বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে নজর মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তাদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০১ পিএম

শেয়ার করুন:

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে নজর মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তাদের
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ, হালাল শিল্প ও পর্যটন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ও ক্ল্যাং চাইনিজ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (কেসিসিআই) মধ্যে সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) কুয়ালালামপুরে ক্ল্যাং চেম্বার অব কমার্সের অডিটোরিয়ামে ডিসিসিআইয়ের বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সৌজন্যে কেসিসিআই আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া বিজনেস ফোরাম: ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব বিষয় উঠে আসে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন এসএমই কর্পোরেশন মালয়েশিয়ার চেয়ারম্যান ট্যাং চ্যাং খিম। স্বাগত বক্তব্যে কেসিসিআইয়ের সভাপতি জেফরি তান বলেন, মালয়েশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সমুদ্রবন্দর ক্ল্যাং শহরে অবস্থিত। উন্নত লজিস্টিক সুবিধার কারণে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা মালয়েশিয়া, বিশেষ করে ক্ল্যাংয়ে বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনা করতে পারেন।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়া বর্তমানে শ্রমঘন শিল্প থেকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারা সেখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন।

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আরও বাড়াতে দুই দেশের বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। পাশাপাশি সেবা ও উৎপাদনমুখী বিভিন্ন খাত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনাময়।

বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনৈতিক সেবা, টেলিযোগাযোগ, সেমিকন্ডাক্টর, হালাল খাদ্যপণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তাসকীন আহমেদ।

তিনি আরও বলেন, আশিয়ান অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, বাংলাদেশিরা চিকিৎসাসেবা নিতে প্রতিবছর বিদেশে প্রায় ৪ থেকে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেন। 

এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মালয়েশিয়ার চিকিৎসা খাতের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিশ্বমানের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে পারেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিশ্বমানের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও হালাল শিল্পের উন্নয়নে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মানজুরুল করিম খান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ শুধু জনশক্তি রপ্তানির জন্য নয়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনাময় গন্তব্য। দেশটির বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে, যা মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারা কাজে লাগাতে পারেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো দুই দেশের মধ্যে কোনো বাণিজ্য চুক্তি না থাকা। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের সময় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন হাইকমিশনার। এ চুক্তি হলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মানজুরুল করিম খান চৌধুরী বাংলাদেশের এভিয়েশন, মেডিক্যাল, তথ্যপ্রযুক্তি ও এগ্রো-প্রসেসিংসহ বিভিন্ন খাতে মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হালাল পণ্যের বড় বাজার রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, হালাল পণ্য ও সেবায় মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে একটি কার্যকর হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষ জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগেও মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারা ভূমিকা রাখতে পারেন।

এসএমই কর্পোরেশন মালয়েশিয়ার চেয়ারম্যান ট্যাং চ্যাং খিম বলেন, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় ১৩ লাখ এসএমই রয়েছে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক সহযোগিতা জোরদার এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে ডিসিসিআই ও ক্ল্যাং চেম্বারকে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশি কর্মীরা বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দক্ষতার সঙ্গে অংশ নিচ্ছেন এবং বিশেষ করে অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে অনুষ্ঠানে তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী। তিনি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে দ্রুত এফটিএ স্বাক্ষর, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া হালাল অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং বাংলাদেশের এসএমই উদ্যোক্তাদের রপ্তানি সম্প্রসারণে প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন।

এ সময় ডিসিসিআই ও ক্ল্যাং চেম্বারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ এবং ক্ল্যাং চেম্বারের সভাপতি জেফরি তান নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এতে স্বাক্ষর করেন।

অনুষ্ঠানে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে ৪০টি বিটুবি ম্যাচ-মেকিং সেশন অনুষ্ঠিত হয়।

পরে মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতিমন্ত্রী টিয়োং কিং সিংয়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। এ সময় ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মান এবং মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার শাহানারা মনিকা উপস্থিত ছিলেন।

সাক্ষাৎকালে টিয়োং কিং সিং বলেন, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় ভ্রমণকারী পর্যটকের সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। মুসলিম পর্যটন শিল্পের প্রসারে মালয়েশিয়া গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে।

বাংলাদেশে মুসলিম পর্যটন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে দক্ষ জনবল তৈরি ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে মালয়েশিয়া আগ্রহী বলেও জানান তিনি।

এ ছাড়া বাংলাদেশে বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উন্নত হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি মালয়েশিয়া সরকার বিবেচনা করছে বলে জানান মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতিমন্ত্রী।

দুই দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও সহযোগিতা বাড়াতে ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টার মালয়েশিয়া এবং ঢাকা চেম্বারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তাবও দেন তিনি।

এমআর/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর