শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

আলোহীন চোখে ডিজিটাল দুনিয়ায় পথ খুঁজছেন আবু মনসুর

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৬ পিএম

শেয়ার করুন:

আলোহীন চোখে ডিজিটাল দুনিয়ায় পথ খুঁজছেন আবু মনসুর
‘ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি অডিট ফাইন্ডিংস’ অবহিতকরণ সভায় যোগ দিতে এসেছিলেন মনসুর। ছবি: ঢাকা মেইল

চোখে আলো নেই। জন্মের পর থেকেই পৃথিবীটাকে দেখেছেন স্পর্শ, শব্দ আর অনুভূতির মাধ্যমে। অন্যরা যেখানে চোখের সামনে লেখা কাগজ পড়ে, রাস্তার পথ চিনে নেয় কিংবা মোবাইলের পর্দায় এক মুহূর্তে তথ্য খুঁজে নেয়, সেখানে আবু মনসুর দেওয়ানের পৃথিবীটা একটু আলাদা। 

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনে অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের ‘ডিজিটাল অ্যাক্সেসিবিলিটি অডিট ফাইন্ডিংস’ অবহিতকরণ সভায় যোগ দিতে এসেছিলেন মনসুর। ভলানটিয়ারি ইনিশিয়েটিভস ফর পিপলস সোসাইটি (ভিআইপিএস) আয়োজিত এই সভায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য দেশের বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা ও প্ল্যাটফর্‌ম কতটা প্রবেশযোগ্য, ব্যবহারবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক, তা নিয়ে অডিটের ফলাফল তুলে ধরা হয়। 

জন্মগতভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মনসুর। চোখ দিয়ে বই পড়ার সুযোগ হয়নি কখনো। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা করে ২০০৯ সালে এসএসসি এবং ২০১১ সালে এইচএসসি পাস করেন। গান করতেন, ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। জীবনের একটা সময় নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।

প্রযুক্তির সঙ্গেও তার সম্পর্ক নতুন নয়। ফোন ব্যবহার করেন শব্দের সহায়তায়।  চোখে দেখতে না পেলেও প্রযুক্তির জগতে নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু এখানেই তার প্রশ্ন, দেশ যখন দ্রুত ডিজিটাল সেবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ কেন সেই সেবার বাইরে থাকবেন?

মনসুরের কাছে ডিজিটাল সেবা শুধু মোবাইল ফোন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয় নয়। সরকারি সেবা, ব্যাংকিং, শিক্ষা, যোগাযোগ, তথ্য পাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে এখন প্রযুক্তি সরাসরি জড়িয়ে আছে। কোনো ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপ যদি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ব্যবহার করা কঠিন হয়, তাহলে প্রযুক্তির অগ্রগতির একটি বড় অংশ থেকেই তারা পিছিয়ে পড়েন। তাই ডিজিটাল সেবা সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য করার বিষয়টি তার কাছে অধিকার পাওয়ার প্রশ্ন।

তবে প্রযুক্তির বাধাই মনসুরের জীবনের একমাত্র সমস্যা নয়। প্রতিদিনের চলাফেরাও তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। হাতে থাকা সাদা লাঠি তার পথচলার প্রধান অবলম্বন। একই সঙ্গে এই লাঠি অন্যদের জানান দেয় যে তিনি দেখতে পান না। কিন্তু রাস্তায় সেই সংকেতও অনেক সময় কাজে আসে না। মনসুর জানান, সাদা লাঠি হাতে দেখেও অনেক গাড়িচালক গাড়ি থামান না। বরং কখনো গাড়ি তার গায়ে লাগিয়ে দেন। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এমন আচরণ শুধু কষ্টের নয়, জীবনঝুঁকিরও কারণ।

মানুষের আচরণে আরও একটি বিষয় তাকে কষ্ট দেয়। অনেক সময় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষকে দেখলেই কেউ ধরে নেন তিনি ভিক্ষা করেন। এমন অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মনসুরের কণ্ঠে ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার প্রশ্ন, কেউ যদি ভিক্ষা করেনও, তাহলে কেন তাকে সেই অবস্থায় যেতে হচ্ছে, সেটিও তো ভাবতে হবে। একজন মানুষকে ভিক্ষার পথে নামতে বাধ্য করে যে পরিস্থিতি, সেটি দূর করার দায়িত্বও রাষ্ট্র ও সমাজের।

মনসুর নিজে ভিক্ষাবৃত্তি করতে চান না। তিনি চান কাজ করতে। নিজের শ্রম দিয়ে আয় করে নিজের প্রয়োজন মেটাতে চান। অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার চেয়ে অল্প আয় করে হলেও নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান।তিনি জানান, রাষ্ট্র যদি তাকে ঠিকভাবে চলার সুযোগ করে দিতে পারত, তাহলে তাকে পথে নামতে হতো না।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সরকারি ভাতার পরিমাণ নিয়েও তার ক্ষোভ রয়েছে। তিনি বলেন, মাসে এক হাজার টাকা বর্তমান বাজার বাস্তবতায় খুবই কম। এই অর্থে একজন মানুষের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। তাই শুধু ভাতা বাড়ানোর কথা নয়, এমন ব্যবস্থা করা দরকার যাতে প্রতিবন্ধী মানুষ নিজেরাই আয় করতে পারেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে তাদের জীবনযাপন যেমন সহজ হবে, তেমনি সমাজের ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে।

মনসুরের কথায় বারবার ফিরে আসে আত্মমর্যাদার বিষয়টি। তিনি বড় কোনো বিলাসিতার কথা বলেন না। তার চাওয়া, নিজের উপার্জনে সাধারণভাবে বেঁচে থাকা। ভালো খাবার না হোক, ডাল আর আলুর ভর্তা দিয়েও খেতে পারবেন, কিন্তু সেই খাবার যেন নিজের উপার্জনের অর্থে কেনা হয়। তার কাছে এই সামান্য চাওয়ার মধ্যেই স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার বড় অর্থ রয়েছে।

এএইচ/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর