দেশে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে হাম। ভাইরাস জনিত এই ছোঁয়াচে রোগ এরই মধ্যে খালি করেছে চার শতাধিক মা-বাবার বুক। প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে। আক্রান্তও হচ্ছে শয়ে শয়ে। যা সারাদেশে রীতিমতো ত্রাস সৃষ্টি করেছে।
রোববার (১০ মে) স্বাস্থ্য অধিদফতরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে আরও ১১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৭০৮ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্য অধিদফতর আরও জানায়, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৩৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৬৫ শিশুর। এছাড়া দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ১৫৯ জনে।
আরও পড়ুন: হাম ও উপসর্গে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু
এত অল্প সময়ে এত শিশুর মৃত্যু, এর দায় নিতে যাচ্ছে না কেউই। সবাই একে-অন্যের ওপর দায় চাপাচ্ছে। বর্তমান সরকারসহ সাধারণ মানুষদের একটা শ্রেণি শূলে চড়াচ্ছে মাস দুয়েক আগে বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারকে।
আবার একটি রাজনৈতিক দল এবং তাদের কর্মী সমর্থকরা দায় চাপাচ্ছে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার ও বর্তমান বিএনপির সরকারের ওপর। কিন্তু দায় আসলে কার?
বিজ্ঞাপন
হাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ
চার শতাধিক শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া সংক্রামক রোগ হাম নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে বিশ্বব্যাপী শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, সুরক্ষা এবং অধিকার রক্ষায় কাজ করা ইউনিসেফ সতর্ক করেছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়।
এছাড়া সম্প্রতি এ নিয়ে দেশের একটি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেন ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া।
সেখানে তিনি জানান, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার হামের ৫০ শতাংশ টিকা ওপেন টেন্ডার মেথডে (উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি) কেনার বিষয়টি বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফ ও তাদের অংশীদারেরা তখন উদ্বেগ জানায় যে, এই প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক ক্রয়প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে।
আরও পড়ুন: কিট স্বল্পতা, জটিল হচ্ছে হাম পরিস্থিতি
এসব উদ্বেগ সত্ত্বেও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে এগোনোর সিদ্ধান্ত বহাল রাখে ইউনূস সরকার। দুঃখজনকভাবে এ সিদ্ধান্তের ফলে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ঘটে। ২০২৫ সালে ইউনিসেফ আগাম অর্থায়নের ব্যবস্থা করে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করে, যাতে তীব্র সংকট মোকাবিলা করা যায়। এর ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কিছু টিকার মজুত বজায় রাখা সম্ভব হয়।
তবে কিছু টিকার ক্ষেত্রে এর আগেই মজুত শেষ হয়ে যায় এবং কিছু টিকার ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থছাড়ে বিলম্ব এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে টিকা সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়। কারণ, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ সম্পন্ন করা যায়নি এবং অন্তর্র্বতী সরকার ইউনিসেফকে বরাদ্দ দেওয়া অর্থও ছাড় করতে পারেনি। ফলে শিশুদের সময়মতো হামের টিকাও দেওয়া যায়নি।
বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীও দায়ী করেছেন বিগত সরকারকে
অতীত সরকারগুলোর ব্যর্থতার কারণে হাম নিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং প্রাদুর্ভাব বেড়েছে বলে গত ২০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
পাশাপাশি তিনি জানান, ‘সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাবের সময়ও দেশ প্রস্তুত ছিল না। আমাদের টিকার মজুদ ছিল না। বর্তমানে ইউনিসেফ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় এই টিকাদান কর্মসূচি সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।’
আরও পড়ুন: হামের ১৫ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন পেল বাংলাদেশ
এছাড়া গত ৬ মে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ইউনিসেফ এবং গ্যাভির সহযোগিতায় হাম-রুবেলার ১৫ লাখ ও টিটেনাসের ৯০ হাজার ডোজ টিকা দেশে এসেছে। ১০ মে’র মধ্যে ১ কোটির বেশি টিকা দেশে আসবে। ফলে প্রায় এক বছর টিকার কোনো ঘটতি হবে না। সে সময় আবারও হামের এই ভয়ানক অবস্থার জন্য বর্তমান সরকারকে দায়ী করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
আসিফ মাহমুদের অভিযোগের তির আওয়ামী লীগের দিকে
সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বর্তমান হাম পরিস্থিতিকে ‘জাতীয় সংকট’ হিসেবে ঘোষণা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র, সাবেক উপদেষ্টা ও জুলাই বিপ্লবী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
হাম পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এনসিপি নেতা অভিযোগ করেন, ‘পূর্ববর্তী সরকারের (আওয়ামী লীগ) দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে সময়মতো হামের টিকা কেনা যায়নি। সে কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।
হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বানও জানান আসিফ। পাশাপাশি হামের এই আকস্মিক উত্থানের পেছনে কার অবহেলা বা অনিয়ম কাজ করেছে, তা খতিয়ে দেখার জন্য তদন্তের দাবিও জানান এই তরুণ তুর্কী।
তবে শুধু রাজনীতিক বা সরকার নয়, দেশব্যাপী হামের এই ভয়ানক উত্থান এবং এত শিশুর মৃত্যু নিয়ে সাধারণ মানুষদের মধ্যেও রয়েছে মতবিভেদ। কেউ কেউ স্বাস্থ্যখাতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাটকে দায়ী করছে। কারও কারও অভিযোগ অন্তর্বর্তী সরকারের হাম এবং এর টিকা কেনার প্রতি অবহেলা নিয়ে। একটা শ্রেণির অভিযোগের তির রয়েছে বর্তমান সরকারের দিকেও।
তবে এই দায় চাপাচাপির খেলায় যেন হাম পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হয়ে উঠতে না পারে, এমনটাই প্রত্যাশা অভিভাবকদের। সরকার যেন এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, এটাই চাওয়া তাদের।
আর কোনো মায়ের বুক খালি না হোক, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ভর্তি থাকা শিশুরা যথাযথ চিকিৎসা পাক, শতভাগ টিকার আওতায় আনা হোক শিশুদের- আপাতত এমনটাই চাওয়া সারাদেশের মানুষের।
এএইচ




