গত ১৮ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত এমবিবিএস দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) শিক্ষার্থী সাদিয়া তাসনীম। এর আগে এমবিবিএস ফার্স্ট প্রফেশনাল পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়েছিলেন রাজশাহীর এ কৃতি সন্তান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত ৫৫টি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থী। এর মধ্যে সেরা ফলাফল করেছেন ডিএমসির কে-৭৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাসনীম। তিনি দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষার সিলেবাসে থাকা ফরেনসিক মেডিসিন ও ফার্মাকোলজি বিষয়ে অনার্স মার্ক পেয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
গত রোববার (২৩ মার্চ) ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা হয় সাদিয়া তাসনীমের। জানিয়েছেন এমবিবিএসে ভালো করার কৌশলসহ নানা দিক।
অনুভূতি
সাদিয়া তাসনীম: আলহামদুলিল্লাহ, যেকোনো অর্জন সবসময়ই আনন্দ ও তৃপ্তির। আমি মায়ের সঙ্গে বসে গল্প করছিলাম এমন সময় এক ফ্রেন্ডের কাছ থেকে জানতে পারি রেজাল্ট। প্রথমেই মাকে জানাই; এই অনুভুতিটা খুব দারুণ ছিল। তবে আমাদের অনেক লম্বা জার্নির খুব ছোট্ট একটা পার্ট এটা, রেজাল্ট শোনার পরও এই বিষয়টা মাথায় ছিল।
অনুপ্রেরণা
বিজ্ঞাপন
সাদিয়া তাসনীম: ছোটবেলা থেকেই আমার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছা ছিল। পরবর্তীতে পরিবারের কয়েকটা অসহায় মুহূর্ত দেখি; যে সময়টা আল্লাহর পরে পরিবারের সবাইকে ডাক্তারদের ওপর ভরসা করতে দেখি, কিছু অসঙ্গতি-অনিয়ম দেখি যা আমাদের দিক থেকে মেনে নেওয়া খুব কষ্টকর ছিল। এরপর সিদ্ধান্ত নেই ডাক্তার হওয়ার। এখনও সেই দিনগুলো আমাকে অনুপ্রেরণা যোগায়। আমার কাছে মনে হয় ইন ফিউচার আমাদের কাছে অনেক ভরসা নিয়ে খুব অসহায় মুহূর্তে মানুষ আসবে ট্রিটমেন্ট নিতে, আমাদের যেকোনো একটা ছোট্ট নলেজ তাদের রক্ষা করতে পারে। আবার এর ঘাটতি রোগীর অনেক বড় ক্ষতিও করতে পারে। এই বিষয়গুলো পড়াশোনা করার অনুপ্রেরণা যোগায় আমাকে।
পড়াশোনার কৌশল ও পরীক্ষার প্রস্তুতি
সাদিয়া তাসনীম: যতটা সম্ভব বুঝে আর গুছিয়ে পড়ার চেষ্টা করি। আইটেম এর সময় চেষ্টা করি পড়াগুলো গুছিয়ে রাখার। শিক্ষকদের ডিরেকশন ফলো করার চেষ্টা করি।
পড়াশোনার চাপ
সাদিয়া তাসনীম: ক্লাস-ওয়ার্ড সবকিছু মিলিয়ে বিবেচনা করলে সিলেবাস কন্টেন্টের তুলনায় টাইম কম। পারফেক্টভাবে সবকিছু করতে চাইলে চাপ বেশ ভালোই। চাপ সামলানোর জন্য আমি চেষ্টা করি অভিযোগ না করে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে টু ডু লিস্টটা মেনে নেওয়ার আর মানিয়ে নেওয়ার। আমাকে মেডিটেশন অনেক হেল্প (সাহায্য) করে এক্ষেত্রে। সেইসঙ্গে কেনো পড়াশোনা করছি এই কারণটা নিজের কাছে ক্লিয়ার রাখলে চাপ সামলানো তুলনামূলক সহজ হয়।
উপভোগ
সাদিয়া তাসনীম: আলহামদুলিল্লাহ, সবসময় সবকিছু উপভোগ্য হয় এমনটা না, যেহেতু নিজের ডিসিশনে আসছি, যথাসম্ভব উপভোগ করার চেষ্টা করি।
নবীন মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ
সাদিয়া তাসনীম: আমার মতে প্রথমেই নিয়তটা ঠিক করে ফেলা উচিত, একটা ভালো নিয়ত বা মোটিভ নিয়ে চললে চলার পথ অনেকটা সহজ হয়ে যায়; স্ট্রেস কমাতে অনেক সাহায্য করে। আর শুরু থেকেই প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন করে ফেলা উচিত; বছর শেষে এটা অনেক সাহায্যকারী হয়। তবে পড়াশোনা নিয়ে অতিরিক্ত চাপ নেওয়া উচিত না। সার্বিকভাবে নিজের ও নিজের সম্পর্কগুলোর যত্ন নেওয়া, আশেপাশের মানুষদের যথাসম্ভব হেল্প আর সাপোর্ট করা, ছোট্ট করে হলেও সেবামূলক কিছু কাজ করাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ দিনশেষে আমরা সবাই সুখী হতে চাই।
মেডিকেলে ভর্তিচ্ছুদের পরামর্শ
সাদিয়া তাসনীম: ভর্তিচ্ছুদের জন্য পরামর্শ থাকবে এই প্রফেশনে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই ফিল্ড নিয়ে পরিপূর্ণ একটা ধারণা নেওয়া উচিত। ভালো এবং চ্যালেঞ্জিং দুটো দিকই ভালোভাবে জানা উচিত। যদি প্যাশন থাকে তাহলে স্যাক্রিফাইস করার মানসিকতা আর মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা দুটোই তৈরি হয়ে যায় সময়ের সাথে সাথে। তাই প্যাশনেট হলে এই ফিল্ডে আসা উচিত, অন্যথায় এই ফিল্ডকে একটা বার্ডেন (বোঝা) মনে হতে পারে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সাদিয়া তাসনীম: এখনও কনফার্ম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নাই। সার্জারি ফিল্ডটা বেশি পছন্দ আমার, মেডিসিনের দিকে গেলে অনকোলজিতে আগ্রহ বেশি এখন পর্যন্ত।
চ্যালেঞ্জ
সাদিয়া তাসনীম: আমি সত্যিকার অর্থে এই ফিল্ডের খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। এখানে সফলভাবে কন্টিনিউ করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমার কাছে। আগামীর পথটা আল্লাহ যেন সহজ করে দেন, আমাকে একজন দক্ষ চিকিৎসক ও একজন ভালো মানুষ হবার এবং একটা সুখী-পরিতৃপ্ত জীবনযাপন করার তৌফিক দান করেন, সেজন্য সকলের নিকট দোয়াপ্রার্থী।
সাদিয়ার বেড়ে ওঠা
২০০২ সালে রাজশাহী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন সাদিয়া তাসনীম। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে। বাবার চাকরিসূত্রে শেরপুর ও কুড়িগ্রাম জেলায় শৈশব কাটে। এরপর রাজশাহীতে এসে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন সাদিয়া। এসএসসি সরকারি পিএন গার্লস হাইস্কুল থেকে এবং এইচএসসি রাজশাহী কলেজ থেকে। এরপর ২০২২ সালে এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধা তালিকায় চতুর্থ হন সাদিয়া। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সাদিয়া বড়। সাদিয়ার একমাত্র ছোট ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।
/এফএ