শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

‘কর ছাড়ের লাভ’ যাচ্ছে কার পকেটে?

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:২২ এএম

শেয়ার করুন:

‘কর ছাড়ের লাভ’ যাচ্ছে কার পকেটে?
  • ৬৩টি নিত্যপণ্যে কর কমিয়ে ০.৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে সরকার
  • কর কমলেও চাল, ডাল, তেল ও মসলার দাম কমেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে
  • ব্যবসায়ীদের দাবি, নতুন করহারের পণ্য এখনও পুরোপুরি বাজারে আসেনি
  • ভোক্তা সংগঠনগুলোর মতে, বাজার তদারকির অভাবে কর-সুবিধা জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে না
  • অর্থনীতিবিদরা সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, উচ্চ ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দায়ী করছেন

জাতীয় বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর কমিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। চাল, ডাল, তেল, মসলা, চিনি, লবণ, পেঁয়াজ, রসুনসহ ৬০টির বেশি পণ্যে কর-সুবিধা দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষের কিছুটা স্বস্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কর কমলেও বাজারে কমেনি দাম। বরং অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্য আরও বেড়েছে। ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে, কর ছাড়ের ফলে সাশ্রয় হওয়া অর্থ আসলে কার পকেটে যাচ্ছে?

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ধান, চাল, গম, আটা, মাছ, মাংস, হাঁস-মুরগি, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি এবং বিভিন্ন মসলাসহ ৬৩টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর ৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে অভিন্ন ০.৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এছাড়া আমদানিকৃত মসলা ও খেজুরের ওপর থাকা নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকারের আশা ছিল, আমদানি ও বাজারজাতকরণ ব্যয় কমে খুচরা বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

কিন্তু রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার, মিরপুর ও কৃষি মার্কেটসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম আগের অবস্থানেই রয়েছে। কোথাও কোথাও আবার বেড়েছে।

c9ecb5a5c3262f78dd7c8b4e412192dc7fef0129705568e4

চালের বাজারে নেই স্বস্তি

দেশের প্রধান খাদ্যপণ্য চালের বাজারে গত কয়েক মাসে ধারাবাহিকভাবে দাম বেড়েছে। বর্তমানে মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কালিজিরা চাল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা, চিনিগুঁড়া চাল ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোলাও চাল ২০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

কয়েক মাস আগেও যে পোলাও চাল ১৬০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটির দাম বেড়ে ২০০ টাকায় পৌঁছেছে। বিআর-২৮, বিআর-২৯, স্বর্ণা ও পায়জাম চালের দামও কেজিতে ৪ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা রবিউল আলম বলেন, বাজেটের পর ভেবেছিলাম চালের দাম অন্তত কিছুটা কমবে। কিন্তু বাজারে এসে উল্টো চিত্র দেখছি। দাম কমার কোনো লক্ষণই নেই।

rice

ডাল, তেল ও মসলার ঝাঁজে পুড়ছে সংসার

চালের পাশাপাশি ডাল, তেল ও মসলার বাজারও ভোক্তাদের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে ছোট মশুর ডাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, মুগডাল ১৩০ থেকে ১৭০ টাকা এবং ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক মাস আগেও এসব পণ্যের দাম তুলনামূলক কম ছিল।

ভোজ্যতেলের বাজারেও নেই স্বস্তি। বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৯৯ টাকা, দুই লিটারের বোতল ৩৯৮ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতল ৯৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মসলার বাজারে মূল্যবৃদ্ধি আরও প্রকট। দেশি ও আমদানি করা শুকনা মরিচ ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, জিরা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, দারুচিনি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, লবঙ্গ প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং ছোট এলাচ ৪ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

ডেমরা গৃহিণী রেবেকা সুলতানা বলেন, আগে রান্নায় যে পরিমাণ মসলা ব্যবহার করতাম, এখন অনেক কিছু কমিয়ে দিতে হচ্ছে। বাজারে গেলে মনে হয় প্রতিদিনই কোনো না কোনো জিনিসের দাম বেড়েছে।

Price

ব্যবসায়ীদের যুক্তি, ভোক্তাদের প্রশ্ন

ব্যবসায়ীদের দাবি, নতুন করহারে আমদানি করা পণ্য এখনো পুরোপুরি বাজারে আসেনি। তাই দাম কমার প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।

কারওয়ান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী হারিস আহমেদ  বলেন, আমরা পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে কিনছি। কম দামে বিক্রি করার সুযোগ নেই। নতুন শুল্ক সুবিধার পণ্য বাজারে আসতে সময় লাগবে।

তবে ভোক্তাদের প্রশ্ন, কর বাড়ানোর ঘোষণা এলেই যদি বাজারে সঙ্গে সঙ্গে দাম বেড়ে যায়, তাহলে কর কমানোর পর সেই প্রভাব কেন দেখা যায় না?

‘দ্বিমুখী নীতি’ দেখছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সরকার নিত্যপণ্যে কর কমিয়েছে, কিন্তু তার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন পুরোনো শুল্কে আমদানি করা পণ্য রয়েছে বলে দাম কমছে না। অথচ অতীতে বহুবার দেখা গেছে, কর বাড়ানোর ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এই দ্বিমুখী নীতির কারণে ভোক্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, বাজারে কঠোর নজরদারি ছাড়া কর-সুবিধার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

কনজুমারস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন মালেকও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, বাজার তদারকি দুর্বল থাকলে কর কমানোর সুবিধা কখনোই ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে না। ব্যবসায়ীরা তখন সেই সুবিধা নিজেদের মধ্যেই ধরে রাখবেন।

অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, কর কমানো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় খুব বড় নয়। তবে কিছু প্রভাব বাজারে পড়ার কথা ছিল।

তার মতে, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে প্রতিযোগিতার অভাবের কারণে কর-সুবিধার প্রভাব ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীরাও বড় ভূমিকা রাখছেন।

সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত

বাজারের এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। আয় না বাড়লেও খাদ্য ব্যয় বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে। ফলে অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবহার কমাতে বাধ্য হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী নাঈম বলেন, কয়েক মাস আগেও যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার হতো, এখন সেই টাকায় অর্ধেকও হয় না। কর কমেছে শুনি, কিন্তু বাজারে এসে তার কোনো প্রমাণ পাই না।

উত্তর খুঁজছে ভোক্তারা

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কর কমানো যথেষ্ট নয়। আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কর-সুবিধার কতটুকু ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি অস্বাভাবিক মুনাফা ও বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

কারণ বাস্তবতা হলো, সরকার রাজস্ব ছাড় দিয়েছে, কিন্তু বাজারে স্বস্তি আসেনি। ফলে সাধারণ মানুষের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—কর কমলে যদি দাম না কমে, তাহলে কর ছাড়ের লাভ আসলে কার পকেটে যাচ্ছে?

এমআর/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর