শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ডেঙ্গুর হটস্পট এখন সারাদেশ, কেন বেশি প্রাণ হারাচ্ছেন তরুণরা?

সাখাওয়াত হোসাইন
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০১ এএম

শেয়ার করুন:

ডেঙ্গুর হটস্পট এখন সারাদেশ, কেন বেশি প্রাণ হারাচ্ছেন তরুণরা?

ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার এখন আর রাজধানী কিংবা নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশের ৬৪ জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে মশাবাহিত এই রোগের বিস্তার। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। উদ্বেগের বড় কারণ, ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো এবং আক্রান্তদের একটি বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। বিশেষ করে ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার পরিস্থিতিকে আরও ভাবিয়ে তুলছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলাতেই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। ১০ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৭৯০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪১ জনে। আর আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ২২০ জনে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী এবং ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ। তবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫২ দশমিক ১ শতাংশ নারী এবং ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ।

Dengu_pirojpur
পিরোজপুরে প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।

ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী রয়েছে খুলনা বিভাগে। এ বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ৭ হাজার ৮৯৭ জন। আর সিটি করপোরেশনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৪৬ জন।

ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১৪১ জনের মধ্যে ৬৭ জনের বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশই তরুণদের। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ২১ জন।

আক্রান্তের হিসাবেও তরুণরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। চলতি বছর ডেঙ্গুতে ১৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ হাজার ৮৩ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী। এই সংখ্যা ৭ হাজার ১২৯ জন।

চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে আগস্ট মাসে-২০ হাজার ৫৩৬ জন। তবে সেপ্টেম্বরেই সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ৩৭৪ জন।

অন্যদিকে, এ বছর সবচেয়ে কম ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে মার্চ মাসে ৩৫৩ জন। মৃত্যুর হিসাবেও সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনেই ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৪৪ জন, যা এ বছরের কোনো একক মাসের তুলনায় এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। আগস্টে মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের। আর সবচেয়ে কম মৃত্যু হয়েছে মে মাসে, মাত্র একজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুতে তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি হওয়া জাতীয় জীবনের জন্য উদ্বেগের বিষয়। যাদের চলাচল বা মোবিলিটি বেশি, তাদের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি। কারণ, একজন কর্মক্ষম মানুষ কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন বাসা থেকে অফিসসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করেন। ফলে বিভিন্ন স্থানে মশার সংস্পর্শে আসার সুযোগও তৈরি হয়।

তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার অর্থ শুধু চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এর প্রভাব পড়ে কর্মঘণ্টা ও কর্মস্পৃহাতেও। ফলে ডেঙ্গুর কারণে ব্যক্তি ও পরিবারের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তাদের মতে, তরুণদের বয়স কম হওয়ার কারণে অনেকেই জ্বরকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। বয়স কম হওয়ায় শুরুতে শরীরও এতটা দুর্বল হয় না। দেরি করে হাসপাতালে আসায় ততক্ষণে তারা শকে চলে যায়। এ কারণে তরুণদের মৃত্যু হার বেশি।

জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘গতানুগতিক ধারায় ডেঙ্গু চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে জ্বর হলেই দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা নিশ্চিত করার সুযোগ থাকতে হবে, যাতে মানুষ শুরুতেই সতর্ক হতে পারে। সাধারণ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশাল বা বিশেষায়িত হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি লেভেলের হাসপাতালেই পর্যাপ্ত চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা জরুরি। শুধু জটিল ও সংকটাপন্ন রোগীদের সময়মতো বড় হাসপাতালে স্থানান্তর করা উচিত।

Dengu_Gazipur-1
শয্যা না পেয়ে গাজীপুরে হাসপাতালের মেঝে ও করিডোরে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। ছবি: ঢাকা মেইল।

‘ডেঙ্গুর জ্বর কমে যাওয়ার পর অনেকেই সুস্থ ভেবে কাজে ফিরে যান বা অসতর্ক হন, অথচ এই সময়েই মূল জটিলতা তৈরি হয়। তাই জ্বর কমার পর আরও অন্তত তিন দিন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্রামে থাকা জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণে কেবল মৌসুমি কাজ করলেই হবে না। পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও মশা নিধন কার্যক্রম অন্তত তিন মাসের জন্য নিবিড়ভাবে পরিচালনা করা উচিত এবং পরবর্তীতে মূল্যায়ন করে তা টানা দুই থেকে তিন বছর ধরে চালু রাখা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কয়েক বছরের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব।’

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘তরুণরা (বিশেষ করে ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী) কাজের প্রয়োজনে ও জীবনজীবিকার তাগিদে ঘরের বাইরে বেশি যাতায়াত করেন। ফলে তাদের মশার কামড় খাওয়ার এবং আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আক্রান্তের মোট সংখ্যা বেশি হওয়ায় তরুণদের মধ্যে প্রাণহানির সংখ্যাও বেশি দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, আক্রান্তের আনুপাতিক হারে নারীদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি বা প্রবণতা তুলনামূলক বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুর ডেন-২ সেরোটাইপের আধিপত্য ছিল। এবার ডেন-৩ সেরোটাইপ বেশি সক্রিয় হওয়ায় আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। কারণ, একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সেরোটাইপে পুনরায় সংক্রমিত হলে রোগের জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘ডেঙ্গুর সংক্রমণ কেবল রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় সব বিভাগেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। বর্ষার কারণে লার্ভাযুক্ত পানির পাত্রের সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। বাড়ির ভেতর-বাইরে ছোট ছোট পাত্র, ফুলের টব, প্লাস্টিকের বোতল, নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি কিংবা ড্রামের মতো উৎসে লার্ভার বিস্তার ঘটছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখনই জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। মশক নিধন কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিতভাবে চালাতে হবে। লার্ভার উৎস ধ্বংস ছাড়া এ রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আর ডেঙ্গুকে শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না। এ সমস্যা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, পরিবেশ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও জনগণ, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।’

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ায় শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে সারা দেশে শুরু হচ্ছে তিন মাসব্যাপী ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকাল ৯টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

Dengu_khulna
খুলনার হাসপাতালেও ঠাঁই নেই। চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।

দেশের সর্বত্র জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতসহ আশপাশের এলাকায় কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে নিয়মিত নজর দিতে হবে।’

ড. এম এ মুহিত বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা ও সম্মিলিত অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডেঙ্গুর বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে কোনো ধরনের অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট দফতর, প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি।

এসএইচ/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর