শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

চীনা বিনিয়োগে নীলফামারীতে হাসপাতাল, মাঠ পর্যায়ে কাজের তৎপরতা শুরু

সাখাওয়াত হোসাইন
প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪১ এএম

শেয়ার করুন:

চীনা বিনিয়োগে নীলফামারীতে হাসপাতাল, মাঠ পর্যায়ে কাজের তৎপরতা শুরু
গ্রাফিক্স: এআই

দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা চলছে চীনা বিনিয়োগে নীলফামারিতে এক হাজার শয্যার ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল’ নির্মাণের। কয়েক দফায় হাসপাতাল নির্মাণের জায়গা পরিদর্শন করা হলেও কাজ শুরু করা যায়নি। ইতোমধ্যে নীলফামারি পরিদর্শন করে গেছেন চীনা কারিগরি প্রতিনিধি দল। তবে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগটি এখনও দুই দেশের আলোচনার পর্যায়ে থাকলেও মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু করার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোরালো তৎপরতা চলছে। সেইসঙ্গে বর্তমান সরকার চায় যত দ্রুত সম্ভব দৃশ্যমান হোক এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ।

জানা গেছে, গত ২৫ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল’ প্রকল্প অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক), এটি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সভা। প্রকল্পের মেয়াদ চার বছর। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ধরা হয়েছে বাস্তবায়নকাল। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এই হাসপাতাল নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীন সরকার দেবে ২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা অনুদান। বাকি ৭৩ কোটি টাকা দেবে সরকার।

প্রকল্পের আওতায় একটি ১০ তলা নতুন হাসপাতাল ভবন, একটি ১০ তলা অধ্যাপক ও সিনিয়র ডক্টর কোয়ার্টার ভবন, একটি ১০ তলা ডক্টরস ডরমেটরি ভবন, একটি ২ তলা বিশিষ্ট ডুপ্লেক্স (ডিরেক্টরস বাংলো) ভবন, দুইটি ৬ তলা বিশিষ্ট নার্স ডরমেটরি ভবন এবং দুইটি ১০ তলা বিশিষ্ট কর্মচারী (২য় ও ৩য় শ্রেণী) কোয়ার্টার ভবন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হবে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, শিগগিরই কাজ শুরু করা গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ হবে কাজ। কাজ শুরু করতে যত দেরি হবে তত বেশি প্রকল্প বাস্তবায়েন ব্যয় বাড়বে। চীনা বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে এবং দ্রুত মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করতে প্রয়োজন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আন্তরিকতা ও জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের উন্নত ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার স্বার্থে হলেও দ্রুত হাসপাতালটি নির্মাণে কাজ করতে হবে।

জানা গেছে, দুই বছর আগে বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের আগ্রহ দেখায় চীন সরকার। তখন বিভিন্ন জেলা থেকে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন আসে। ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল’ নিজেদের জেলায় করতে ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও পঞ্চগড়ের মানুষ মিছিল-মানববন্ধনও করেন। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য জেলার মানুষও নিজেদের জেলায় এই হাসপাতাল স্থাপনের দাবি তোলেন। কোথায় হাসপাতাল করা হবে এ নিয়ে চলে দীর্ঘ আলোচনা। শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নীলফামারীকে প্রস্তাবিত জেলায় অন্তর্ভুক্ত করে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে জানান, হাসপাতালের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরের জনপদের মানুষকে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, অনকোলজি, নিউরোলজি প্রভৃতি বিশেষায়িত বিভাগে উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। সেইসঙ্গে আধুনিক জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, সিসিইউ ও এইচডিইউ, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং অপারেশন থিয়েটারের মাধ্যমে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা যাবে।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে হাসপাতাল পরিচালনার জন্য বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। হাসপাতালের জন্য রাজস্ব খাতে প্রায় ৮৯৩ জন চিকিৎসক, ১,১৯৭ জন নার্স এবং ১,৪১০ জন অন্যান্য জনবল নিয়োগ দিতে হবে। হাসপাতালটি নির্মাণ করা হলে আঞ্চলিক স্বাস্থ্য সেবার মান যেমন বাড়বে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও শক্ত অবস্থানে দাঁড়াবে। একই সঙ্গে উত্তরের জনপদে তৈরি হবে নতুন এক সম্ভাবনা। তাই এই হাসপাতাল শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ।

হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করা আরেক কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, হাসপাতালটি নির্মাণ হলে নীলফামারিতে জনসমাগম কয়েক গুণ বাড়বে। সেইসঙ্গে ছোট বড় ফার্মেসি, আবাসিক হোটেল, ভাড়া বাসার সংখ্যা ও নতুন উদ্যোক্তারা সেখানে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। একইসঙ্গে অবহেলিত উত্তরের জনপদের গুরুত্ব বাড়বে। এ ছাড়া নতুন সড়ক, ড্রেন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সংযোগ ও নিরাপত্তা কাঠামোর উন্নয়ন হবে। এ ছাড়া নীলফামারী কেন্দ্রীয় শহর থেকে গ্রামীণ জনপদ পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের তুলনায় সহজ হবে ।  

এদিকে নীলফামারী জেলায় প্রায় ২১ লাখ মানুষের বসবাস, যার বড় অংশ গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, এই জনসংখ্যার জন্য আনুমানিক ৪,৫০০-৬,০০০ শয্যা প্রয়োজন, অথচ বর্তমানে জেলা পর্যায়ে কার্যকর শয্যা সংখ্যা জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

বিদ্যমান স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে শয্যা, বিশেষায়িত বিভাগ ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল হওয়ায় গুরুতর রোগীদের রংপুর বা ঢাকায় যেতে হয়, যা সময়, ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়ায়। হাসপাতালটির মাধ্যমে আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসা সেবার সুবিধা পাবে নীলফামারীসহ উত্তরাঞ্চলের প্রায় আড়াই কোটি মানুষ।

একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, মাতৃ ও নবজাতক জটিলতা এবং সংক্রামক রোগের বোঝা, যেগুলোর জন্য উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সার্জারি ও ইনটেনসিভ কেয়ারের প্রয়োজন। ফলে জেলার একটি বড় অংশের জনগণ প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত ও জরুরি চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমিকে (এনএপিডি) জানিয়েছে, বিশেষায়িত হাসপাতালটি চালু হলে দৈনিক ৬ হাজার থেকে ৯ হাজার ৫০০ মানুষ এ থেকে সেবা পেতে পারে। ইনডোরে ভর্তি রোগীর সংখ্যা হতে পারে ৮০০ থেকে ১০০০। বহির্বিভাগে দৈনিক রোগী আসবে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৩৫০ জন। সেইসঙ্গে বহির্বিভাগের চিকিৎসক দেখানোর ফি হবে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। বহির্বিভাগে বিশেষজ্ঞ ফি হবে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা। জরুরি বিভাগের ফি হবে ১০০ থেকে ২০০ টাকা। প্রাথমিক রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা। রোগ নিরূপণে বিশেষায়িত পরীক্ষার খরচ হতে পারে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, নীলফামারিতে হাসপাতালে নির্মাণে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। চীনা অর্থায়ন না আসায় কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। চীনা অর্থায়ন আসলেই কাজ শুরু হবে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হাসপাতালটি নির্মাণ করা হবে। এতে উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় ও দীর্ঘ ভ্রমণজনিত ভোগান্তি কমবে, সময়মতো জীবনরক্ষাকারী সেবা নিশ্চিত হবে এবং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। সেইসেঙ্গে উত্তরবঙ্গের মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আর রাজধানীমুখী হতে হবে না।

হাসপাতালটি নির্মাণের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নীলফামারীতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের কাজ এখনও শুরু হয়নি। তবে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে চীনের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে চীনকে প্রয়োজনীয় প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে চীন থেকে একটি প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারি খাসজমিতে হাসপাতালটি নির্মাণের পরিকল্পনা থাকায় জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কোনো জটিলতা নেই।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার দেশের মানুষের জন্য মানসম্মত ও উন্নত চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। নীলফামারীতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ফলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের আর ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে ছুটতে হবে না। এ উদ্যোগ উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এসএইচ/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর