সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

সচেতনতায় বাঁচতে পারে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুর জীবন

মাহফুজ উল্লাহ হিমু
প্রকাশিত: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:২৩ এএম

শেয়ার করুন:

সচেতনতায় বাঁচতে পারে ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুর জীবন
ফাইল ছবি

চার বছর বয়সী শিশু আফরিন। আর দশটা শিশুর মতোই হেসেখেলে দিন কাটছিল ফরিদপুরের এই শিশুটির। এর মধ্যে গলার চামড়ার নিচে চাকার মতো ফুলে ওঠে। স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে গেলে দ্রুত মেয়েটিকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। ঢাকায় আনার পর চিকিৎসক জানান আফরিনের ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত। এরপর তাকে ভর্তি করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) শিশু হেমাটোলজি বিভাগের ৩০৭ নম্বর ওয়ার্ডে।

আফরিনের পাশেই ১২ নম্বর শয্যায় এক সপ্তাহ ধরে চিকিৎসা নিচ্ছে চার মাস বয়সী শিশু কাসফিয়া মরিয়ম। জীবন সম্পর্কে বুঝে ওঠার আগেই ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে লড়াই করতে হচ্ছে তাকে। এখন পর্যন্ত নিতে হয়েছে ৭ থেকে ৮ ব্যাগ রক্ত। শিশুটির মা রুমা আক্তার আক্ষেপ নিয়ে বলছিলেন, ‘আমার মায়ের ক্যানসার, এমন বাচ্চারও আল্লাহ, এ রোগ হয়!’


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন

রিং নিয়ে অস্থিরতা কাটবে কবে?

শুধু আফরিন আর মরিয়মই নন। প্রতিবছর দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেক শিশু। দিন দিন এই সংখ্যাটি বেড়েই চলছে। নানা বিষয় শিশুদের ক্যানসার ঝুঁকিতে ফেলছে। এর মধ্যে ব্লাড ক্যানসারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, বেশিরভাগ শিশুর ক্যানসার নিরাময় করা সম্ভব। এক্ষেত্রে শুরুতে শনাক্ত করা গেলে এবং প্রথম অবস্থাতেই উন্নত চিকিৎসা পেলে দেশের ৭০ শতাংশ রোগী সেরে ওঠবে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

child-2বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়াকে শিশুদের ক্যানসার বা চাইল্ডহুড ক্যানসার বোঝায়। প্রতিবছর বিশ্বে অন্তত চার লাখ শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ক্যানসার কিছুটা ভিন্ন। শিশুদের মধ্যে সাধারণত লিউকেমিয়া বা রক্তের ক্যানসার বেশি। ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত। উন্নত দেশগুলোতে শিশু ক্যানসার রোগীর সুস্থতার হার প্রায় ৮০ শতাংশ। তবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই হার শতকরা ২০ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে যথাসময়ে ক্যানসার শনাক্ত ও উন্নত চিকিৎসা পেলে ৭০ শতাংশ রোগী ভালো হয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শিশুদের ক্যানসারের আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) অন্যতম। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত হাসপাতালটির শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজির বহির্বিভাগে ৪ হাজার ৭৮০ ক্যানসার আক্রান্ত শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার শিশুতে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। এসব রোগীর ৭৮ শতাংশ রক্তের ক্যানসার, ৮ দশমিক ৬ শতাংশের বিভিন্ন ধরনের টিউমার, ১৩ শতাংশের রক্তের বিভিন্ন রোগ নিয়ে এসেছে। আর ব্লাড ক্যানসারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া।

আরও পড়ুন

‘অবৈধ’ হাসপাতাল-ক্লিনিকের লাগাম টানা সম্ভব হবে কি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, মাত্রাতিরিক্ত চিকিৎসার ব্যয় ও স্বাস্থ্য সেবার সুযোগের অভাবসহ নানা কারণে বেশিরভাগ ক্যানসার আক্রান্ত শিশু মারা যায়। বিশেষ করে দেশে এ রোগের চিকিৎসা হয় এটি না জানায় অনেকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। যখন তারা চিকিৎসা নিতে আসেন তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। আবার অনেকে প্রতিবেশি দেশে চিকিৎসার খরচ সংগ্রহ করতেই শিশু মৃত্যুর দাঁড়প্রান্তে চলে যায়।

দেশেই আছে উন্নতমানের চিকিৎসা

দেশে শিশু ক্যানসার রোগীদের বর্তমান পরিস্থিতি ও চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসএমএমইউর শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগ অধ্যাপক ডা. এটিএম আতিকুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর নতুন করে ছয় থেকে আট হাজার শিশু বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে সর্বাধিক ব্লাড ক্যানসার। আমাদের দেশে শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসা শুরু হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু রক্তরোগ ও ক্যানসার বিভাগে। বর্তমানে এই বিভাগটি দেশের আটটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কাজ করছে। এসব মেডিকেলে পূর্ণাঙ্গ বিভাগ রয়েছে। ফলে আমাদের রোগীরা দেশেই তাদের চিকিৎসা করতে পারছে। বর্তমান শিশু ক্যানসারের বেশিরভাগ ওষুধই সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে। ফলে এ রোগের চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ওষুধ দুইটাই আমাদের দেশে রয়েছে।

আতিকুর রহমান বলেন, দেশেই শিশু ক্যানসারের চিকিৎসা সম্ভব। এজন্য মানুষকে সচেতন হতে হবে। শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় সারাবিশ্বে একই প্রটোকল অনুসরণ করা হয়। ফলে দেশে বা বিদেশে কোথাও চিকিৎসায় কোনো পার্থক্য হয় না। গত এক বছরে বিএসএমইউতে চিকিৎসা নেওয়া ৭০ ভাগ শিশু এখন ভালো আছে। সমস্যা হলো দেশের চিকিৎসার প্রতি আস্থা না থাকা, সচেতনতার অভাব। এছাড়া অপপ্রচারের কারণেও মানুষ বিদেশমুখী হচ্ছে।

আরও পড়ুন

খেজুরের কাঁচা রস পানে হতে পারে স্থায়ী পঙ্গুত্ব

শিশু ক্যানসার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে অধ্যাপক আতিকুর রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বর্তমানে ৩১টি বেড রয়েছে। সব রোগীদের সবসময় ভর্তির প্রয়োজন হয় না। একেবারে জটিল রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। এছাড়া বহির্বিভাগের চিকিৎসায় তারা ঠিক হয়। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল, ক্যানসার হাসপাতালসহ বেশ কিছু হাসপাতালে এসব রোগী ভর্তি হতে পারে।

বড়দের তুলনায় শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় সফলতা অনেক বেশি জানিয়ে তিনি বলেন, বেশিরভাগ রোগী যদি সঠিক সময়ে, সঠিক প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেয় তাহলে তাদের ভালো হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে।

child-3রোগের চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খরচ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসএমএমইউর শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, খরচ নির্ভর করে তারা কোথায় ও কোন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা নিচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালে খরচের অ্যামাউন্ট বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সেখানে বেড, কেবিন ভিত্তিতে ভাড়ার কমবেশি রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে বেডগুলো ফ্রি এবং বেশিরভাগ ওষুধ বর্তমানে বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। যদিও কিছুটা অপ্রতুলতা আছে। অ্যান্টিবায়োটিকসহ আরও কিছিু ওষুধ সরকারিভাবে পেলে রোগীর চিকিৎসা খরচ কমে আসবে।

এই চিকিৎসক আরও বলেন, রোগী কোন এলাকার চিকিৎসা নিচ্ছে তার ওপরেও খরচ নির্ভর করে। যেমন চট্টগ্রামের একজন রোগী যদি সেখানেই চিকিৎসা নেয় তাহলে তাতে খরচ অতি সামান্য। কারণ রোগীদের বেশিরভাগ খরচ হয় তাদের যাতায়াত ও থাকা খাওয়ায়। যদি প্রত্যেকে প্রত্যেকের এলাকায় চিকিৎসা নেয় তাহলে খরচ দুই লাখেরও কম হবে। এ অবস্থায় তৃণমূলেও সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ক্যানসার রোধে প্রচারণা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে বিএসএমএমইউ’র রক্তরোগ বিভাগের প্রধান বলেন, সচেতনতা ও প্রচারণা বাড়াতে হবে, যেন রোগীরা হাল ছেড়ে না দেয়। তারা যেন লেগে থাকে এবং দেশের রোগীরা দেশেই থাকে।

এমএইচ/এমআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর