বর্তমানে আলোচিত একটি রোগের নাম থাইরয়েড। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে থাইরয়েড আক্রান্ত রোগী। থাইরয়েডের সমস্যা পুরুষের তুলনায় নারীদের বেশি হয়।
দেশে থাইরয়েডের নীরব বিস্তার হলেও রোগটি নিয়ে তেমন সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। থাইরয়েডের কারণে দেখা দেয় শারীরিক নানা জটিলতা। সেইসঙ্গে সচেতনতায় পারে থাইরয়েড প্রতিরোধের শক্তিশালী মাধ্যম হতে এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং আয়োডিন ঘাটতির কারণে দিন দিন বাড়ছে থাইরয়েড। হাইপোথাইরয়েডিজম ও হাইপারথাইরয়েডিজম—এই দুই ধরনের সমস্যাই বর্তমানে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকাল, গর্ভাবস্থা এবং মেনোপজের সময় নারীদের শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে এ ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ক্লান্তি, ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, চুল পড়া, অনিদ্রা, অতিরিক্ত ঘাম কিংবা বিষণ্নতার মতো উপসর্গ দেখা দিলেও রোগীরা শুরুতে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না।
ফলে দীর্ঘদিন অচিহ্নিত থেকে জটিলতা বাড়তে পারে। চিকিৎসকদের পরামর্শ, এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত থাইরয়েড পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত আয়োডিনযুক্ত খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ কমানোর মাধ্যমে এ রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ না করার বিষয়েও সতর্ক করছেন তারা। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে থাইরয়েড আক্রান্ত ব্যক্তিরাও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪ কোটি মানুষ থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি। থাইরয়েড আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি সাত জনের মধ্যে ৫ জনেই নারী। প্রতি দুই হাজার ৩০০ শিশুর মধ্যে একজন জন্মগত থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছে। আক্রান্তদের ৬০ শতাংশ চিকিৎসা সেবার আওতার বাইরে।
গবেষণায় দেখা গেছে, থাইরয়েড রোগ বিস্তারে বংশগতির প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে দাদি, নানি বা মায়ের থাইরয়েডে সমস্যা থাকলে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশু ও আত্মীয়স্বজনের থাইরয়েড সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৮ শতাংশ রোগী সাব-ক্লিনিক্যাল হাইপোথাইরয়েডিজমে ভুগছে। তাদের অধিকাংশই জানে না যে, তাদের থাইরয়েড সমস্যা রয়েছে। দেশের শহর ও গ্রামে বসবাসকারী ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত। কিন্তু এদের অনেকেই জানেন না যে তারা এই সমস্যায় ভুগছেন।
জানতে চাইলে নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মাহবুব আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, মেটাবলিজম মন্থর হয়ে যায়। ফলে অতিরিক্ত ক্লান্তি, অল্পতেই ওজন বৃদ্ধি, কোষ্ঠকাঠিন্য, অতিরিক্ত শীত লাগা, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চুল পড়া এবং নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের অনিয়ম বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে। সেইসঙ্গে শরীরের মেটাবলিজম অস্বাভাবিক দ্রুত হয়। ফলে বুক ধড়ফড় করা (Palpitations), অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, গরম সহ্য করতে না পারা, খাওয়া সত্ত্বেও দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, হাত কাঁপা এবং চোখের মণি বড় হয়ে যাওয়া (এক্সোপথালমস)।
আরও পড়ুন: মুগদা মেডিকেলে এক হাজার শয্যার অনুমোদন
তিনি বলেন, রোগীরা তীব্র অবসাদ (ডিপ্রেশন), অলসতা, মনোযোগের অভাব এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাসের (ব্রেইন ফগ) সমস্যায় ভোগেন। অনেক সময় এটিকে সাধারণ মানসিক রোগ ভেবে ভুল করা হয়। সেইসঙ্গে রোগী প্রচণ্ড খিটখিটে মেজাজের হয়ে পড়েন, বিনা কারণে উদ্বেগ (এনক্সাইটি), প্যানিক অ্যাটাক এবং তীব্র অনিদ্রায় (ইনসমনিয়া) ভোগেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যখন ভুলবশত থাইরয়েড গ্রন্থিকে আক্রমণ করে। যেমন— হাশিমোটোস থাইরয়েডাইটিস (যার ফলে হাইপোথাইরয়েড হয়) এবং গ্রেভস ডিজিজ (যার ফলে হাইপারথাইরয়েড হয়)। সেইসঙ্গে খাদ্যতালিকায় আয়োডিনের তীব্রতা/অভাব হলে থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যায়, যাকে সাধারণ 'গয়টার' বা গলগণ্ড বলা হয়।
পরিবারে কারও থাইরয়েডের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এছাড়া ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে থাইরয়েড গ্রন্থির প্রদাহ হয় এবং থাইরয়েড গ্রন্থিতে ছোট ছোট সিস্ট বা টিউমার (যা বিনাইন বা ম্যালিগন্যান্ট হতে পারে)।
তারা বলছেন, যদিও অটোইমিউন বা বংশগত কারণগুলো সরাসরি রোধ করা সম্ভব নয়, তবে কিছু সচেতনতার মাধ্যমে ঝুঁকি ও জটিলতা কমানো যায়। রান্নায় সঠিক পরিমাণে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করতে হবে (মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত আয়োডিনও ক্ষতিকর)।
সেইসঙ্গে বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, নবজাতক এবং পরিবারে থাইরয়েডের ইতিহাস থাকলে নিয়মিত বিরতিতে রক্ত পরীক্ষা (TSH, FT_4) করতে হবে। এছাড়া পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট (কারণ অতিরিক্ত মানসিক চাপ থাইরয়েডের হরমোন নিঃসরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে)।
ডা. মাহবুব আলম বলেন,হুট করে ওজন পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, মেজাজের তীব্র ওঠানামা বা গলায় কোনো চাকা/ফোলা ভাব) যেকোনো একটি দেখা দিলেই দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (ENT সার্জন বা এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট) পরামর্শ নিয়ে রক্তে হরমোনের মাত্রা এবং প্রয়োজনে গলার আল্ট্রাসনোগ্রাম (ইউএসজি অব থাইরয়েড) করানো উচিত।
তিনি বলেন, যদি গলায় কোনো নোডিউল বা চাকা খুব দ্রুত বড় হতে থাকে, চাকাটি স্পর্শ করলে শক্ত লাগে এবং এটি আশেপাশের মাংসপেশির সাথে আটকে থাকে, তাহলে এটি ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া থাইরয়েড গ্রন্থি বা টিউমারটি যদি বড় হয়ে শ্বাসনালী (ট্রাচিয়া) বা খাদ্যনালীকে (ইসোপাগাস) চাপ দেয়, যার ফলে শ্বাসকষ্ট হওয়া বা খাবার গিলতে অসুবিধা হয় এবং গলায় চাকার পাশাপাশি যদি হঠাৎ রোগীর কণ্ঠস্বর ভেঙে যায় বা পরিবর্তন হয়, তবে তা থাইরয়েড ক্যান্সারের কারণে 'রিকারেন্ট ল্যারিন্জিয়াল নার্ভ' আক্রান্ত হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ হতে পারে।
সেইসঙ্গে থাইরয়েড হাইপারথাইরয়েডিজম চরম আকার ধারণ করলে 'থাইরয়েড স্ট্রম' হতে পারে, যাতে রোগীর তীব্র জ্বর, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন এবং প্রলাপ বকার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
অন্যদিকে, হাইপোথাইরয়েডিজম চিকিৎসা না করালে 'মাইক্সেডেমা কমা' হতে পারে, যেখানে রোগীর শরীরের তাপমাত্রা ও রক্তচাপ মারাত্মক কমে যায় এবং রোগী অচেতন হয়ে পড়তে পারে। দুটি ব্যবস্থাপনাই আইসিইউ (ICU) সাপোর্ট দাবি করে।
ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহজাদা সেলিমের মতে, অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা লক্ষণগুলোকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন। ফলে রোগটি দীর্ঘদিন অজানা থেকে যায় এবং পরে গুরুতর আকার ধারণ করে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সচেতনতা এবং প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয়ই থাইরয়েডজনিত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
তিনি বলেন, থাইরয়েডের কারণে এত ক্ষয়ক্ষতি হলেও রোগটি নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। অনেকটা নীরবেই ঘাতকের মতো ক্ষতি করে যাচ্ছে। দেশের প্রায় চার কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে রোগটিতে আক্রান্ত। এ রোগ মোকাবিলায় সবার মধ্যে সচেতনতার বিকল্প নেই।
ডা. শাহজাদা সেলিম জানান, সারা দেশের মানুষকে যুক্ত করে এখনো কোনো গবেষণা হয়নি যে কত মানুষের থাইরয়েড সমস্যা আছে। ভারতের কলকাতায় মোট জনসংখ্যার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে এখনো দুই কোটির বেশি মানুষ থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রে এখনো ৬০ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়নি।
ডায়াবেটিসে ৫৭ শতাংশ শনাক্ত হয়নি। এ থেকে থাইরয়েডের অবস্থা বোঝা যায়। আমরা যা দেখছি, তা বাইরে থেকে একটা ক্ষুদ্র অংশকে দেখছি। আমরা যদি সব দেশকে যুক্ত করি, এখানে কিন্তু সমুদ্রের সঙ্গে নৈকট্যের বা পাহাড়ের সঙ্গে দূরত্বের একটা সম্পর্ক আছে।
আমরা জানি, বাংলাদেশের সমুদ্র থেকে যত উত্তর দিকে যেতে থাকি, তত আয়োডিনের পরিমাণ কমতে থাকে। বিশ্বে ৭০ কোটির বেশি মানুষ থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত। শুধু চীনেই ১৩ কোটির বেশি মানুষ আক্রান্ত থাইরয়েড রোগে। ভারতে আক্রান্ত সাত থেকে আট কোটি মানুষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে থাইরয়েড সমস্যা নির্ণয় করা গেলে তা খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু সচেতনতার অভাব, উপসর্গ উপেক্ষা করা এবং সময়মতো পরীক্ষা না করানোর জন্য অনেক সময় বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। থাইরয়েড সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি।
সেইসঙ্গে থাইরয়েডের বেশিরভাগ সমস্যাই সঠিক সময়ে শনাক্ত হলে ওষুধের মাধ্যমে এবং প্রয়োজনে আধুনিক সার্জারির (যেমন দাগহীন এন্ডোস্কোপিক থাইরয়েডেক্টমি) মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময় বা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
এসএইচ/এআরএম




