দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যসেবার জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ০১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর প্রকৃত সুফল পেতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
তারা বলছেন, বড় আকারে বাজেট প্রণয়ন একদিকে ইতিবাচক, অন্যদিকে অনিয়ম-দুর্নীতি আর অপচয় কমানোও চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্যখাতে লুটপাট কমাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের বিকল্প নেই। এছাড়া বাজেটের পুরোটা যথাযথ ব্যবহার করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে কেউ দুর্নীতি বা অনিয়ম করার সাহস না পায়। আর কেউ করলে তাকে যথাযথ শাস্তি দিতে হবে।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি খাতের দিকেও নজর দিতে হবে। অনেক বেসরকারি হাসপাতালের রেজিস্ট্রেশনও ঠিক মতো নেই। অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনায় ভরা স্বাস্থ্যখাত। শুধু বাজেট বৃদ্ধি ম্যাজিক নয় এবং সমাধানও নয়, এটি অপচয় বা অব্যবহৃত থাকতে পারে।’
ব্যবসায়ী ও রোগীদের জন্য স্বস্তি
বাজেটের মধ্যে ব্যবসায়ী ও রোগীদের জন্য স্বস্তির খবর দিয়েছে সরকার। বাজেটে স্থানীয়ভাবে ওষুধ তৈরির মূল উপাদান বা এপিআই উৎপাদনে গতি আনতে নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ওষুধের আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামালকে রেয়াতি সুবিধার আওতায় এনে শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া মেডিকেল ইকুইপমেন্ট বা চিকিৎসা যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎপাদনকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা দেবে সরকার। দেশে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী শিল্পের অতি প্রয়োজনীয় কিছু কাঁচামাল আমদানিতে ১৫ শতাংশ এবং অন্যান্য কিছু কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত করতে এই প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ আগামী ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
সরকারি চিকিৎসা বঞ্চিত ৬৫% মানুষ, নাগালের বাইরে যাচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা
কাঁধে সেবার ভার, তবু পদে পদে বঞ্চিত চিকিৎসকরা
বর্তমান বাজেটে কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানো হয়েছে, ক্যানসারের আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ দেশে তৈরি এবং চিকিৎসা যন্ত্রাংশের কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চায় সরকার।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করায় গুরুত্ব
বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং রোগ প্রতিরোধভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাকে আধুনিক ও কার্যকরভাবে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সরকার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কেবল চিকিৎসানির্ভর না রেখে প্রতিরোধমূলক ও জনকেন্দ্রিক করতে চায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং এটি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিগগিরই ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।’
এই চিকিৎসক বলেন, ‘শুধু বড় বড় হাসপাতাল ভবন নির্মাণ বা ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি কেনার ওপর নির্ভর না করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো শক্তিশালী করাই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’
তার মতে, সারাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে অনন্য মাত্রায় আনতে হলে প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো এবং বাস্তবায়ন। এতে ফলভোগী হবে দেশের মানুষ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে একটি স্ট্রাকচার দরকার। তিনি বলেন, আমি বলেছি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পাবলিক হেলথ কেয়ারের একটি অধিদফতর করা প্রয়োজন। সেই পরিমাণে সামর্থ্য গড়ে তোলা এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস করা, জনবল নিয়োগ করা এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিলে জনগণের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আসবে।
ডা. লিয়াকত আলী বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা হবে, সেগুলোকে গ্রাম পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। রোগীরা যাতে অপ্রয়োজনে সরাসরি টারশিয়ারি হাসপাতালে না যান, সেজন্য উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। সরকারের পরিকল্পনা হলো, একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা জনগণের আরও কাছে পৌঁছে দেওয়া।’
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে পরিচালনা বা সেবা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর ছাড়া আলাদা কোনো অধিদফতর নেই। বর্তমান অধিদফতর থেকে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কাজেই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও তত্ত্বাবধান এবং মনিটরিং করতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতিমুক্ত রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ।
তার মতে, আগেও স্বাস্থ্যের বাজেটকে পুরোপুরি ব্যবহার করা হতো না। অনেক অংশ ফেরত গেছে এবং সামর্থে্যর অভাবে অব্যবহৃত থেকে গেছে। বাজেট পুরোপুরি ব্যবহার করাটা প্রধান চ্যালেঞ্জ। এবারের বাজেটে মারাত্মক রোগের চিকিৎসা সহায়তাও বাড়ানো হয়েছে। পরিকল্পনাগুলো সুনিপুণভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মানুষ উপকারভোগী হবে এবং সত্যিকার অর্থে ফল পাবে।
সত্যিকার অর্থে স্বাস্থ্যখাতের উন্নতির তাগিদ
টাকার অংকে বাজেট বাড়ালেই হবে না, সত্যিকার অর্থে স্বাস্থ্যখাতের উন্নতির তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বাড়ানো হয়েছে। এটা কতটুকু হিসাব-নিকাশ করে প্রণয়ন করা হলো এবং এই বাজেট দিয়ে স্বাস্থ্যখাতের কী অর্জন করতে চাই, নানা ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। হাসপাতালে রোগীদের আগের চেয়ে বেশি করে ওষুধ দিতে পারব তো? কিংবা রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বেশি করতে পারব কি না? এই ধরনের লক্ষ্য থাকতে হবে। শুধু টাকার অংক বাড়ালেই হবে না। সত্যিকার অর্থে স্বাস্থ্যখাতের উন্নতি করতে হবে।
আরও পড়ুন
পূর্বাচলে হচ্ছে বিএমইউর অত্যাধুনিক ক্যাম্পাস, থাকবে এআইভিত্তিক চিকিৎসা
হতাশায় বাড়ছে বিদেশমুখিতা, দক্ষ নার্স হারাচ্ছে দেশ
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, এত টাকা বাজেট বাড়ানোর পরও যদি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি না হয়, তাহলে কোনো কাজ হলো না। অর্থাৎ বাজেট কেন প্রণয়ন করা হয়েছে এবং কী কী লক্ষ্য ধরে কাজ করা হবে, সেটাও মাথায় রাখতে হবে। বাজেটকে পূর্ণাঙ্গভাবে খরচ করতে হবে মানুষের কল্যাণে। বাজেট দেওয়া হচ্ছে এক বছরের জন্য, দেখতে দেখতেই সময় চলে যাবে। ক্রয়ের যে ব্যাপারগুলো আছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্রয় করতে আমাদের অনেক সময় লাগে, এটার জন্য প্রস্তুতি কতটুকু। কত দ্রুত পণ্য আমরা কিনতে পারব। ধরেন, কোনো ওষুধ কেনা হলো আগামী মার্চ মাসে, তার মানে এই ওষুধগুলো ব্যবহার করার জন্য মাত্র তিন মাস সময় পাচ্ছি, তাহলে লাভ হলো না। এটা দরকার বছরের শুরুতেই, জুলাই-আগস্টের মধ্যে কিনতে হবে। এটা করা গেলে বাকি সময় ব্যবহার করা যাবে।
ঠেকাতে হবে লুটপাট, সেবা পৌঁছাতে হবে তৃণমূলে
দেশে যেসব খাতে ব্যাপক লুটপাট হয়, এর একটি স্বাস্থ্যখাত। টেন্ডার থেকে শুরু করে কেনাকাটা- প্রতিটি ধাপে অনিয়ম হয়। এজন্য স্বাস্থ্যখাতকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, যে অর্থটা বরাদ্দ দেওয়া হবে, সেগুলোতে অনিয়ম দুর্নীতি হতে দেওয়া যাবে না। এটার জন্য আমরা কতটুকু প্রস্তুত। আমরা এখন পর্যন্ত কোনো সেক্টরে এমন কোনো প্রস্তুতি দেখছি না, যাতে দুর্নীতি আর অনিয়ম কমানো যায়। এটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। দুর্নীতি ও অনিয়মমুক্ত রাখতে হবে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, উপজেলা হলো আমাদের তৃণমূল। বাজেট দিতে হবে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাতে সর্বাত্মক চিকিৎসা দেওয়া যায় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পর্যাপ্ত ওষুধপত্র রাখতে হবে। সেইসঙ্গে জনবলের ঘাটতি রাখা যাবে না। তাহলে তৃণমূলের চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করা যাবে। এছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটিগুলোকে ঠিক মতো চালাতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন-ভাতা ইত্যাদি বাড়াতে হবে। যাতে তারা ভালোভাবে সেবা দেয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, এ বছরের বাজেট খুব ভালোভাবে ব্যবহার করে আগামী বছরও যাতে বাজেট বাড়ে, সেজন্য এর সদ্ব্যবহার করতে হবে। তাহলে আমরা বলতে পারব, এই সরকারের সময়ে বাজেট প্রণয়ন এবং ব্যবহার আগের চেয়ে ভালো হয়েছে।
এসএইচ/জেবি




