শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

‘২০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:২৩ পিএম

শেয়ার করুন:

Health
সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ রোড টু ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় অতিথিবৃন্দ

অধিক জনসংখ্যার এই দেশে সবার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে ‘বিকেন্দ্রীকরণের’ ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা এও বলছেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতে বিকেন্দ্রীকরণের ‘কোনো বিকল্প নেই’।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ রোড টু ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে এমন অভিমত আসে। তারা দল-মত সবকিছু উর্ধ্বে গিয়ে দেশের স্বাস্থ্যখাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন।


বিজ্ঞাপন


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘স্বাস্থ্যখাতকে এগিয়ে নিয়ে গেলেই এগিয়ে যাবে দেশ। এতে সুন্দর সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তাই স্বাস্থ্যখাতে সমন্বয় ও বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ বলেন, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সকল মানুষের অধিকার।

‘তাই প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার (পিএইচসি) একটি অধ্যাদেশ আইন থাকা জরুরি। সব নাগরিকের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্য, সাশ্রয়ী মূল্য এবং মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সাংবিধানিক আদেশের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবায় ন্যায্যতা এবং বৈষম্যহীনতার জন্য জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত সংস্কার করার জন্য একটি অধ্যাদেশের আশু প্রয়োজন,’ বলেন তিনি।

সভায় বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেন। তিনি স্বাস্থ্যখাতে বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘২০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিকেন্দ্রীকরণ করার কোনো বিকল্প নেই।’


বিজ্ঞাপন


ডা. আকরাম হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার হতে হবে। স্বাস্থ্যসেবাকে সব রাজনৈতিক দলকে গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। দেশের মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্য মানুষের দৌড়গোড়ায় পৌঁছাতে হবে। সেইসঙ্গে সহজলভ্য করে দিতে স্বাস্থ্যসেবা। যাতে দেশের সব নাগরিক স্বাস্থ্যের সমান সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন।’

সভায় অংশ নিয়ে ব্র্যাকের সিনিয়র পরিচালক আকরামুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্যখাতে সেবা ও মান দুটি এক থাকতে হবে।

‘এখন যেভাবে হেলথকেয়ার পরিচালনা করা হচ্ছে, তা বেশিদূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না। জনগণের অংশগ্রহণও বাড়াতে হবে। গুণগত পরিবর্তন দরকার। সেইসঙ্গে সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে মানের দিক থেকে একটা পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে’, বলেন আকরামুল।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি ও কাঠামো ‘ঠিক’ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রোমানা হক।

তিনি বলেন, ‘আগে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো ২০ বেডের ছিল, এখন বেড়ে ৫০ বেড হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নির্ধারণ করা হলে কতজন চিকিৎসক থাকবে এবং স্বাস্থ্যসেবা টিমে কারা কারা থাকবে; তাও স্পষ্ট করে দিতে হবে।’

‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কী কী চাই মডেল ঠিক করতে হবে। সেই আলোকে এগোতে হবে। বিক্ষিপ্তভাবে এগোলে প্রাইমারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাবে না’, যোগ করেন অধ্যাপক রোমানা।

যেসব দক্ষ স্বাস্থ্য কর্মী বসে আছেন তাদের কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনিকলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি রওশন আরা বেগম।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

‘৯-১০ হাজার মিডওয়াইফ বসে আছে। তাদের চাকরি নেই এবং তাদেরকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে’, যোগ করেন তিনি।

তিনি এও বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবাকে এগিয়ে নিতে হলে মাতৃ স্বাস্থ্যসেবাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’ 

দেশের স্বাস্থ্যখাতের দুর্দশার জন্য কারা দায়ী, সে বিষয়ে একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) কাজী দেলোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের দুর্দশার জন্য ৫০ শতাংশ দায়ী চিকিৎসকরা, ৩০ শতাংশ মুর্খ আমলারা এবং ২০ শতাংশ রাজনীতিবিদরা দায়ী।’

‘এসবের গালিফতি বা অবহেলার জন্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নতি হচ্ছে না। ৮০ শতাংশ যদি ২০ শতাংশের পক্ষে কাজ করতো, তাহলেও হতো। আর এই ৮০ শতাংশ, ৩০ শতাংশও কাজ করে না। ৮০ শতাংশ কর্মকর্তার জেলে থাকা উচিত’, যোগ করেন তিনি।

কাজী দেলোয়ার আরও বলেন, ‘সরকারের মধ্যে সরকার নিজেই বাঁধা। সরকারের মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় রয়েছে, এগুলো একটা আরেকটার জন্য বাঁধা, এসব জটিলতা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রাইমারি হেলথ কেয়ারে সরকারি-সেরকারি অংশীদারত্বের কথা বলা হয়। কিন্তু দুটোর উদ্দেশ্য আলাদা, তাদের আসল হলো মুনাফা।’

‘বেসরকারিখাতের কিছু প্রতিনিধি সরকারের কর্তৃপক্ষের কাছে গেছে মেডিকেলের মিনিমাম পাস নাম্বারটা আরও কমানোর জন্য। পলিসি লেভেলের একজন বললো, মানুষকে আর মারার ব্যবস্থা করবেন না। মেডিকেল আর ইঞ্চিনিয়ারিং;  দুই জায়গায় ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নাই। সরকারি-বেসরকারি করতে গেলে এগুলো নিয়ে ভাবতে হয়। আমরা এখনও ডাক্তারদের সুরক্ষা দিতে পারি না। চেম্বার করার পর বাড়ি ঘুমাতে পারে না, এমন ভাষায় গালিগালাজ করা হয়’, অভিযোগ করেন এই অতিরিক্ত সচিব।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদসহ দেশি-বিদেশে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এসএইচ/এএম

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর