বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ঢাকা

৬ নবজাতকের মৃত্যু স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা: ডা. নাজমুল হুদা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪ জুন ২০২৬, ০১:১৪ পিএম

শেয়ার করুন:

৬ নবজাতকের মৃত্যু স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা: ডা. নাজমুল হুদা

রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাকে দেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন জনস্বাস্থ্য ও হাইপারবেরিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কর্নেল (অব.) ডা. নাজমুল হুদা খান। তার মতে, এ ধরনের ঘটনা কোনো একক কারণের ফল কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক তদন্ত জরুরি।

মঙ্গলবার (৪ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায় তিনি বলেন, একই সময় ও একই স্থানে একাধিক নবজাতকের মৃত্যু চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ক্লাস্টার নিওনেটাল ডেথ’ বা ‘সেন্টিনেল ইভেন্ট’। এমন ঘটনায় তড়িঘড়ি করে কারণ নির্ধারণ না করে ক্লিনিক্যাল, কারিগরি, ফরেনসিক ও প্রশাসনিক— সব দিক থেকে তদন্ত করতে হবে।


বিজ্ঞাপন


ডা. নাজমুল হুদা জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বর্ণনা অনুযায়ী, পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে থাকা ছয় নবজাতক এসি পুনরায় চালুর পর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং পরে তাদের মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে এসির গ্যাস লিকেজের বিষয়টি আলোচনায় এলেও কেবল এটিকেই দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট নয়।

তার বিশ্লেষণে সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মেডিকেল গ্যাস পাইপলাইনের ত্রুটি, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা, রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস লিকেজ, কার্বন মনোক্সাইড বা অন্য কোনো বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি, ভেন্টিলেশন ও বৈদ্যুতিক ত্রুটি এবং পরিবেশগত বা সিস্টেমজনিত অন্য কোনো সমস্যা।

তিনি বলেন, হাসপাতালের কেন্দ্রীয় গ্যাস লাইনে অক্সিজেনের পরিবর্তে অন্য গ্যাস প্রবাহিত হলে নবজাতকদের শরীরে দ্রুত অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। একইভাবে অক্সিজেন ট্যাংক, ম্যানিফোল্ড বা পাইপলাইনের ত্রুটির কারণেও একসঙ্গে একাধিক রোগী আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এসি থেকে নির্গত রেফ্রিজারেন্ট গ্যাসের বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। তার ভাষ্য, বদ্ধ কক্ষে বড় ধরনের গ্যাস লিকেজ হলে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে, যা নবজাতকদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। তবে চিকিৎসা ইতিহাসে শুধুমাত্র এসির গ্যাস লিকেজের কারণে এ ধরনের ক্লাস্টার মৃত্যু তুলনামূলকভাবে বিরল।


বিজ্ঞাপন


নবজাতকদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কথা তুলে ধরে ডা. নাজমুল হুদা বলেন, তাদের ফুসফুস অপরিপক্ব থাকে, শরীরে অক্সিজেনের মজুত কম থাকে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিকশিত হয় না। ফলে পরিবেশগত সামান্য ত্রুটিও দ্রুত প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

ঘটনার তদন্তে কী কী বিষয় গুরুত্ব পাওয়া উচিত তাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তার মতে, আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নথি, রক্ত পরীক্ষার ফলাফল, রিসাসিটেশন রেকর্ড, চিকিৎসক ও নার্সদের পর্যবেক্ষণ, এসি ও ভেন্টিলেশন সিস্টেম, মেডিকেল গ্যাস লাইন, অক্সিজেনের বিশুদ্ধতা এবং কক্ষের পরিবেশগত অবস্থা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ, রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারও তদন্তের আওতায় আনা উচিত।

তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সিলগালা, মেডিকেল গ্যাস লাইন পরীক্ষা, এসি ও ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুপারিশ করেছেন তিনি।

দীর্ঘমেয়াদে হাসপাতালগুলোতে মেডিকেল গ্যাস লাইন অডিট বাধ্যতামূলক করা, অক্সিজেনের বিশুদ্ধতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, এনআইসিইউ নিরাপত্তা চেকলিস্ট চালু, ডিজিটাল রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়মিত সিমুলেশন ড্রিল পরিচালনার আহ্বান জানান এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

ডা. নাজমুল হুদা বলেন, ছয় নবজাতকের মৃত্যু শুধু একটি হাসপাতালের ট্র্যাজেডি নয়, এটি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রকৃত কারণ উদঘাটন, দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং হাসপাতালগুলোর প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদার না করলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকবে।

এমএইচ/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর