ক্যানসারে অ্যানসার- প্রচলিত এই কথাকে ভুল প্রমাণ করেছেন তারা। আক্রান্ত হয়েও ভেঙে পড়েননি। চিকিৎসা যেমন নিয়েছেন। তেমনি ক্যানসারকে ধরাশায়ী করেছেন মনের জোরেও। তারপর থেকে নিজেরা সুস্থ জীবনচর্চায় মগ্ন রয়েছেন। আর নতুন কেউ ক্যানসারে আক্রান্ত হলে পাশে থাকছেন। এর জন্যে তারা মিলিত হয়েছেন সেন্টার ফর ক্যানসার কেয়ার ফাউন্ডেশনের (সিসিসিএফ)।
সেচ্ছাসেবামূলক এই সংগঠনের আয়োজনে ৪ ফেব্রুয়ারি বুধবার বিশ্ব ক্যানসার দিবসের বিকেলে রাজধানী ঢাকার পরীবাগের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে ক্যানসার জয়ীদের এক মিলনমেলা বসেছিল। যেখানে ক্যানসার প্রতিরোধী বিভিন্ন ঔষধি গাছ প্রদর্শন করেন ক্যান্সার জয়ী জেসমিন পারভীন সীমা। তিনি গড়ে তুলেছেন কীটনাশকমুক্ত ছাদবাগান।
বিজ্ঞাপন
এই উদ্যোগ সম্পর্কে সরকারি বাঙলা কলেজের শিক্ষক ড. জেসমিন পারভীন সীমা বলেন, ‘ক্যানসার হলে অবশ্যই আমাদের চিকিৎসা নিতে হবে। কিন্তু তার আগে আমাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য খাবারে যাতে কীটনাশক না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আর অনেক গাছেই ভেষজ গুণাবলী আছে। এগুলো ক্যানসার প্রতিরোধেও সহায়ক।’
_20260206_091201008.jpeg)
এলো ‘পাশে আছি’ অ্যাপ
একই আয়োজনে উদ্বোধন করা হল ‘পাশে আছি’ অ্যাপ। সিসিসিএফের এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্যানসার রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং-সহ বিভিন্ন তথ্য সহায়তা পাবেন।
বিজ্ঞাপন
এই অ্যাপ সম্পর্কে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ বলেন, এটি একটি সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী উদ্যোগ। এর মাধ্যমে ক্যান্সার রোগীদের দোরগোড়ায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে বলে তিনি মনে করেন।
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় সিসিসিএফের প্রেসিডেন্ট রোকশানা আফরোজ বলেন, ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই শুধু ওষুধ বা চিকিৎসা দিয়ে সম্ভব নয়। মানসিক শক্তিই পারে মানুষকে বাঁচার প্রেরণা দিতে। এই কারণেই ‘পাশে আছি’ অ্যাপ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুতই অ্যাপটি গুগল প্লে স্টোরে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে, জানালেন তিনি।
ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মানবিক এই আয়োজনে এসেছিলেন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ক্যান্সার সারভাইভার, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
_20260206_091209538.jpeg)
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ক্যানসার নিয়ে সারা পৃথিবীতেই অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। এর জন্য সচেতনতামূলক উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে স্তন ক্যানসার প্রাথমিক স্তরেই যাতে শনাক্ত করা যায়, তার জন্যে মেয়েরা যাতে কিশোরী বয়স থেকে নিজেরা স্ক্রিনিং (ব্রেস্ট সেলফ স্ক্রিনিং) করতে পারে সে বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এক্ষেত্রে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসার আহ্বান করেন তিনি।
ক্যানসার চিকিৎসায় আক্রান্ত পরিবারকে কীভাবে আর্থিক সহায়তা দেওয়া যায়, তেমন উদ্যোগ দেখতে চান পথিকৃত ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলি। তিনি বলেন, ক্যানসার একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। এর চিকিৎসাও ব্যয়বহুল। ফলে প্রভাব শুধু রোগীর ওপর নয়, পুরো পরিবারের ওপর পড়ে। তাই আক্রান্ত পরিবারের জন্য সামাজিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
মুগ্ধতা স্মৃতি বৃত্তি প্রদান
মাত্র সাত বছর তিন মাসের ছোট্ট জীবন পেয়েছিল নূরেন ফাইজা ইকরাম মুগ্ধতা। ক্যানসারের সঙ্গে লড়তে লড়তে পৃথিবী থেকে অকাল বিদায় হয় তার। মুগ্ধতার স্মরণে স্বজনরা চালু করেছে বিশেষ বৃত্তি। এর মাধ্যমে সহায়তা পাবে দরিদ্র পরিবারের ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু। এছাড়া ক্যানসার থেকে সুস্থ হওয়া শিশু বা পরিবারের কেউ ক্যানসার আক্রান্ত হলে সেই পরিবারের শিশুরাও পাবে এই বৃত্তি।
সিসিসিএফের বিশ্ব ক্যানসার দিবসের আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মুগ্ধতা স্মৃতি বৃত্তি প্রদান। যার মাধ্যমে পাঁচজন শিশু শিক্ষা সহায়তা পাচ্ছে। এছাড়া তাদের মানসিকভাবে অনুপ্রাণিত করার কাজটি করবে সিসিসিএফ।
অনুষ্ঠানে মুগ্ধতার বাবা মো. তুহিন ইকরাম বলেন, ক্যানসারের কারণে একটি পরিবার যেমন মানসিক ধাক্কা খায়, তেমনি আর্থিক দুশ্চিন্তাও তৈরি হয়। তাই দেশেই সবার জন্য সুলভে জনবান্ধব ক্যানসার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত। এ বিষয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

এখানে থেমো না: লড়াইয়ের যত গল্প
ক্যানসার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সিসিসিএফের অন্যতম উদ্যোগ বিশেষ প্রকাশনা ‘এখানে থেমো না’। যেখানে ক্যানসার লড়াকু ও পরিচর্যাকারীদের বাস্তব গল্প তুলে ধরা হয়েছে। এদের কয়েকজনের সাক্ষাৎকারভিত্তিক ভিডিও কনটেন্টও তৈরি করা হয়েছে একই শিরোনামে। এর মাধ্যমে অন্যরাও বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারছে। অনুষ্ঠানে দুই খণ্ডের বই উপহার দেওয়া হয় অতিথিদের।
পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ক্যানসার সারভাইভার ও সিসিসিএফ সাধারণ সম্পাদক জাহান-ই-গুলশান। তিনি বলেন, ক্যানসার আক্রান্ত, সারভাইভার, ক্যানসারে স্বজন হারানো পরিবারের সদস্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সম্মিলিত স্বেচ্ছাসেবামূলক প্রতিষ্ঠান সিসিসিএফ। ২০২৩ সালের জুন মাসে এর পথচলা শুরু। তারা ক্যান্সার রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রয়োজনীয় তথ্যসেবা প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে আসছে বলে জানান তিনি।
এজেড

