বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

হাসপাতালেই সংক্রমণের ঝুঁকি

পিরোজপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ, একই ওয়ার্ডে সাধারণ ও ডেঙ্গু রোগী

অহিদুজ্জামান, পিরোজপুর
প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৯ এএম

শেয়ার করুন:

পিরোজপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ, একই ওয়ার্ডে সাধারণ ও ডেঙ্গু রোগী

বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি পিরোজপুরে। জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় শয্যা ও জায়গার সংকট তৈরি হয়েছে। পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের অনেককে করিডোর ও মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। তাদের অনেকেই সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি অবস্থান করছেন।

এতে সাধারণ রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানো এডিস মশা অন্য ব্যক্তিকে কামড়ালে তারও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে ডেঙ্গু রোগীদের মশারির ভেতরে রাখা জরুরি।

সম্প্রতি পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের নির্ধারিত শয্যার পাশাপাশি মেঝেতেও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। জায়গার সংকটের কারণে সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি তাদের অবস্থান করতে হচ্ছে।

10e73ae7-4452-4797-a667-f33dabe89d61

পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রুমানা বেগম বলেন, ‘আমি পেটে ব্যথা নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে দেখি আমার বেডের পাশেই ডেঙ্গু রোগী শুয়ে আছেন। ডেঙ্গু রোগীদের কামড় দেওয়া মশা যদি অন্য সাধারণ রোগীদের কামড়ায়, তাহলে আমরাও তো ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে যাব। ডেঙ্গু, হাম ও সাধারণ রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষ বা ওয়ার্ড থাকা প্রয়োজন।’

ডেঙ্গু আক্রান্ত হাওয়া বেগম বলেন, হঠাৎ তীব্র জ্বর আসার পর তার পেট ফুলে যায়। হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। চিকিৎসা চললেও শারীরিক উপসর্গ পুরোপুরি কমেনি। এর মধ্যে হাসপাতালে জায়গার সংকটে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষে পিরোজপুর

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পিরোজপুরের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ৯৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৯০৫ জন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে জেলার হাসপাতালগুলোতে ৯০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন।

হাসপাতালভিত্তিক হিসাবে, পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ১ হাজার ৯৩ জন, ভান্ডারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৮৭ জন, নেছারাবাদে ৩৪৪ জন, নাজিরপুরে ১৭৪ জন, কাউখালীতে ১৩৪ জন, মঠবাড়িয়ায় ৯০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।

বর্তমানে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ৩২ জন, নাজিরপুরে ১৩ জন, নেছারাবাদে ১৯ জন, ভান্ডারিয়ায় ১৫ জন, কাউখালীতে ৭ জন এবং মঠবাড়িয়ায় ৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। জিয়ানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেই।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পিরোজপুরে একজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

3325760d-82a9-4d32-9722-d2058f4486f4

প্রতিবেশী এলাকা থেকেও আসছেন রোগীরা

পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে স্থানীয় রোগীদের পাশাপাশি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ থেকেও রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। পিরোজপুরের কাছাকাছি হওয়ায় মোরেলগঞ্জের বাসিন্দাদের অনেকে এ হাসপাতালে আসছেন বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।

মোরেলগঞ্জ থেকে আসা এক রোগীর স্বজন মো. কাওসার বলেন, তার স্ত্রীর ভাগনি অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুলে পরীক্ষা চলার সময় তার জ্বর আসে। পিরোজপুর হাসপাতালে নেওয়ার পর পরীক্ষা করানো হয়। তবে হাসপাতালে পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হয়েছে। পরে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। অসুস্থতার কারণে ওই শিক্ষার্থী তিনটি পরীক্ষা দিতে পারেনি।

আরেক রোগীর বাবা মো. মারুফ হাওলাদার বলেন, তার মেয়ের ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মেয়ের শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত ভিড়ে ভোগান্তি হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ভবন বা কক্ষের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

ac511a9b-c962-4e5c-924f-06d7e1b02f2d

মশারি ব্যবহার না করায় ঝুঁকি

হাসপাতালে জায়গার সংকটের পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীদের মশারি ব্যবহারে অনীহার বিষয়টিও দেখা গেছে। অনেক রোগীকে মশারি না টানিয়ে থাকতে দেখা যায়। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানো এডিস মশার মাধ্যমে অন্য রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

হাসপাতালের এক জ্যেষ্ঠ নার্স বলেন, রোগীদের নিয়মিত মশারির ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু অনেকে গরমের কারণে মশারি খুলে বাইরে বসে থাকেন। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।

f0f587a4-bdd4-4d31-83ef-13a63c0e66fb

এডিসের লার্ভার উপস্থিতি

পিরোজপুরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে সম্প্রতি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি দল মাঠপর্যায়ে কাজ করে। তাদের অনুসন্ধানে জেলার বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান।

তিনি বলেন, পিরোজপুরে প্রচুর সুপারি ও নারিকেলগাছ রয়েছে। গাছের গোড়ায় জমে থাকা পানি, ডাব ও নারিকেলের খোসা, বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, নালা এবং বিভিন্ন নার্সারির টবে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন

ভয়ানক রূপে ডেঙ্গু, একদিনে রেকর্ড ৯ জনের মৃত্যু

চিকিৎসাসেবা নিয়ে কর্তৃপক্ষ যা বলছে

পিরোজপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকেন। ডেঙ্গু পরীক্ষার এনএস-১ কিট, ওষুধ ও স্যালাইন পর্যাপ্ত রয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন।

সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন এবং বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার অ্যান্টিজেন কিট রাখা হয়েছে।

eb32dbf7-ca86-474a-8b68-8c91f5444210

পিরোজপুর পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান বলেন, ড্রেন ও নালায় লার্ভিসাইড স্প্রে করা হচ্ছে।

জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জলাশয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে। শহর ও উপজেলা সদরগুলোতেও নিয়মিত মশক নিধন অভিযান চলছে।

তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নেওয়া উদ্যোগের তুলনায় পরিস্থিতি বেশি গুরুতর। তাদের দাবি, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ইউনিট চালুর পাশাপাশি বাড়িঘর ও আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর