দেশে একসঙ্গে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে হাম ও ডেঙ্গুর পরিস্থিতি। হামের প্রকোপে প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছে শিশু, অন্যদিকে বর্ষা পেরিয়েও থামছে না এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর সংক্রমণ। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও পাঁচজন। পাশাপাশি দুই রোগেই আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদফতরের পৃথক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৭২ জন। এ ছাড়া সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে শনাক্ত হয়েছে আরও ১ হাজার ১৫৯ জন। সব মিলিয়ে নতুন রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ২৩১ জন।
একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৯৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৯৯ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৮৮০ জনের।
এ সময়ে দেশে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৩৮৪ জন। আর সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৫০ জন।
চলতি বছরে নিশ্চিত হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫১৯ জন শিশু। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৫৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
এর আগের দিন সোমবারও ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। ওই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছিল ১ হাজার ২৫৬ জন।
গণটিকার পরও কেন থামছে না হাম?
গণটিকা কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরও হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থাকায় প্রয়োজনীয় ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকার সংখ্যাগত হিসাব দিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন না করে টিকা প্রকৃতপক্ষে কোন কোন শিশুর কাছে পৌঁছেছে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। টিকাদান কার্যক্রমের তথ্য সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল করারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
গবেষণায় দেখা গেছে, হাম আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ এমন বয়সের, যখন তাদের নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়স এখনো হয়নি। পাশাপাশি টিকা নেওয়ার পরও কিছু শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। পুষ্টিহীনতা ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু, বাড়ছে মৃত্যু ও শনাক্ত
হামের পাশাপাশি ভয়াবহ হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতিও। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩২৪ জন, যা চলতি বছরে এক দিনে আক্রান্তের সর্বোচ্চ সংখ্যা।
মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০২ জনে। আর মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৭ হাজার ১৭০ জন।
আরও পড়ুন
হাম উপসর্গে আজও প্রাণ গেল ৬ শিশুর
এর আগের দিন সোমবার ডেঙ্গুতে চারজনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৯৭ জন আক্রান্ত হয়েছিল। তখন সেটিই ছিল চলতি বছরে এক দিনে আক্রান্তের সর্বোচ্চ সংখ্যা। এক দিনের ব্যবধানে সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুকে এখন আর শুধু বর্ষাকালীন বা রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় সংক্রমণও ছড়িয়ে পড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, অসময়ে বৃষ্টিপাত এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকছে। বাড়ির ছাদ, ছাদবাগান, ফুলের টব, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা, নির্মাণাধীন ভবনসহ নানা জায়গায় জমে থাকা স্বচ্ছ পানি এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের মশক নিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। বাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নাগরিকদেরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
হাসপাতালেও বাড়ছে চাপ
হাম ও ডেঙ্গু—দুই রোগেরই সংক্রমণ বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ নিয়ে চিকিৎসকদের উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে ডেঙ্গু রোগীদের একটি অংশ দেরিতে হাসপাতালে আসায় জটিলতা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বরকে সাধারণভাবে না দেখে রোগের অন্যান্য উপসর্গের দিকেও নজর দিতে হবে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, শ্বাসকষ্ট, রক্তপাত বা শরীরে অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
একইভাবে শিশুদের জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া, শরীরে র্যাশসহ হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে তাদের টিকা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিটি বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
জেবি




