- সার নিয়ে বিক্ষোভ, কোথাও ভাঙচুর
- ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তাকে শোকজ
- সারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা কৃষকের
- কমেছে দেশের সার উৎপাদন
- দ্বিগুণ দামে কিনতে হচ্ছে ডিএপি
- কয়েকটি কারখানায় বন্ধ সার উৎপাদন
আমন মৌসুমে জমিতে সার দিতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা বিপাকে পড়েছেন। সরকারি নির্ধারিত দামে সার পাওয়ার কথা থাকলেও অনেক এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী সার মিলছে না। কোথাও দিনের পর দিন ডিলারের দোকানে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার কোথাও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে প্রয়োজনীয় সার। সার না পেয়ে কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও বিক্ষোভ এবং কোথাও ডিলারের গুদাম ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে সার নিয়ে মাঠে তৈরি হওয়া অস্থিরতা এখন কৃষকের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ ছাড়িয়ে জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং কোনো ঘাটতি নেই। সরকারি হিসাবেও চাহিদার তুলনায় বেশি সার মজুত থাকার কথা বলা হচ্ছে। তাহলে প্রয়োজনের সময়ে কৃষকের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে না কেন, কোথায় আটকে যাচ্ছে সরবরাহব্যবস্থা এবং সরকারি গুদামে থাকা সার মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে গিয়ে কেন সংকট তৈরি হচ্ছে, এখন মূল প্রশ্ন সেখানেই।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে সার পেতে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে এক পরিবেশকের গুদামে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ভূরুঙ্গামারীতে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ ও কথিত সার সিন্ডিকেট ভাঙার দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কৃষকেরা। লালমনিরহাটেও একই দাবিতে মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। নাগেশ্বরীর কচাকাটা বাজারে সার নিতে সকাল থেকে অপেক্ষা করা কৃষকদের মধ্যে একপর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হলে গুদামের টিনের বেড়া ভাঙচুর করা হয়। কৃষকদের অভিযোগ, গুদামে সার থাকার পরও দীর্ঘ সময় পরিবেশকের লোকজন না আসায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
এ ধরনের ঘটনার পর কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কিছু অসাধু ডিলারসহ একটি মহল কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও সার নিয়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয় দাবি করেছে। একই সঙ্গে আসন্ন রবি মৌসুম সামনে রেখে কৃষকদের একটি অংশ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার মজুত করার চেষ্টা করছে বলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
তবে মাঠের বাস্তবতায় কৃষকদের প্রশ্ন ভিন্ন। সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকলে ডিলারের দোকানে কেন সার মিলছে না? বরাদ্দ অনুযায়ী সার উত্তোলন ও বিতরণে গড়িমসি হচ্ছে কি না, পরিবেশক পর্যায়ে সার মজুত করে রাখা হচ্ছে কি না, নাকি সরবরাহব্যবস্থার কোনো ধাপে গিয়ে সার আটকে যাচ্ছে, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব ধরনের সারের চাহিদা ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন। বিপরীতে সরকারের সংগ্রহে রয়েছে প্রায় ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টন সার। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টন বেশি সার থাকার কথা। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইউরিয়া সারের চাহিদা ১৪ লাখ ২৯ হাজার টন, টিএসপি ৪ লাখ ৬৭ হাজার টন, ডিএপি ১০ লাখ ২৩ হাজার টন এবং এমওপি সারের চাহিদা ৬ লাখ টন।

সরকারি হিসাবে ওই সময়ের জন্য মোট জোগান ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ১৭ লাখ ৪৬ হাজার টন, টিএসপি ৯ লাখ ৪৫ হাজার টন, ডিএপি ১৩ লাখ ৮৪ হাজার টন এবং এমওপি ১১ লাখ টন। সব মিলিয়ে মজুতের পরিমাণ প্রায় ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টন।
কিন্তু এই হিসাবের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সরকার নির্ধারিত প্রতি ৫০ কেজি ডিএপি সারের দাম ১ হাজার ৫০ টাকা। অথচ বিভিন্ন জেলায় কৃষকদের একই পরিমাণ সার ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত কিনতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অর্থাৎ কোথাও কোথাও নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
সারের সরবরাহ নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনাতেও অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্টে কয়েকটি জেলার ডিলাররা সরকারি গুদাম থেকে তাদের বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক সার উত্তোলন করেছেন। ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তারা বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে যথাসময়ে অবহিত না করায় পরে তদন্ত শুরু হয়। এ ঘটনায় ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে। চারজন জেলা কৃষি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার এবং আরও চারজনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের দুই কর্মকর্তাকেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২৮ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ দিনে ২০৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ৩৪ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৪ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। লুট হওয়া ১ হাজার ৭০০ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে। চারজনকে কারাদণ্ড এবং পাঁচজনের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি ৬৪ জেলায় একজন করে মনিটরিং কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।
সার নিয়ে মাঠের অস্থিরতার পেছনে ডিলার ব্যবস্থার পরিবর্তনও একটি কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। সরকার নতুন করে সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় একটি ইউনিয়নে তিনজন ডিলার এবং ছয়জন খুচরা বিক্রেতা নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। আগে একটি ইউনিয়নে একজন ডিলারের মাধ্যমে সার বিতরণের ব্যবস্থা ছিল।
এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার ১৪ সেপ্টেম্বরের চিঠি এবং সংযুক্ত জেলাওয়ারি বরাদ্দ তালিকায় বলা হয়েছে, দেশে মোট সারের চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে ৫১ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন সার সরবরাহের প্রস্তুতি রয়েছে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন বেশি সার মজুত ও সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অক্টোবর মাসে ৬৪ জেলার জন্য টিএসপি সারের চাহিদা ৭০ হাজার ৫২ মেট্রিক টন। এর পুরো পরিমাণ বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ডিএপি সারের চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার ৯১০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন ১ হাজার টন এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯১০ টন বরাদ্দ দিয়েছে। অক্টোবর মাসে এমওপি সারের চাহিদা ৯৩ হাজার ৬৫৪ মেট্রিক টন। এই পরিমাণ সারও জেলাভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সরকার সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানিও অব্যাহত রেখেছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি, ডিএপি ও ইউরিয়া সার আমদানির তিনটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর মধ্যে বেলারুশ থেকে ৩০ হাজার টন এমওপি, মরক্কো থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি এবং সৌদি আরব থেকে ৪০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আগে আগস্ট মাসে বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছিল।
গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া ৪ লাখ ১৮ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন, ডিএপি ৩ লাখ ২ হাজার টন এবং এমওপি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০০ টন মজুত ছিল। এর বাইরে পরিবহনের পথে ছিল টিএসপি ১ লাখ ২৮ হাজার ২০০ টন, ডিএপি ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ টন এবং এমওপি ১ লাখ ৮৯ হাজার ৪০০ টন। ফলে মজুত ও পরিবহনাধীন সার মিলিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার রয়েছে।

তবে আমদানির ক্ষেত্রে সময়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি মন্ত্রণালয় গত ৩ আগস্ট বেসরকারিভাবে ২ লাখ টন টিএসপি, ৫ লাখ টন ডিএপি এবং ২ লাখ ৫০ হাজার টন এমওপি সংগ্রহের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়েও এর বড় একটি অংশের চূড়ান্ত অনুমোদন হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানির অনুমোদনের পর জাহাজে সার আনা, দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন এবং কৃষকের কাছে পৌঁছাতে ৮০ থেকে ৯০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে এখন অনুমোদন হলেও এর একটি অংশ কৃষকের কাছে পৌঁছাতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অথচ অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে সারের চাহিদা বেড়ে যায়।
ডিএপি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেশি। আগামী অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডিএপি সারের চাহিদা ১০ লাখ টনের বেশি। অথচ ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিএডিসির কাছে থাকা ডিএপি মজুত নিয়ে সরকারি তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথির পার্থক্য রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত হিসাবে ৩ লাখ টনের বেশি ডিএপি মজুত থাকার কথা বলা হলেও সংশ্লিষ্ট নথিতে বিএডিসির হাতে ১ লাখ ৪১ হাজার টন ডিএপি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এরই মধ্যে বিএডিসির সাতটি জাহাজে ডিএপি ও টিএসপি সার চলতি সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বন্দরে আসার কথা রয়েছে। মরক্কো থেকে একটি ৩০ হাজার টনের ডিএপি চালান দেশে পৌঁছেছে। আরও ৬০ হাজার টন ডিএপি জাহাজে তোলার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, সার ব্যবস্থাপনায় সরকারের প্রধান গুরুত্ব চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনা ও আগাম প্রস্তুতির ওপর। কোন এলাকায় কত সার প্রয়োজন, কখন প্রয়োজন এবং কীভাবে তা কৃষকের কাছে পৌঁছানো হবে, এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে সার সরবরাহ ও বিতরণ কার্যক্রমও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোথাও চাহিদার তুলনায় সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বলেছেন, কার্যত সারের কোনো সংকট নেই। তার ভাষ্য, সার নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনে সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা রয়েছে। মন্ত্রণালয় কৃষকদের চাহিদা নিরূপণ করে প্রতিটি জেলায় সার সরবরাহ করেছে এবং ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলেও তিনি জানান।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদও বলেছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। সার থাকার কথা ডিলারের কাছে, কিন্তু তা ডিলার নয় এমন ব্যক্তিদের কাছে পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক দল কাজ করছে।
এদিকে ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই শিফটে সার ব্যবস্থাপনা কন্ট্রোল রুম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে সার সরবরাহ, মজুত, পরিবহন ও বিতরণের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। কোথাও কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুত, কালোবাজারি বা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। কৃষক, ডিলার, পরিবহনকারীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগও সেখানে গ্রহণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও কৃষকের কাছে প্রয়োজনের সময়ে সার না পৌঁছানোর বিষয়টি শুধু উৎপাদন বা মজুতের ঘাটতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সার আমদানি, সরকারি গুদামে সংরক্ষণ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ, ডিলারের মাধ্যমে উত্তোলন এবং খুচরা পর্যায়ে বিক্রি পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় কোথায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা জরুরি।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশে সারের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, এর প্রধান কারণ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলে কারসাজির সুযোগ তৈরি হতো না। সরবরাহে ঘাটতি থাকলেই ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করেন। বর্তমানে সার আমদানি ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দুটোই কমে যাওয়ায় চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

এই বিশ্লেষক বলেন, উপসাগরীয় দেশ, রাশিয়া ও কানাডা থেকে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার আসে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি ও বাব-এল-মানদেবকে ঘিরে সামুদ্রিক পরিবহন পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বেড়েছে। ফলে আগের মতো পরিমাণে সার আমদানি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনও কমেছে। আগে বছরে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ লাখ টন সার উৎপাদন হলেও বর্তমানে তা ১০ থেকে ১১ লাখ টনে নেমেছে। সাতটি সার কারখানার মধ্যে মাত্র একটি বড় কারখানা চালু রয়েছে। জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে অন্য কারখানাগুলো উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।
ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অনেক ডিলার তাদের চাহিদার অর্ধেক সারও পাচ্ছেন না বলে জানাচ্ছেন। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, তার সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ী ও ডিলারদের কেউ কেউ। এতে অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সামনে রবি ও বোরো মৌসুমে শাকসবজি ও আলুর আবাদ শুরু হবে। বিশেষ করে আলু চাষে সারের চাহিদা বেশি। এ সময় পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই দেশের অভ্যন্তরীণ সার উৎপাদন পুরোপুরি চালু করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে বিকল্প উৎস থেকেও সার আমদানি করতে হবে।
ডিলার পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া সব ডিলার খারাপ, এমন ধারণা ঠিক নয়। কোনো ডিলার অপরাধে জড়িত থাকলে তাকে সরানো যেতে পারে। কিন্তু ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করা ডিলারদের অকারণে পরিবর্তন করলে সার বিতরণব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। সরকার নতুন ব্যবস্থায় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা বাড়াচ্ছে। এতে বিতরণব্যবস্থা বিস্তৃত হতে পারে। তবে সার সংকট দূর করার মূল বিষয় হলো ব্যবস্থাপনার উন্নতি। সরকারের সার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর ও সমন্বিত করতে হবে।
এএইচ/জেবি




