শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলে টিসি পাওয়া ২৫ শিক্ষার্থীর চমক!

জেলা প্রতিনিধি, নরসিংদী
প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম

শেয়ার করুন:

নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলে টিসি পাওয়া ২৫ শিক্ষার্থীর চমক!
নাছিমা কাদির মোল্লা (এন কে এম) হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস। ছবি: সংগৃহীত

নরসিংদী আলোচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাছিমা কাদির মোল্লা (এন কে এম) হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে এ বছর ৩৮২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শতভাগ জিপিএ-৫ পেয়েছে। দেশসেরা এই ফলাফলের পরেও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে বিদ্যালয়টি। এখানে টেস্ট পরীক্ষায় জিপিএ-৫ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়নি। অথচ এখান থেকে টিসি পাওয়া শিক্ষার্থীরা অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা দিয়ে অনেকটা চমক দেখিয়েছে। তাদের মধ্যে ২৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

জানা যায়, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসিতে টানা শতভাগ পাসসহ প্রায় প্রতি বছরই বোর্ডে দেশসেরার স্থান দখল করে আসছে। ২০২৫ সালে ৩২০ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে শতভাগ পাসসহ সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছিল। এছাড়া ২০২৪ সালে ২৯৪ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে ২৯৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ২০২৩ সালে ২৭৮ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে ২৭০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। শতভাগ পাসসহ ২০২২ সালে ২৬৬ জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছিল এবং ২০২১ সালে ২৪৭ জনের মধ্যে ২৩৭ জন, ২০২০ সালে ২১৪ জনের মধ্যে ২০০ জন, ২০১৯ সালে ১৭১ জনের মধ্যে ১৬৮ জন, ২০১৮ সালে ১৩৯ জনের মধ্যে ১৩৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। তার আগের বছর ২০১৭ সালে ১৬৪ জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছিল।

এ বছর বিদ্যালয়টি থেকে বিজ্ঞান বিভাগের ৩৭৬ এবং ব্যবসায় বিভাগের ৬ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। অংশগ্রহণ করা মোট ৩৮২ জন পরীক্ষার্থী ই জিপিএ-৫ পেয়েছে।

শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জন সাফল্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে টেস্টে নিয়ম-বহির্ভূত উপায়ে শিক্ষার্থী ছাঁটাইয় প্রসঙ্গে।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬০১ জন। কিন্তু দুই বছর পর ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩৮২ জন। অর্থাৎ নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশনের পর থেকে এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত ২১৯ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের শতভাগ জিপিএ-৫-এর ফলাফল ধরে রাখতেই টেস্ট পরীক্ষাকে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে, বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টেস্টে বাদ পড়া শিক্ষার্থীরা নরসিংদীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়েছে। এর মধ্যে নরসিংদী শহরের সানবীন স্কুলে ৫০ জন্য শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এছাড়াও জেলা শহরের পার্শ্ববর্তী ঘোড়াদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৫ জন, নরসিংদী মডেল স্কুলের ৪ জনসহ বেশ কয়েকটি স্কুলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ২৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার ছেলে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে পঞ্চম শ্রেণি থেকে পাঁচ বছর পড়াশোনা করেছে। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার আগে টেস্ট পরীক্ষায় গিয়ে অপশনাল বিষয়ে কম নম্বর পেয়েছে। যার কারণে টিসি পেয়ে নরসিংদী সানবীন স্কুল থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে।

তিনি বলেন, টেস্ট পরীক্ষার দুই মাস পর এসএসসি পরীক্ষা, তাকে যদি বের করে দেওয়া হয়, তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন হয়? ছেলে আমার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। তারা শুধু জিপিএ-৫ খুঁজবে, সবাই কি জিপিএ-৫ পাবে? এটা কোনো কথা?

আরও পড়ুন

এসএসসিতে শতভাগ ফেল, সমালোচনার মুখে ৩১২ প্রতিষ্ঠানকে শোকজ

এসএসসির ফলে ধস: বিপর্যয়, নাকি শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলে, আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে এন কে এমে ভর্তি হই। অষ্টম শ্রেণি থেকে তারা বের করে দেওয়া শুরু করে ধাপে ধাপে। তারা খুব কঠিন করে খাতা দেখে, আবার প্রশ্নও কঠিন করে। আমি এই স্কুলে না পড়ে অন্য স্কুলে গিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছি। তার মানে কি তখন আমি পড়িনি? এই যে শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়া হয়, এতে করে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে।

সানবীন স্কুল থেকে পরীক্ষা দেওয়া এক শিক্ষার্থী বলে, এন কে এমে নিয়মকানুন অনেক কঠিন। আমি পাস করতে পারিনি, তাই অন্য স্কুলে গিয়েছি। আমি প্রিটেস্টে এখান থেকে বের হয়েছিলাম। আমাকে কেউ জোর করেনি। আমি পাস করতে পারিনি, আমার বেস্টটা এখানে দিতে পারিনি। তাই নরসিংদী সানবীন স্কুল থেকে পরীক্ষা দিই এবং জিপিএ-৫ পাই।

এ বিষয়ে নরসিংদী সানবীন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মোমতাজ উদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে ৫০ জন ভর্তি হয়েছে। আমরা তাদের অঙ্গীকারনামা নিয়ে ভর্তি করি। তাদের মধ্যে ২৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

এদিকে ১০ আগস্ট ফলাফল প্রকাশের পর থেকে নেটিজেনরা এ বিষয়ে বিভিন্ন কথা বলা শুরু করে। তাদের মতে, কোনো শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে এটি ব্যবহার করা হলে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

একদিকে ৩৮২ পরীক্ষার্থীর শতভাগ জিপিএ-৫, অন্যদিকে একই প্রতিষ্ঠানের নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ৬০১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১৯ জনের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা, এই দুই তথ্যই এখন সামনে এনেছে বড় প্রশ্ন।

এ ব্যাপারে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন বলেন, বোর্ডের পরিপত্র অনুসরণ করেই টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে- টেস্ট পরীক্ষায় এ প্লাস না পেলে শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয় না। এটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ নম্বর পেলেই শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

নরসিংদী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এ এস এম আব্দুল খালেক বলেন, কোনো শিক্ষার্থী টেস্টে ফেল করলে সে পরীক্ষা দিতে পারবে না। কোনো প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ কোনো ভুল করে থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।

প্রতিনিধি/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর