দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ডেঙ্গু। রাজধানীর পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় দ্রুত বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। কোথাও শয্যা না পেয়ে মেঝে-করিডোরে, কোথাও হাসপাতালের বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের।
সর্বশেষ একদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যু। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন। এটিও বছরের সর্বোচ্চ। গতকাল মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩০ জনে এবং আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ হাজার ৩৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এর আগে ১ সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩২৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। ওই দিন ও ২৩ আগস্ট পাঁচজন করে মারা গিয়েছিলেন।
পিরোজপুরে একই ওয়ার্ডে ডেঙ্গু ও সাধারণ রোগী
বরিশাল বিভাগের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি পিরোজপুরে। জেলা হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় তৈরি হয়েছে শয্যা সংকট। অনেক রোগীকে করিডোর ও মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। জায়গার অভাবে সাধারণ রোগীদের কাছাকাছিও রাখা হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীদের।
৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে ১ হাজার ৯৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৯০৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৯০ জন। এ বছর জেলায় ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
পিরোজপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রুমানা বেগম বলেন, সাধারণ রোগীর বেডের পাশেই ডেঙ্গু রোগী থাকায় তিনিও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। তার দাবি, ডেঙ্গু ও সাধারণ রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড থাকা প্রয়োজন।
পিরোজপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকেন। ডেঙ্গু পরীক্ষার এনএস-১ কিট, ওষুধ ও স্যালাইন পর্যাপ্ত রয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন।
সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন এবং বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার অ্যান্টিজেন কিট রাখা হয়েছে।
গাজীপুরে মেঝে-করিডোরেও রোগীতে পূর্ণ
ডেঙ্গুর হটস্পট হয়ে উঠছে গাজীপুরও। কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, টঙ্গী ও জয়দেবপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব বেড়েছে। জমে থাকা পানি, ময়লা-আবর্জনা এবং মশক নিধনে ঘাটতিকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা।
কোনাবাড়ীতে অল্প সময়ের ব্যবধানে তিন শিক্ষার্থীর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ রোববার ১৪ বছর বয়সী ইফতেখার হোসেন সিয়ামের মৃত্যু হয়। এর আগে ২৫ আগস্ট সুমাইয়া আক্তার ও ৪ সেপ্টেম্বর মোহনা আক্তার মারা যায়। এ ছাড়া কাপাসিয়ায় ১৭ বছর বয়সী আজিম খানও ডেঙ্গুতে মারা গেছেন।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত ১১৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত এখানে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৮২ জন। শয্যার সংকটে অনেক রোগীকে করিডোর ও মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
গাজীপুরের সিভিল সার্জনের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৭৭১টি পরীক্ষায় ১৩৬ জন ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছেন। ওই সময় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১৮৯ জন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে কোনাবাড়ীসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও অলিগলিতে মশার প্রকোপ বেড়েছে। অনেক জায়গায় জমে থাকা পানি সময়মতো অপসারণ করা হচ্ছে না। পাশাপাশি নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম না থাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত ডাবের দামও বেড়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। কয়েকজন এলাকাবাসী বলেন, চিকিৎসকরা ডেঙ্গু রোগীদের তরল খাবার খেতে বলেন। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় কোনাবাড়ী এলাকায় একটি ডাব ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগীর অনেক চাপ দেখা যায়। শয্যা সংকটে অনেক রোগীকে করিডোর বা মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কারও শরীরে জ্বর, কেউ দুর্বল হয়ে পড়েছেন, আবার কেউ ডেঙ্গুর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতেও অনেক রোগীকে মশারি ছাড়াই রাত কাটাতে দেখা গেছে।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সালমা আক্তার জানান, ভেতরে শয্যা না পেয়ে তাদের করিডোরে অবস্থান করতে হচ্ছে। অনেক সময় বিছানা কিংবা মশারিও পাওয়া যায় না।
অন্যান্য হাসপাতালেও রোগীর চাপ বাড়ায় চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যস্ততাও বেড়েছে কয়েক গুণ। তবে শয্যা সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (মেডিসিন) ডা. শেখ কামরুল করিম জানান, বর্তমানে হাসপাতালে ১১৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৫৮২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে মারা গেছেন তিনজন।
তিনি বলেন, হাসপাতালের বিদ্যমান শয্যায় সাধারণ রোগীর চাপ তো রয়েছেই। এর সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান জানান, গত সোমবার পর্যন্ত জেলার দুটি সরকারি হাসপাতাল ও পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩০৯টি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে পাওয়া ৪৬২টি পরীক্ষার প্রতিবেদনের মধ্যে ৯১ জন পজিটিভ হয়েছেন। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৭৭১টি পরীক্ষায় ১৩৬ জন ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছেন। ওইদিন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১৮৯ জন ডেঙ্গু রোগী।
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকারিভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত শয্যার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া সরকারি নির্দেশনায় হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
খুলনার হাসপাতালেও রোগীদের উপচেপড়া ভিড়
খুলনা বিভাগেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকটে রোগীদের বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালেও শয্যা না পেয়ে রোগীদের ফিরে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ৭ হাজার ৬৬০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা গেছেন ২৫ জন। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন ৮৭৮ জন।
সর্বশেষ একদিনে বিভাগে তিনজনের মৃত্যু এবং ২৪২ জন নতুন রোগী ভর্তির তথ্য জানিয়েছে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতর।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক শেখ মো. মোশারফ হোসেন বলেন, সরকারি হাসপাতাল বিশেষ করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি। আজ এখানে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। লোকবল সংকট থাকার পরও আমরা চেষ্ঠা করছি রোগীদের যথাসাধ্য সেবা দিতে।
বাড়ছে এডিসের প্রজননস্থল
ডেঙ্গু পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এডিস মশার প্রজনন। পিরোজপুরে আইইডিসিআরের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে গাছের গোড়া, ডাব ও নারিকেলের খোসা, বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, নালা ও নার্সারির টবে জমে থাকা পানিতে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে।
গাজীপুরেও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে বিটিআই প্রয়োগ শুরু করেছে সিটি করপোরেশন। প্রথমে নয়টি ওয়ার্ডে এবং পর্যায়ক্রমে ৫৭টি ওয়ার্ডে এ কার্যক্রম চালানোর কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হচ্ছে মশা নিয়ন্ত্রণ
ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালগুলো যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন মাঠপর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর হচ্ছে-সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
পিরোজপুর, গাজীপুর ও খুলনার হাসপাতালগুলোর চিত্র বলছে, ডেঙ্গু এখন শুধু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সংকট নয়, এটি চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, আক্রান্তদের চিকিৎসার পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ ও নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ পরিসংখ্যানও সেই আশঙ্কাই বাড়াচ্ছে-একদিনে মৃত্যু ও আক্রান্তের নতুন রেকর্ড দেখিয়ে ডেঙ্গু এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের বার্তা দিচ্ছে।
এমআর




