শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

প্রতিবন্ধীদের ডিজিটাল সেবায় ৬৯ শতাংশ বাধাই গুরুতর

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

শেয়ার করুন:

প্রতিবন্ধীদের ডিজিটাল সেবায় ৬৯ শতাংশ বাধাই গুরুতর
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ভবনে ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা নিরীক্ষার ফলাফল নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে জাতীয় প্রচার সভা

মোবাইল আর্থিক সেবা, ব্যাংকিং, বিচারিক সেবা, পরিবহন, নাগরিক নিবন্ধন ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এখনো বড় ধরনের প্রবেশগম্যতা সংকট রয়েছে। এসব ডিজিটাল সেবা যাচাই করে ১০৭টি নিশ্চিত প্রবেশগম্যতা সমস্যা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি সমস্যা ক্রিটিক্যাল এবং ৬২টি হাই পর্যায়ের। অর্থাৎ মোট শনাক্ত সমস্যার ৬৯ দশমিক ২ শতাংশই গুরুতর বা উচ্চ অগ্রাধিকারভুক্ত।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ভবনে জাতীয় পর্যায়ের ‘ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি অডিট ফাইন্ডিংস’ অবহিতকরণ প্রচার সভায় এসব কথা বলা হয়।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্টেলিয়ন টেকব্রিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভিআইপিএসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান আমিত। এতে বিভিন্ন খাতের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কী ধরনের বাধা রয়েছে, সেগুলোর গুরুত্ব এবং ব্যবহারকারীদের ওপর এর প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।

ভিজ্যুয়ালি ইমপেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি সভাটির আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করেছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ক্রিশ্চিয়ান এইড।

প্রবন্ধে জানানো হয়, ডিজিটাল সেবায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাধীনভাবে সেবা নেওয়ার পথে শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ত্রুটি নয়, বরং বিভিন্ন খাতজুড়ে একই ধরনের কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শনাক্তকৃত সমস্যার প্রায় সাতটির মধ্যে পাঁচটিই ক্রিটিক্যাল অথবা হাই পর্যায়ের।

মোট ১০৭টি সমস্যার মধ্যে ১২টি ক্রিটিক্যাল পর্যায়ের, যা মোট সমস্যার ১১ দশমিক ২ শতাংশ। এসব সমস্যার কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ স্বাধীনভাবে সম্পন্ন করতে না পারার পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন। আরও ৬২টি সমস্যা হাই পর্যায়ের, যা মোট সমস্যার ৫৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বাধা তৈরি হয় এবং অনেক সময় অতিরিক্ত সহায়তা বা বিকল্প পদ্ধতির প্রয়োজন হতে পারে।

এ ছাড়া ৩২টি সমস্যা মিডিয়াম পর্যায়ের, যা মোট সমস্যার ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ। এসব সমস্যা সরাসরি সেবা বন্ধ না করলেও ব্যবহারকারীর জন্য অসুবিধা তৈরি করে এবং স্বাধীনভাবে ও কার্যকরভাবে সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। নিম্ন পর্যায়ের সমস্যা রয়েছে একটি, যা মোট সমস্যার শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণেও গুরুতর সমস্যার চিত্র পাওয়া গেছে। মোবাইল আর্থিক সেবায় ক্রিটিক্যাল সমস্যা রয়েছে পাঁচটি এবং হাই পর্যায়ের সমস্যা নয়টি। অর্থাৎ এই খাতে ১৪টি সমস্যা ক্রিটিক্যাল ও হাই পর্যায়ের, যা সংশ্লিষ্ট মোট সমস্যার ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিচারিক ডিজিটাল সেবায় ক্রিটিক্যাল সমস্যা তিনটি এবং হাই পর্যায়ের সমস্যা ১৬টি। এই খাতে মোট ১৯টি সমস্যা ক্রিটিক্যাল বা হাই পর্যায়ের, যা মোট সমস্যার ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ। পরিবহন ও ডিজিটাল বাণিজ্যসেবায় দুটি ক্রিটিক্যাল এবং পাঁচটি হাই পর্যায়ের সমস্যা পাওয়া গেছে। এই খাতে গুরুতর ও উচ্চ অগ্রাধিকারভুক্ত সমস্যার হার ৫০ শতাংশ।

বাণিজ্যিক ব্যাংকিং সেবায় একটি ক্রিটিক্যাল এবং ১৩টি হাই পর্যায়ের সমস্যা শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ এই খাতের ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশ সমস্যাই ক্রিটিক্যাল বা হাই পর্যায়ের। নাগরিক নিবন্ধন সেবায় একটি ক্রিটিক্যাল ও আটটি হাই পর্যায়ের সমস্যা রয়েছে। এই খাতে গুরুতর ও উচ্চ অগ্রাধিকারভুক্ত সমস্যার হার ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রবেশগম্যতার ঘাটতি রয়েছে। এই খাতে ক্রিটিক্যাল পর্যায়ের কোনো সমস্যা পাওয়া না গেলেও ১১টি হাই পর্যায়ের সমস্যা শনাক্ত হয়েছে। খাতটির মোট সমস্যার ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ ক্রিটিক্যাল বা হাই পর্যায়ের।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো ডিজিটাল সেবার গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোতে স্বাধীনভাবে কাজ সম্পন্ন করতে না পারা। বিশেষ করে পরিচয় যাচাই, পিন, এককালীন পাসওয়ার্ড বা ওটিপি, ক্যাপচা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রবেশগম্যতার ঘাটতি রয়েছে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিন দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত সংখ্যার কিপ্যাড ব্যবহারকারী কোন নম্বর স্পর্শ করছেন, তা সহায়ক প্রযুক্তি দিয়েও নির্ভরযোগ্যভাবে জানাতে পারে না। ফলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজে থেকে নিরাপদভাবে পরিচয় যাচাই বা লেনদেন সম্পন্ন করতে সমস্যায় পড়তে পারেন। পরিচয় যাচাইয়ের ধাপটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবায় প্রবেশের প্রধান শর্ত হওয়ায় এ ধরনের সমস্যা সরাসরি সেবা বঞ্চনার কারণ হতে পারে।

এ ধরনের সমস্যার প্রভাব শুধু ব্যবহারকারীর ভোগান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিচয় যাচাই বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো ধাপে প্রবেশগম্যতার সমস্যা থাকলে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ব্যাংকিং, আর্থিক লেনদেন, নিবন্ধন বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি সেবা থেকে কার্যত বাদ পড়তে পারেন। একই সঙ্গে অন্য ব্যক্তির সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

প্রতিবেদনটিতে ওয়েব কনটেন্ট অ্যাক্সেসিবিলিটি গাইডলাইন বা ডব্লিউসিএজি ২.২-এর চারটি মূল নীতির ভিত্তিতেও সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমস্যা পাওয়া গেছে তথ্য ও উপাদান ব্যবহারকারীর কাছে উপলব্ধ করার ক্ষেত্রে। এই শ্রেণিতে ৩৭টি সমস্যা রয়েছে, যা মোট সমস্যার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ।

সহায়ক প্রযুক্তির সঙ্গে ডিজিটাল সেবার সামঞ্জস্য বা রোবাস্ট পর্যায়ে ৩০টি সমস্যা পাওয়া গেছে, যা ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ। ব্যবহারযোগ্যতার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে ২৬টি, যা ২২ দশমিক ৮ শতাংশ। আর সেবার বিষয়বস্তু ও নির্দেশনা সহজে বোঝার ক্ষেত্রে ২১টি সমস্যা রয়েছে, যা ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ।

তবে ডব্লিউসিএজি ২.২-এর নীতিভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে মোট ১১৪টি ম্যাপিং পাওয়া গেছে। কারণ একটি সমস্যা একাধিক নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই এই সংখ্যা ১০৭টি স্বতন্ত্র সমস্যার চেয়ে বেশি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০৭টি সমস্যার মধ্যে ৭১টি লেভেল এ পর্যায়ের, যা মোট সমস্যার ৬৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। লেভেল এএ পর্যায়ের সমস্যা রয়েছে ২২টি, যা ২০ দশমিক ৫৬ শতাংশ। আরও ১৪টি সমস্যা লেভেল এ এবং লেভেল এএ উভয় ধরনের সাফল্যের মানদণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

আশিকুর রহমান আমিত বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের অভিজ্ঞতাতেও এসব সমস্যার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন অ্যাপে প্রয়োজনীয় প্রবেশগম্য ফিচার না থাকা, অ্যাপ হালনাগাদ করার পর আগের সুবিধাগুলো ঠিকভাবে কাজ না করা, ঠিকানা পরিবর্তনের মতো সাধারণ কাজ করতে সমস্যা এবং ব্যাংকিং সেবায় কার্ড বা এটিএম ব্যবহারে বাধার মতো বিষয়গুলো তাদের জন্য নিয়মিত সমস্যা তৈরি করছে।

তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল সেবা তৈরির সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া না হলে পরে শুধু ত্রুটি সংশোধন করে কার্যকর প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা কঠিন। বিশেষ করে নিরাপত্তা ও পরিচয় যাচাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো তৈরির সময়েই প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

এএইচ/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর