জ)’ ও ‘কোলগেট অ্যাকটিভ সল্ট’।

এর মধ্যে ‘কোডোমো অরেঞ্জ’ ও ‘প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি’ (ম্যাঙ্গো) শিশুদের টুথপেস্ট। আপাতত দাঁতের যত্নে এ টুথপেস্টগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। 

এআরএম 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর