বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ঢাকা

ব্যাংক খাতের নিট লোকসান ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ১৮ জুন ২০২৬, ০২:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

ব্যাংক খাতের নিট লোকসান ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি

দেশের ব্যাংক খাত ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চাপা থাকা খেলাপি ঋণ ও দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসায় ২০২৫ সালে পুরো ব্যাংকিং খাতের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগেও খাতটি ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ‘বার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫’-এ এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের নিট সুদ আয় ঋণাত্মক ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের যে পরিমাণ সুদ পরিশোধ করেছে, ঋণ থেকে তার চেয়ে কম আয় করেছে। ২০২৪ সালে নিট সুদ আয় ছিল ২৯ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।


বিজ্ঞাপন


তবে সুদবহির্ভূত আয় বেড়েছে। ২০২৪ সালে এ আয় ছিল ৬৩ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৮৩ হাজার ১৭১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে ৫১ হাজার ৬৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৪৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের কর-পূর্ব লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা এবং কর-পরবর্তী বা নিট লোকসান হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে পৃথক ব্যাংকের লাভ-লোকসানের তথ্য না থাকলেও জাতীয় বাজেটের সঙ্গে প্রকাশিত ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও তথ্যাবলি’ গ্রন্থে ব্যাংকভিত্তিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি লোকসান করা ১০টি ব্যাংকের সম্মিলিত লোকসান ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এরপর রয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (৩১ হাজার কোটি টাকা), এক্সিম ব্যাংক (২৮ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা) এবং ইউনিয়ন ব্যাংক (৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা)।

লোকসানে থাকা অন্যান্য ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক (৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা), আইএফআইসি ব্যাংক (২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা), ন্যাশনাল ব্যাংক (২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা), প্রিমিয়ার ব্যাংক (৯৯৩ কোটি টাকা) এবং পদ্মা ব্যাংক (৯৩০ কোটি টাকা)।

অন্যদিকে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কয়েকটি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, যার নিট মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা। এছাড়া সিটি ব্যাংক ১ হাজার ৩০৬ কোটি, পূবালী ব্যাংক ১ হাজার ৭৯ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক ৯১০ কোটি এবং প্রাইম ব্যাংক ৮৯০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আগের বছরগুলোতে বিভিন্ন সুবিধার মাধ্যমে অনেক ঋণ নিয়মিত দেখানো হলেও ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করে। এর ফলে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক খাতের দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব ঋণ সঠিকভাবে বিতরণ ও আদায় হলে ব্যাংক খাতের অবস্থার উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠেছিল। পরে বিশেষ পুনঃতপশিলের কারণে বছরের শেষ তিন মাসে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমে ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

তবে পুনঃতপশিলের পরও ব্যাংক খাতের দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়ে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। মোট ঋণের হিসাবে এর পরিমাণ ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এক বছর আগে এ ধরনের ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতিতেও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমবারের মতো পুরো ব্যাংক খাতের মূলধন সক্ষমতা ঋণাত্মক ধারায় নেমে গেছে। ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে যেখানে ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ মূলধন থাকার কথা, সেখানে ২০২৫ সালের শেষে তা ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমেছে। এর পেছনে ২০টি ব্যাংকের প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি বড় ভূমিকা রেখেছে।

ব্যাংক খাতের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণার নীতিও কঠোর করেছে। ২০২৫ সালের জন্য খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশ বা তার বেশি হলে কোনো ব্যাংককে লভ্যাংশ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। একইভাবে মূলধন বা প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোও লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারেনি।

ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৬টি ব্যাংক ২০২৫ সালের জন্য লভ্যাংশ দিতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৬ সালের জন্য বিদ্যমান শর্তের পাশাপাশি নতুন শর্ত যুক্ত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার কম হলে তারা নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।

টিএই/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর