সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে পাঁচ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: প্রতিমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম

শেয়ার করুন:

প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে পাঁচ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: প্রতিমন্ত্রী
প্রাথমিক শিক্ষা সংস্কারে জাতীয় সংলাপ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মশালায় বক্তব্য দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ

প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন ও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়নে কারিকুলাম, শিক্ষক, মনিটরিং, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি— এই পাঁচটি ক্ষেত্রে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্র পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। একটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন করে অন্য ক্ষেত্রগুলো উপেক্ষা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর ও ইউনিসেফের যৌথ আয়োজনে ‘ফ্রম দ্য ফিল্ড টু রিফর্ম: অ্যাডভান্সিং প্রাইমারি এডুকেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মশালায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করেছেন। সেই অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, শিক্ষার মান বাড়ানো, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতা গড়ে তোলার জন্য সরকার কাজ করছে।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, গত কয়েক মাসে প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা, মনিটরিং কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে ৬০ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়েছে। তিন হাজারের বেশি অংশীজনের মতামত ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭০০ এর বেশি মনিটরিং কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং দেড় হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষকের মতামত নেওয়া হয়েছে। এসব মতামতের ভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষার বিদ্যমান সমস্যা, অগ্রাধিকার ও সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা পাওয়া গেছে।

তিনি আরও বলেন, ২০২৮ সালে নতুন কারিকুলাম চালুর লক্ষ্যে শিখনফল ভিত্তিক ও শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলা, গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, খেলনাভিত্তিক শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং ব্যবহারিক শিখন কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোর শিখন-সময়ের বৈষম্য কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি সব প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড নির্ধারণের ওপর জোর দিতে হবে।

শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষক নিয়োগ, প্রাক্‌-চাকরি প্রশিক্ষণ, পদায়ন, পেশাগত উন্নয়ন ও মূল্যায়নকে সমন্বিত করে শিক্ষক নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বাড়ানো এবং শিক্ষকদের নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের মূল্যায়ন পৃথক রাখা এবং উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে।

বিদ্যালয় তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট ও অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ কমিয়ে মনিটরিং কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে হবে। এ লক্ষ্যে ১১ ধাপের বিদ্যালয় পরিদর্শন পদ্ধতি এবং ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তার মতে, মনিটরিংয়ের উদ্দেশ্য শুধু প্রতিবেদন তৈরি করা নয়; বরং শিক্ষকদের উপস্থিতি, নিয়মিত পাঠদান এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন নিশ্চিত করা।

অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়ন শুধু ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। শিশুদের উপযোগী শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, শৌচাগার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নদীভাঙনপ্রবণ ও পাহাড়ি অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নিরাপদ ও শিশুবান্ধব শিখন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল কনটেন্ট, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি নির্ভর মনিটরিং সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। এতে শিক্ষকদের কাজ সহজ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিখনও উন্নত হবে। জাতীয় সংলাপে উঠে আসা সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদফতর ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে উপস্থাপন করা হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ঝরে পড়া রোধে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষকদের মর্যাদা, বেতন-ভাতা এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষা খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। প্রথম অর্থবছরেই এই খাতে ২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে; যাতে তারা শ্রেণিকক্ষে কার্যকরভাবে পাঠদান করতে পারেন। আগামী দুই বছরে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা, শিক্ষক স্বল্পতা দূর করা এবং তাদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া দলভিত্তিক আলোচনা ও পারস্পরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ বাড়ানো এবং পাঠ্যপুস্তকের ব্যাপ্তির চেয়ে শিখনের গভীরতা ও গুণগত মানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. মোক্তার আলী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া ও বীথিকা বিনতে হোসাইন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী গিয়াস উদ্দিন এবং গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী।

জাতীয় সংলাপে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এম/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর