একসময় ডেঙ্গুকে মূলত রাজধানী ও বড় শহরের রোগ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সেই চিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা বিভাগীয় শহরের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহর এমনকি গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিভাগের সতর্কবার্তা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত মোট ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪১ জনে। আর মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ২২০ জনে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর বিস্তার এখন আর কেবল নগরকেন্দ্রিক নয়। ২০১৯ সালের পর দেশের বিভিন্ন শহর, আধা-শহর ও গ্রামাঞ্চলে রোগটির বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মানুষের ব্যাপক চলাচল, এডিস মশার উপস্থিতি এবং উপযুক্ত প্রজননস্থল—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে থাকায় নতুন নতুন এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ স্থায়ী হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানী বা বড় শহরে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি বাস, ট্রেন কিংবা অন্যান্য পরিবহনে নিজ এলাকায় ফিরে গেলে স্থানীয় এডিস মশা তাকে কামড়ানোর মাধ্যমে ভাইরাস বহন করতে পারে। পরে ওই মশা অন্য মানুষকে কামড়ালে সেখান থেকেই স্থানীয়ভাবে সংক্রমণের নতুন চক্র শুরু হয়।
এ কারণে শুধু রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা করলেই ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। আক্রান্ত ব্যক্তি, এডিস মশা এবং মশার প্রজননস্থল—তিনটির সমন্বয়েই নতুন এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এডিস মশা অল্প পরিমাণ জমে থাকা পরিষ্কার পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল, পুরোনো টায়ার, ডাবের খোসা ও ফুলের টবসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি হয়ে উঠতে পারে মশার প্রজননস্থল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নির্মাণস্থলে পানি জমে থাকা, অপর্যাপ্ত পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ায়। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনও এডিস মশার বংশবিস্তার ও টিকে থাকার পরিবেশকে প্রভাবিত করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগাম বৃষ্টি হলে বিভিন্ন পাত্র ও স্থানে পানি জমে এডিস মশার প্রজনন বাড়তে পারে। এসব পানি দ্রুত অপসারণ না করা হলে বর্ষা শুরুর আগেই সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা একাধিক গবেষণায় ডেঙ্গুর ভৌগোলিক বিস্তার ও মৌসুমি চরিত্রে বড় পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে দেশে ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টির ধরনে পরিবর্তন এবং বর্ষার সময়ের ওঠানামার সঙ্গে এডিস মশার জীবনচক্রেও পরিবর্তন আসছে। ফলে বছরের যে সময়কে আগে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হতো, সেখানেও এখন ডেঙ্গুর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।
ডেঙ্গুর বিস্তারের সাম্প্রতিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে। চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারী বৃষ্টি, পানি জমে থাকা, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ও ঘনবসতি—সবকিছু একসঙ্গে থাকলে এডিস মশার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধনে ফগিং করা হলেও শুধু এ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না হলে নতুন মশা জন্ম নিতেই থাকবে।
তাই বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশের এলাকায় জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ এবং এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, ডেঙ্গুর সম্ভাব্য ‘পিক’ সময় সামনে রেখে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের শুরুর দিকে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তিনি জানান, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা কমানো এবং মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণ—দুই লক্ষ্যেই একযোগে কাজ করা হচ্ছে।
এদিকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় আগামীকাল শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে সারাদেশে শুরু হচ্ছে তিন মাসব্যাপী ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামীকাল সকাল ৯টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় দেশব্যাপী এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
জেবি




