- প্রেসক্রিপশন নজরদারি করবে স্বাস্থ্য বিভাগ
- নজরদারির জন্য থাকবে বিশেষজ্ঞ দল
- চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন সহজেই বিশ্লেষণ করা যাবে
- রোগীদের হয়রানি কমবে
সারাদেশে চিকিৎসকদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও টেস্ট লেখা বন্ধে ‘জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন’ চালু করবে সরকার। এর মাধ্যমে রোগীদের সুরক্ষা ও প্রেসক্রিপশন নজরদারি করবে স্বাস্থ্য বিভাগ। স্বাস্থ্যসেবাকে ঢেলে সাজানোর অংশ হিসেবে এই সেবা চালু করা হবে। এরমধ্যে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে সরকার।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারের ফলপ্রসূ একটি উদ্যোগ হবে। রোগী যেকোনো সময় নিজের ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন দেখতে বা ডাউনলোড করতে পারেন। এই ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে চিকিৎসকদের দেওয়া প্রেসক্রিপশন সহজেই বিশ্লেষণ করা যাবে। এতে চিকিৎসকদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও টেস্ট লেখা বন্ধ হবে। ভুল কোনো সিদ্ধান্ত রোগীকে ডাক্তার দিয়েছে কিনা ধরার ক্ষেত্রে এটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে। এতে রোগীদের হয়রানি কমে আসবে।
জানা গেছে, ই-প্রেসক্রিপশন চালু হলে স্বাস্থ্য বিভাগে নজরদারি করার জন্য থাকবে আলাদা বিশেষজ্ঞ দল। তারা যেকোনো সময় চাইলে দেশের যেকোনো চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ইন্টারনেট থেকে নিয়ে যাচাই-বাছাই করতে পারবেন। কোনো রোগীর অভিযোগ থাকলে তা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দেখতে পারবেন।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, ই-প্রেসক্রিপশন ধারণাটা বাংলাদেশে নতুন, যদিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রেসক্রিপশনের ব্যবহার রয়েছে। বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢেলে সাজাতে চায় সরকার। স্বাস্থ্যখাতে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তার মধ্যে একটি হবে জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন সেবা বাস্তবায়ন করা। নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে স্বাস্থ্যকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করবে। জনপ্রিয় কোনো সিদ্ধান্ত নয়, সত্যিকার অর্থে মানুষের উপহারে কাজ করবে স্বাস্থ্য বিভাগ।
বিজ্ঞাপন

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-প্রেসক্রিপশন সেবা চালু করাটা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে। একদিকে যেমন চিকিৎসকদের চাপ থাকবে, অন্যদিকে ব্যয়বহুল খরচও রয়েছে। কেননা, ই-প্রেসক্রিপশন সফল করতে হলে প্রচুর বাজেট প্রয়োজন। এছাড়া কোনো চিকিৎসকই চাইবে না তাকে নজরদারি করা হোক।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, চিকিৎসকদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা কমাতে ই-প্রেসক্রিপশন চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। এটি স্বাস্থ্যসেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং রোগীর নিরাপত্তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; এর সঙ্গে জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা (Therapeutic Guidelines), ক্লিনিক্যাল অডিট, শক্তিশালী রেফারেল ব্যবস্থা এবং চিকিৎসকদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ই-প্রেসক্রিপশনের লক্ষ্য হতে হবে চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং অ্যাভেড্যান্স বেজড মেডিসিন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সঠিক রোগীর জন্য সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষা ও সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল ঢাকা মেইলকে বলেন, চিকিৎসকদেরকে নিজ থেকে আগ্রহী হতে হবে আমরা অতিরিক্ত ওষুধ লিখবো না। বাড়তি ওষুধ কী লিখে যেমন- একটা অ্যান্টিবায়োটিক লিখলে দুইটা মিটামিন লিখে, একটা ক্যালসিয়াম লিখে; যেগুলো প্রয়োজন নেই সেগুলো লিখতেছে। অ্যান্টিবায়োটিক একটার জায়গায় দুইটা লিখে।
তিনি বলেন, ই-প্রেসক্রিপশনের সুবিধা হলো সরকার যেকোনো সময় নজরদারি করতে পারবে। কে, কোথায় লিখতেছে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, তখন সরকার চাইলে নোটিশ পাঠাতে পারবে। ডাক্তাররা যা লেখার, তা লিখতেই থাকবে। তবে ডাক্তারদের নৈতিকতার কথা চিন্তা করে অতিরিক্ত ওষুধ বা টেস্ট লেখা বন্ধ করতে হবে। ডাক্তাররা বাড়তি টেস্ট বেশি লিখে, এতে তারা কমিশন পান। অতিরিক্ত টেস্ট লেখা বন্ধ হলে কমিশন বন্ধ হবে। ই-প্রেসক্রিপশন চালু হলে ওষুধ-টেস্ট লেখায় ডাক্তাররা সচেতন হয়ে যাবেন। কেননা, কর্তৃপক্ষ ডাক্তারদের পর্যবেক্ষণ করবে।

অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে খুবই ভালো হবে। স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দীর্ঘ দিনের অসন্তোষ অনেকটা কমে আসবে। প্রথম ডাক্তারকে দেখানোর পর দ্বিতীয় ডাক্তারকে দেখাতে গেলে ইন্টারনেট থেকে দ্বিতীয় ডাক্তার বিস্তারিত দেখতে পারবেন। রোগী হিসেবে রোগী সব ওষুধ আর টেস্টের কাগজপত্র বহন করে নিয়ে যেতে হবে না। দ্বিতীয় ডাক্তার আর অযথা নতুন করে টেস্ট করতে দেবে না, যেটা আগের ডাক্তার লিখে ফেলেছে। এই দিক দিয়ে ভালো হবে। রোগীদের মাঝেও গ্রহণযোগ্য হবে এই সিস্টেম।
তিনি বলেন, এটি সারাদেশে বাস্তবায়ন করতে হলে আগে ছোট একটা জায়গায় পরীক্ষামূলক চালু করা উচিত। একসঙ্গে সারাদেশে ই-প্রেসক্রিপশন চালু করা ঠিক হবে না। যারা অযথা ওষুধ আর টেস্ট লিখবে তাদেরকে ফিডব্যাক দিতে হবে। তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে আপনি কেন অতিরিক্ত ওষুধ আর টেস্ট লিখতেছেন রোগীর অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে এবং জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। ডাক্তার যেন বুঝতে পারে আমাকে তদারকি করা হচ্ছে। এটি হবে ভালো ও কার্যকরী উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আব্দুল হামিদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ই-প্রেসক্রিপশন চালু হলে ইলেট্রনিক একটা প্রেসক্রিপশন থাকবে ডাক্তাররা লিখে রোগীকে প্রিন্ট করে দেবে। এতে রোগীরা প্রিন্ট করা প্রেসক্রিপশন পাবে এবং ডাটাবেজ সংরক্ষিত থাকবে। এই পদ্ধতি চালু করতে হলে হাসপাতালগুলোকে অটোমেশন করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে কম্পিউটার, সার্ভার এবং ম্যানটেইন্যান্স থেকে শুরু করে প্রচুর বাজেট প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে সব টেস্ট করার সুযোগ দেওয়া হলে আর এমনিতেই ডাক্তাররা অতিরিক্ত টেস্ট লিখবে না। ওষুধের ক্ষেত্রেও একই কথা। বেসরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত ওষুধ ও টেস্ট দেওয়া হয়। অনেক বেসরকারি হাসপাতালই বাধ্য করে বেশি বেশি টেস্ট লিখতে। আর সাধারণত সরকারি হাসপাতালে ডাক্তাররা ওষুধ আর টেস্ট লেখেন না।
অধ্যাপক ড. আব্দুল হামিদ বলেন, ই-প্রেসক্রিপশন চালু হলে রোগীরা স্ট্যান্ডার্ড প্রেসক্রিপশন পাবে এবং ডাক্তারদেরও ভালো প্রেসক্রিপশন লেখার সুযোগ হবে। এটা আমরা চাই এবং হোক। এটা চাওয়ার জন্য যে ইকো-সিস্টেম দরকার, তা পুরোপুরি রেডি না হলে উদ্যোগটাই বৃথা যাবে। শক্তিশালী ইন্টারনেট সেবা এবং নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা থাকতে হবে। ডাক্তার ও অন্যান্য সেসব জনবল ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো পূরণ করতে হবে। সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এই পদ্ধতি চালু করতে হবে। তাহলে জনগণ সুফল পাবে। সরকার অনেক কিছু করতে চায়, উদ্যোগও ভালো; তবে বিষয়টা বুঝে করতে হবে।
এসএইচ/এএস




