বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

শ্রমিক সুরক্ষায় ৮৯ কোটি টাকার প্রকল্পের ৪৪ কোটিই প্রশিক্ষণ-পরামর্শে

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৩ পিএম

শেয়ার করুন:

শ্রমিক সুরক্ষায় ৮৯ কোটি টাকার প্রকল্পের ৪৪ কোটিই প্রশিক্ষণ-পরামর্শে

টেক্সটাইল ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা উন্নয়নে জার্মান সরকারের অনুদানে নেওয়া প্রকল্পে ব্যয়ের বড় অংশই রাখা হয়েছে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক খাতে। ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার এই প্রকল্পে এই দুই খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, যা প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৪৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ, সামাজিক সুরক্ষা এবং পুনর্বাসনের মতো মূল কার্যক্রমের বিপরীতে এই দুই খাতে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক অর্থ বরাদ্দ রাখায় প্রকল্পের ব্যয়ের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

‘টেক্সটাইল ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর। প্রকল্পের আওতায় তৈরি পোশাক ও চামড়া শিল্পের শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাড়ানো, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো এবং দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৮২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। জার্মান সরকারের ৭০ লাখ ইউরোর অনুদানে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে ইউরোর বিপরীতে টাকার বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের ব্যয় ৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা বেড়ে ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের মূল বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকলেও টাকার হিসাবে প্রকল্পের আকার বেড়েছে।

তবে প্রকল্পের ব্যয় বাড়লেও বাস্তবায়নকাল বাড়ানো হয়নি। মূল প্রস্তাবে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে পুনর্গঠিত প্রস্তাবে বাস্তবায়ন শুরুর সময় ২০২৪ সালের জুলাই করা হয়েছে। শেষ সময় আগের মতোই ২০২৬ সালের ডিসেম্বর রাখা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ৪২ মাস থেকে কমে ৩০ মাসে দাঁড়িয়েছে।

প্রকল্পটির আওতায় ৮৯টি প্রশিক্ষণ, ৮৭টি কর্মশালা ও সেমিনার, চারটি গবেষণা, ছয়টি বিদেশ সফর, আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির মতো একাধিক কার্যক্রম এই সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে।

প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেওয়ারও প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও শ্রমিকদের সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। তবে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের তুলনায় সরাসরি শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দের চেয়ে প্রশিক্ষণ, পরামর্শক, কর্মশালা, গবেষণা ও বিদেশ সফরের মতো কারিগরি কার্যক্রমে বড় অঙ্কের অর্থ রাখা হয়েছে।

প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো কর্মক্ষেত্রে আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসন। এর আওতায় ১০০ জন আহত শ্রমিককে পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং কর্মজীবনে ফিরে আসার সুযোগ তৈরিই এর উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

টেক্সটাইল ও চামড়া খাতের আরও ১ লাখ ৫০ হাজার শ্রমিককে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অসুস্থতা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, বার্ধক্য, প্রতিবন্ধিতা ও বেকারত্বের মতো ঝুঁকি থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য একটি সামাজিক বিমা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি কাঠামো তৈরি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে। শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে তথ্য ব্যবস্থাপনা সহজ করার লক্ষ্য রয়েছে।

কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করাও প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। সরকার, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে লিখিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে মালিকের অর্থায়নে স্থায়ী কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে যে জটিলতা রয়েছে, একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা চালু হলে তা কমানো সম্ভব হবে বলে প্রকল্পের উদ্দেশ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্প প্রস্তাবে আরও ৭০টি কারখানায় কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ১০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব কারখানায় কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি ২ লাখ ২৫ হাজার শ্রমিকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি শ্রমিকদের আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়ানোকে প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে।

তৈরি পোশাক খাতে পূর্ণাঙ্গ কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালুর জন্য শ্রমিকদের গড় মজুরির প্রায় শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ হারে মালিকদের অবদান প্রয়োজন হতে পারে বলেও প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধরনের অবদানভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক সহায়তার কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও চামড়া শিল্পখাতে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর শ্রমিকদের চিকিৎসা, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। প্রকল্পের মাধ্যমে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তবে এই লক্ষ্যগুলোর পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয়ের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। মোট ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার মধ্যে ৪৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক খাতে ব্যয় হলে সরাসরি শ্রমিকদের জন্য কতটা অর্থ পৌঁছাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা উন্নয়ন হলেও প্রায় অর্ধেক অর্থ কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক কাজে ব্যয় হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের মতে, প্রকল্পটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতা বাড়ানো এবং শ্রমিকদের তথ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে বলে কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে।

প্রকল্পের অর্থায়নের ক্ষেত্রে জটিলতা

প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের সঙ্গে করা অনুদান চুক্তির মেয়াদ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে। কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের পুনর্গঠিত প্রস্তাব জমা দিতে দেরি হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুদান চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় থাকলেও এর মূল অনুদান চুক্তির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ জানিয়েছে, অনুদান চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। অর্থাৎ প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেলে অনুদানের অর্থ ব্যবহার ও প্রকল্পের কার্যক্রম চালিয়ে নিতে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো জরুরি হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও জ্বালানি বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে পুনর্গঠিত প্রকল্প প্রস্তাব সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি কমিশনে পাঠানো হয়। পরে ৯ মার্চ অনুদান চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়। তবে একনেকের কার্যপত্র তৈরির সময় পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, অনুদান চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অর্থাৎ একদিকে প্রকল্প অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে, অন্যদিকে প্রকল্পের অর্থায়নের ভিত্তি হিসেবে থাকা অনুদান চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টিও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

এএইচ/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর