দেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী নাজমুন মনিরা ন্যান্সি। পরিবারের রাজনৈতিক আদর্শের জায়গা থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সমর্থক তিনি। বিএনপির সমর্থক হওয়ায় গত দেড় যুগ ধরে বেশ কোণঠাসা ছিলেন। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নিজের শিল্পীসত্তাকে সবসময় বড় করে দেখছেন। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে এক দীর্ঘ পোস্টে বিএনপির প্রতি নিজের দীর্ঘদিনের অনুগত্য, সংরক্ষিত আসন নিয়ে চলা গুঞ্জন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এই গায়িকা।
পোস্টে গায়িকা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক কারণে তাঁর জীবনের ১৪টি বছর হারিয়ে গেছে। তবে সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে তিনি গান ও নিজের যোগ্যতার বলে মানুষের ভালোবাসা আদায় করে নিয়েছেন।
ছোটবেলা থেকেই ঘরে ধানের শীষের আলোচনা শুনে বড় হওয়া ন্যান্সির পারিবারিক রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বেশ পুরনো। তাঁর মা, মরহুমা জোৎস্না হক নেত্রকোনা জেলা জাসাসের সহ-সভাপতি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে নিজের উপলব্ধি থেকে বিএনপির প্রতি তাঁর ভালোবাসা তৈরি হয়।

গেল ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলে গায়িকাকে ঘিরে নানা গুঞ্জন শুরু হয়। এ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে ন্যান্সি লেখেন, ‘বিএনপির সমর্থক হওয়া মানেই আমি রাজনীতিবিদ, নির্বাচন করতে চাই কিংবা সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্ন দেখি— এমনটা কেন ধরে নেওয়া হয়, বুঝি না। আমি কখনও সংসদ সদস্য হতে চাইনি, সংরক্ষিত আসনেও আমার কোনো আগ্রহ ছিল না।’ দল তাঁকে মূল্যায়ন করেনি বা সংরক্ষিত আসনে ডাকেনি— এমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কেবিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কেউ কেউ বলতে শুরু করলেন, বিএনপি ন্যান্সিকে মূল্যায়ন করল না, সংরক্ষিত আসনে ডাকল না। আমাকে ভালোবেসে তাঁরা কথাগুলো বলছেন, সেটা বুঝি। কিন্তু আমি যা কখনো হতে চাইনি সেটা আমাকে না দেয়ার অভিযোগ দলের প্রতি কেন?’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকার কোনো পদে যোগ্য মনে করলে তিনি কাজ করতে চান, তবে তা কোনো তদবিরে নয়, নিজের যোগ্যতায়। গায়িকা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন,‘আমার জীবনের ১৪টি বছর রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে হারিয়ে গেছে। সেই সময় আর কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে? কিন্তু আমি তো থেমে থাকিনি! আজ বাংলাদেশের মানুষ আমাকে একজন শিল্পী হিসেবে চেনে, ভালোবাসে। এটাও কী আমার বড় প্রাপ্তি নয়?’

বিএনপি সংস্কৃতিবান্ধব নয় বা শিল্পীদের মূল্যায়ন করে না—এমন ঢালাও বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ন্যান্সি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘নতুন কুঁড়ি’র বিচারক ও ২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে কাজা করার সুযোগগুলো পেয়েছিলেন। কাজগুলো পাওয়ার জন্য কাউকে অনুরোধ করেননি তিনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর যোগ্যতার মূল্যায়ন করে ডেকেছে।
তিনি আরও বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় নতুন কুঁড়ি, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ সাংস্কৃতিক ও জাতীয় স্বীকৃতির বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়ার সময় জাতীয় নাট্যশালা, জাতীয় চারুকলা গ্যালারি ও জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়। নতুন কুঁড়ির প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। এগুলো কি সংস্কৃতির প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার উদাহরণ নয়? বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ ’ নামক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে একটি সুন্দর সাংস্কৃতিক যাত্রা তিনি শুরু করেছেন। মনে রাখতে হবে, বিএনপি সবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে । একটি কঠিন পরিস্থিতিতে দেশ পরিচালনার পাশাপাশি সংস্কৃতি অঙ্গনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্যও সময় ও সুযোগ দিতে হবে।”

পোস্টে নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে ন্যান্সি জানান, মাস চারেক আগে এসএসএফের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এবারই প্রথম কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য তাঁর প্রাপ্য পুরো সম্মানী অনুষ্ঠানের কয়েক দিন আগেই তাঁর বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। অথচ বিগত সরকারের আমলে এমন ভাবনাও তার কাছে ছিল দুঃস্বপ্ন। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সামনে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘আমার গানের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঞ্চে এসে কথা বলেছেন। আমার গাওয়া গান নিয়ে নিজের স্মৃতি শেয়ার করেছেন। সংস্কৃতি অঙ্গনের কিছু সমস্যা ও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আমার কথা শুনেছেন। অভিজ্ঞতাটি আমার কাছে বিশেষ ছিল। তবে ছবিগুলো ফেসবুকে প্রকাশ করিনি। কারণ, প্রকাশ করলেই হয়তো বলা হবে এখন তো ন্যান্সির সময়, এখন তো সে সব পেয়ে যাবে! আমার রাজনৈতিক ভালোবাসা বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সবাইকে দেখিয়ে প্রমাণ করার কোনো প্রয়োজন আমি অনুভব করিনি।’
তিনি জানান, কোনো রাজনৈতিক দলই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। মাঝেমধ্যে বিএনপিরও সমালোচনা করেন ন্যান্সি। তবে অন্য দলের সমর্থক হলেই তাঁকে ঘৃণা করার পক্ষপাতী নন। গায়িকা বলেন, ‘অতীতে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিল্পীদের বঞ্চিত করা অন্যায় ছিল। একইভাবে এখন নিজের সমর্থিত দল ক্ষমতায় আছে বলে বিশেষ সুবিধা প্রত্যাশা করাও অন্যায়। এই চর্চা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের শিল্পীকে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, তাঁর শিল্প ও যোগ্যতায় মূল্যায়ন করা হোক।’
ইএইচ/




