রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

বিনিয়োগ-এডিপিতে স্থবিরতা, কমছে রাজস্ব আদায়

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৫ পিএম

শেয়ার করুন:

বিনিয়োগ-এডিপিতে স্থবিরতা, কমছে রাজস্ব আদায়
ছবি- এআই
  • প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব ঘাটতি ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা
  • লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আদায় কম ৩১ শতাংশ
  • সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ভ্যাটে, ২০ হাজার ৫৭ কোটি টাকা
  • বিনিয়োগ স্থবিরতা ও ব্যাংকঋণ সংকটে রাজস্ব আদায়
  • এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি, কমছে ভ্যাট-কর আহরণ
  • আয়কর ও ভ্রমণ করেও ঘাটতি ৯ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা

বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংকঋণের প্রবাহ কমে যাওয়া এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীরগতির প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব আদায়ে। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে গতি না থাকায় ভ্যাট, আয়কর ও আমদানি-রফতানি পর্যায়ের শুল্ক থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আসছে না। এর সঙ্গে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের নিয়ম পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩১ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। যদিও আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আদায় বেড়েছে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৯১ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ের এই চিত্রকে শুধু কর আদায়ের প্রশাসনিক দুর্বলতা কিংবা ভ্যাট রিটার্ন জমার নিয়ম পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অর্থনীতির সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের গতি কমে যাওয়াও এর অন্যতম কারণ। বিনিয়োগ কম হলে নতুন শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন কার্যক্রম প্রত্যাশিত হারে বাড়ে না। এতে ভ্যাট, আয়কর ও আমদানি পর্যায়ের শুল্ক আদায়ের ওপর প্রভাব পড়ে। একইভাবে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীর হলে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবা সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ের সুযোগ সংকুচিত হয়।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু ভ্যাট দেওয়ার পদ্ধতি পরিবর্তন নয়, বিনিয়োগের স্থবিরতা, ব্যাংক থেকে ঋণ সরবরাহ কমে যাওয়া এবং এডিপি বাস্তবায়নের ধীরগতিও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীর হওয়ায় সেখান থেকেও পর্যাপ্ত ভ্যাট ও ট্যাক্স আসছে না।

এই বিশ্লেষক বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে ভাটা এবং রাজস্ব আদায়ে বড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এনবিআরকে আরও উদ্যম ও তৎপরতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

রাজস্ব আদায়ের খাতভিত্তিক পরিসংখ্যানেও অর্থনীতির এই চাপের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। প্রথম প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতে। এ খাতে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে মাত্র ২৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। তিন খাতের মধ্যে ভ্যাটেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, চলতি অর্থবছরের শুরুতে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের নিয়ম পরিবর্তনের কারণে এ খাতে আদায় কমেছে। আগে ব্যবসায়ীদের প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হতো। নতুন নিয়মে তিন মাস অন্তর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ফলে অনেক ব্যবসায়ী জুলাই ও আগস্টে রিটার্ন জমা দেননি। এর প্রভাব পড়ে সেপ্টেম্বরে ভ্যাট আদায়ে।

এ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের নিয়ম থেকে সরে এসে আগের মাসিক পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এনবিআরের কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করেন, ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের নিয়ম পরিবর্তনই রাজস্ব ঘাটতির একমাত্র কারণ নয়। বর্তমান প্রশাসনের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কার্যক্রমে তৎপরতার ঘাটতিও আদায় কমার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

আয়কর ও ভ্রমণ কর খাতেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে। প্রথম তিন মাসে এ খাত থেকে ৪২ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও আদায় হয়েছে ৩৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। তবে ইতিবাচক দিক হলো, আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ।

অন্যদিকে আমদানি-রফতানি পর্যায়ের শুল্ককর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩০ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। এ খাতে ঘাটতি রয়েছে ১২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। তবে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতের রাজস্ব আদায় বেড়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ।

সামগ্রিকভাবে তিনটি প্রধান খাতেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় পিছিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট খাতের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। অথচ গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে এনবিআরের তিনটি অনুবিভাগের মধ্যে রাজস্ব আহরণের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে ভ্যাট। ফলে এ খাতে বড় ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সামগ্রিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরের মাধ্যমে মোট ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে আদায়ের লক্ষ্য ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার একটি বড় অংশই আসার কথা এ খাত থেকে। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ভ্যাট আদায়ে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করা না গেলে বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাপ আরও বাড়বে।

তবে এনবিআরের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, বছরের শুরুতে ভ্যাট আদায়ে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা সামনের মাসগুলোতে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা বলেন, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির মূল কারণ ভ্যাট। পরীক্ষামূলকভাবে তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এ খাত থেকে আদায় কম হয়েছে। তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ ঘাটতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগে কাটিয়ে ওঠা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যাংকঋণের প্রবাহ স্বাভাবিক করা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় অর্থবছরের শুরুতে তৈরি হওয়া রাজস্ব ঘাটতি পরবর্তী সময়ে বাজেট বাস্তবায়নেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

টিএই/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর