শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে সকাল হলেই দেখা মেলে একদল পরিপাটি পোশাক পরা তরুণের। হাতে ওষুধের তথ্যসংবলিত উপকরণ, কাঁধে ব্যাগ, চোখেমুখে কর্মব্যস্ততা। তারা ওষুধশিল্পের বিক্রয় প্রতিনিধি।
চিকিৎসকদের কাছে ওষুধের তথ্য পৌঁছে দেওয়া, বাজার পর্যবেক্ষণ এবং ওষুধের বিপণন কার্যক্রম পরিচালনায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাইরে থেকে তাদের পরিপাটি পোশাক ও পেশাদার উপস্থিতি দেখে অনেকের মনে হতে পারে, তাদের জীবন বেশ স্বচ্ছন্দ। কিন্তু এই বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে রয়েছে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রার চাপ, চাকরি হারানোর ভয় এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার অভিযোগ।
দেশের ওষুধশিল্পের প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই কর্মীদের একটি অংশের কর্মপরিবেশ ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যে পেশার রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের বিকাশের ইতিহাসে স্থানীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাকিস্তান আমল থেকেই এ অঞ্চলে বিভিন্ন ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে শুরু করে। Pfizer, Glaxo, Fisons, Squibb, Hoechst, ICI, May & Baker, Organon এবং Ciba-Geigy-র মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানও এ অঞ্চলের ওষুধবাজারে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

ওষুধের বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন তৈরি হয় দক্ষ বিক্রয় প্রতিনিধির। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী অনেক তরুণ আকর্ষণীয় বেতন ও পেশাগত সম্ভাবনার আশায় এ খাতে যোগ দেন। চিকিৎসকদের কাছে ওষুধের গুণাগুণ, ব্যবহারবিধি, কার্যকারিতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য পৌঁছে দেওয়া ছিল তাদের অন্যতম দায়িত্ব। একসময় ইন্টারনেট ও ডিজিটাল তথ্যভান্ডারের সহজলভ্যতা না থাকায় চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ও বিদেশি জার্নাল সংগ্রহ করা অনেকের জন্য কঠিন ছিল।
সে সময় ওষুধের বিক্রয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে চিকিৎসকেরা বিভিন্ন ওষুধের হালনাগাদ তথ্য পেতেন। ফলে চিকিৎসক ও বিক্রয় প্রতিনিধিদের মধ্যে পেশাগত যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে ওষুধশিল্পের বাজার, বিপণন কৌশল ও প্রতিযোগিতার ধরন। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে বিক্রয় প্রতিনিধিদের ওপর কাজের চাপও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ছুটির দিনেও কাজ, নেই নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা শুক্রবার সকাল ৯টা। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উত্তর পাশে দেখা যায় কয়েকজন ওষুধের বিক্রয় প্রতিনিধিকে। ছুটির দিনে কাজ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তাদের কয়েকজন জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তাদের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত হাসপাতালে অবস্থান করতে হয়। জুমার নামাজের আগপর্যন্ত কাজ শেষ করার পর রাতে আবার ফার্মেসিতে গিয়ে অর্ডার সংগ্রহ করতে হয়। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের নির্দেশনা অমান্য করার সুযোগ খুবই সীমিত। প্রতিবাদ করলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা থাকে। ফলে ব্যক্তিগত বিশ্রাম, পরিবারকে সময় দেওয়া কিংবা সাপ্তাহিক ছুটি উপভোগ করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

সকাল ১১টার দিকে ঢাকা শিশু হাসপাতালের সামনেও দেখা যায় একই ধরনের কর্মব্যস্ততা। কয়েকজন বিক্রয় প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই উচ্চশিক্ষা শেষ করে ভালো ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এ পেশায় এসেছিলেন। কিন্তু কাজের চাপ, লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বাধ্যবাধকতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা হতাশা তৈরি করছে বলে তারা জানান।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ওষুধ কোম্পানিগুলোর বক্তব্য এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মঘণ্টা ও ছুটির নীতিমালা যাচাই করা প্রয়োজন। টার্গেট পূরণের চাপ, বাড়ছে আর্থিক ঝুঁকি বাংলাদেশের ওষুধশিল্প দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনশীল খাত। বাজারের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। এই প্রতিযোগিতার চাপ মাঠপর্যায়ে বিক্রয় প্রতিনিধিদের ওপর পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে তিরস্কার, কর্মমূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাব কিংবা চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয় বলে কয়েকজন প্রতিনিধির অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে। তাদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য ফার্মেসিতে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে ওষুধ বিক্রির চাপও দেওয়া হয়। এতে বিক্রয়মূল্য ও ইনভয়েসের মধ্যে ঘাটতি তৈরি হলে সেই অর্থ নিজেদের পকেট থেকে পূরণ করতে হয় বলে তাদের দাবি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে চাকরি টিকিয়ে রাখতে গিয়ে কেউ কেউ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একদিকে চাকরি হারানোর ভয়, অন্যদিকে আর্থিক দায়-দুইয়ের চাপে তাদের অনেকেই পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। শুধু বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রাই নয়, কিছু প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত সময়ে রিপোর্ট জমা দিতে না পারলে বেতন কেটে রাখার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলার অভিযোগ ওষুধের বিপণন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র ও প্রেসক্রিপশনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের বিষয়টিও বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিক্রয় প্রতিনিধিদের রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলতে চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। রোগীর ব্যবস্থাপত্রে তার ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল স্বাস্থ্যতথ্য থাকতে পারে। তাই এসব তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে রোগীর গোপনীয়তা, সম্মতি এবং প্রযোজ্য আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক প্রয়োজন যেন রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাকে ঝুঁকির মুখে না ফেলে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বড় হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে নির্ধারিত ভিজিটিং আওয়ার ও প্রবেশসংক্রান্ত নিয়ম রয়েছে। বিক্রয় প্রতিনিধিদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব বিধিনিষেধের মধ্যেও তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে চাপ দেন। এর ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে দায়ভার মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর এসে পড়ে।

কর্মচাপ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, নিয়মিত লক্ষ্যমাত্রার চাপ, বিশ্রামের অভাব এবং চাকরি হারানোর ভয়—এসব বিষয় কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিক্রয় প্রতিনিধিদের অনেকে পেশাগত জীবনে তীব্র চাপ ও হতাশার অভিজ্ঞতার কথা জানান। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত কর্মচাপের মধ্যে থাকলে মানসিক অবসাদ, ঘুমের সমস্যা এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে ওষুধশিল্পের বিক্রয় প্রতিনিধিদের মধ্যে স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের হার বেড়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য ও গবেষণা প্রয়োজন। এ পেশার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
কর্মপরিবেশ, বেতন, পেশাগত মর্যাদা ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে অসন্তোষ বাড়তে থাকলে নতুন স্নাতকদের এ খাতে আগ্রহ কমে যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে দক্ষ কর্মী নিয়োগ ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। প্রয়োজন নীতিমালা ও জবাবদিহি দেশের ওষুধশিল্পের সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা এবং চিকিৎসকদের কাছে ওষুধসংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিক্রয় প্রতিনিধিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: ব্লাড প্রেসার হাই হলে দ্রুত কমানোর উপায়
বিশেষ করে ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময়ও ওষুধের সরবরাহ ও বিপণন কার্যক্রম চালু রাখতে এ খাতের কর্মীরা দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাদের অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। এ অবস্থায় ওষুধশিল্পের বিক্রয় প্রতিনিধিদের জন্য সুস্থ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, বেতন-ভাতা, বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, চাকরির নিরাপত্তা এবং কর্মীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মীদের দিয়ে অনৈতিক বা অননুমোদিত কার্যক্রম করানো বন্ধ করা, রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রবেশসংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ওষুধশিল্পের প্রবৃদ্ধি শুধু বিক্রির পরিমাণ কিংবা বাজার সম্প্রসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের শ্রম, মর্যাদা ও নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যাদের পরিশ্রমে ওষুধের বাজারের বিস্তার ঘটছে, তাদের জীবন যদি অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত কর্মচাপের মধ্যে আটকে থাকে, তবে সেই প্রবৃদ্ধি টেকসই হওয়ার প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই ওষুধশিল্পের বিক্রয় প্রতিনিধিদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ওষুধ কোম্পানি এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তাদের কর্মপরিবেশের উন্নয়ন শুধু কয়েক লাখ কর্মীর স্বার্থ রক্ষার বিষয় নয়; এটি দেশের ওষুধশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ও মানবিক কর্মসংস্কৃতি গড়ে তোলারও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
এজেড




