বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও সার্বিক কল্যাণ উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে কৈশোর বান্ধব স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।
সোমবার (১৮ মে) ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. আশরাফী আহমদ এবং সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সুমন সেনগুপ্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এই অংশীদারিত্ব দেশের কিশোর-কিশোরীদের জন্য মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তাদের চাহিদাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিজ্ঞাপন
জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি চারজন তরুণীর মধ্যে প্রায় একজন ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সন্তান জন্ম দিচ্ছে। একই সঙ্গে কিশোরী মাতৃত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে থাকায়, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশে তরুণদের জন্য সঠিক তথ্য, কাউন্সেলিং, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কিশোর-কিশোরীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা আরও জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই সহযোগিতার মাধ্যমে উভয় প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে সামনের সারির স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যতথ্য ও সেবার প্রাপ্যতা সম্প্রসারণ এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ইতিবাচক সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তন আনয়নে কাজ করবে। এছাড়াও নির্বাচিত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে কিশোর-কিশোরীবান্ধব সেবার প্রাপ্যতা, সহজলভ্যতা ও গুণগত মান উন্নয়নে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই অংশীদারিত্ব সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘শিশুদের জন্য’ শীর্ষক ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচির চলমান কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। জীবনচক্রভিত্তিক এই কর্মসূচির মাধ্যমে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, শিশুসুরক্ষা এবং কিশোর-কিশোরী উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সহায়তা প্রদান করা হয়।
বিজ্ঞাপন
পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. আশরাফী আহমদ বলেন, এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী ও সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিশোরবান্ধব যেকোনো উদ্যোগে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা স্বাস্থ্য বিষয়ে সমানভাবে সচেতন হতে পারে এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবায় সমান প্রবেশাধিকার পায়। স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি কাউন্সেলিং কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক, মানসিক ও আবেগীয় বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মিতভাবে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও সম্পৃক্ত থাকা প্রয়োজন। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করার জন্য এবং এই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্বের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমি সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই, যা সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন: মেন্টাল ট্রমায় ৭৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরী
পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের এম সি এইচ সার্ভিসেস ইউনিটের পরিচালক ডা. নাসির আহমেদ বলেন, ‘লাইফ স্কিল ও আয়বর্ধক কার্যক্রমের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের উন্নয়নে বিনিয়োগ শুধু তাদের ব্যক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে না, বরং দেশের ভবিষ্যৎ দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীরা ব্যবহারিক ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায়, যা তাদের ভবিষ্যতে দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা রেমিট্যান্স আয়ের সক্ষম মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করবে। আজকের কিশোর-কিশোরীদের ক্ষমতায়ন মানেই আগামী দিনের শক্তিশালী মানবসম্পদ তৈরি করা।’
সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সুমন সেনগুপ্ত বলেন, ‘বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই কিশোর-কিশোরী। তাই তাদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণে বিনিয়োগ দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী কিশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে বাল্যবিয়ে ও কিশোরী মাতৃত্বের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব, পাশাপাশি তরুণদের প্রয়োজনীয় তথ্য, সহায়তা ও সক্ষমতা দিয়ে আরও ক্ষমতায়িত করা যাবে। এই সমঝোতা স্মারক আমাদের চলমান অংশীদারিত্বের একটি নতুন অধ্যায়, যা কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ, নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আমাদের প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আমরা আশা করি।’
এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর এবং সেভ দ্য চিলড্রেনের দীর্ঘদিনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল, যার ফলে কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ, নিরাপদ ও সফলভাবে প্রাপ্তবয়স্কে পৌঁছানোর জন্য গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমসমূহে অধিকতর সমন্বয় ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উভয় প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, কর্মসূচি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্প সম্পর্কিত তথ্য সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশে ‘শিশুদের জন্য’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, যা একটি ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ হিসেবে শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জীবনচক্রভিত্তিক সমন্বিত সহায়তা প্রদান করে। কর্মসূচিটি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, বরিশাল ও গাইবান্ধাসহ শহর ও গ্রামীণ এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
এই কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হলো কিশোর-কিশোরী উন্নয়ন, যেখানে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে কৈশোর বান্ধব স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের সহযোগিতায় সেভ দ্য চিলড্রেন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন উপকরণ তৈরি এবং কিশোর-কিশোরীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে কাজ করছে।
এসএইচ/এমআই




