শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ঢাকা

কৃষিঋণে গতি ফিরলেও আদায়ে চ্যালেঞ্জ, উদ্বেগজনক খেলাপি!

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ২৩ মে ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

শেয়ার করুন:

কৃষিঋণে গতি ফিরলেও আদায়ে চ্যালেঞ্জ, উদ্বেগজনক খেলাপি!

* কৃষিঋণ বিতরণ ২৩.৮ শতাংশ বেড়ে ৩০ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা
* খেলাপি ঋণ বেড়ে ২০ হাজার ১১১ কোটি টাকা
* এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২৯০ শতাংশ 
*‘ওভারডিউ’ বেড়ে ২২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা
* ঋণ বিতরণে শীর্ষে কৃষি ব্যাংক
* বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতরণ ইসলামী ব্যাংকের

 


বিজ্ঞাপন


দেশের কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে উল্লেখযোগ্য গতি ফিরেছে। তবে একই সময়ে বকেয়া, ওভারডিউ ও শ্রেণিকৃত ঋণের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন কৃষি অর্থায়ন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় ২০২৬ সালের মার্চে শ্রেণিকৃত (খেলাপি) কৃষিঋণ বেড়েছে প্রায় চার গুণ। এছাড়াও অতিরিক্ত বকেয়া (ওভারডিউ) ঋণ দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ায় কৃষিঋণ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা ও আদায় সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে দেশের ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লী খাতে মোট ৩০ হাজার ৫৯৯ কোটি ১১ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে বিতরণ ছিল ২৪ হাজার ৮৬০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার ৭৩৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বা ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জন হয়েছে ৭৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ।  

image
এক বছরের ব্যবধানে কৃষি ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার ৭৩৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বা ২৩.৮% :  বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান এখনো ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং প্রায় ৪৬ শতাংশ কর্মসংস্থান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, আবাদি জমি হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাকে কৃষির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, বহুমুখী চাষাবাদ এবং টেকসই অর্থায়ন কাঠামোকে ভবিষ্যৎ কৃষি প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 


বিজ্ঞাপন


 

এই খাতে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের মার্চে মোট শ্রেণিকৃত কৃষিঋণ ছিল ৫ হাজার ১৬১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ১১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকার বেশি, যা প্রবৃদ্ধির হিসাবে ২৮৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণ ২ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৩ হাজার ৪১৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধি ৩৯৫ শতাংশের বেশি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণ ১ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণও ২২২ শতাংশ বেড়ে ৮৮৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ২২ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকের কোনো শ্রেণিকৃত ঋণ নেই।

সূত্র জানিয়েছে, বিতরণকৃত এসব ঋণ বেশিরভাগই পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক থেকে কৃষি খাতেও ব্যাপক হারে বেনামি ঋণ দেওয়া হয়েছে। যেগুলো এখন আদায় হচ্ছে না, যা পর্যায়ক্রমে খেলাপি হচ্ছে। আওয়ামী লুটপাটের নেতিবাচক প্রভাব এখন পড়ছে কৃষি খাতে।

image
ঋণ বিতরণে শীর্ষে কৃষি ব্যাংক

ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এসব ব্যাংকের বিতরণ ছিল ৯ হাজার ৪৫৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮১১ কোটি ৯১ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে বিতরণ বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। মোট বিতরণে এ খাতের অংশ ৪২ শতাংশ।

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর বিতরণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৭ হাজার ৮০৩ কোটি টাকার বিপরীতে ২০২৬ সালের মার্চে বিতরণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকায়। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০ দশমিক ১৯ শতাংশ। মোট বিতরণে এ খাতের অংশ ৩১ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিক থেকেও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ১০ হাজার ২২৩ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে তারা বিতরণ করেছে ৯১ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

এছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণ বিতরণও বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে এসব ব্যাংকের বিতরণ ছিল ২ হাজার ৪৪২ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। প্রবৃদ্ধি ২৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিতরণে। ২০২৫ সালের মার্চে এসব ব্যাংকের বিতরণ ছিল ৯৬৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ১ হাজার ৩৭৩ কোটি ২১ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধি ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে ৮৬ দশমিক ২০ শতাংশ।

অন্যদিকে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর চিত্র ছিল ভিন্ন। ২০২৫ সালের মার্চে এসব ব্যাংকের বিতরণ ছিল ৪ হাজার ৩০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১০৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকায়। অর্থাৎ বিতরণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও হয়েছে তুলনামূলক কম, মাত্র ৬৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

ব্যাংকভিত্তিক বিতরণে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ব্যাংকটি ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে ৯৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ব্যাংকটির বকেয়া স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক বিতরণ করেছে ১ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা।

image
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৃষি ঋণ বিতরণ ইসলামী ব্যাংকের

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংক ১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা এবং জনতা ব্যাংক ৫৪৭ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রার ১০৫ শতাংশ অর্জন করে ৭৯৪ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংক ১ হাজার ৭৬ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ৯৮৪ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক ৮৮৯ কোটি টাকা এবং পূবালী ব্যাংক ৮৮২ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি একাই ২ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা বিতরণ করেছে, যা এ খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক বিতরণ করেছে ৬৭৫ কোটি টাকা।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট বিতরণের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে ফসল খাতে। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ফসল খাতে বিতরণ হয়েছে ১৪ হাজার ৮১৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যা মোট বিতরণের ৪৮ দশমিক ৪১ শতাংশ। যদিও নীতিমালা অনুযায়ী এ খাতে কমপক্ষে ৫৫ শতাংশ ঋণ দেওয়ার কথা। প্রাণিসম্পদ ও খামারিদের মাঝে বিতরণ হয়েছে ৮ হাজার ৩৮ কোটি ৬ লাখ টাকা বা ২৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। মৎস্য খাতে বিতরণ হয়েছে ৪ হাজার ২২৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এছাড়া পল্লীঋণে ৩ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা, দারিদ্র্য বিমোচনে ১ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা এবং কৃষিযন্ত্র ও সেচযন্ত্রে মিলিয়ে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে। 

অন্যদিকে বিতরণ বৃদ্ধির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে বকেয়া ও অতিরিক্ত বকেয়ার (ওভারডিউ) স্থিতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে আদায়ের জন্য নির্ধারিত মোট বকেয়া কৃষিঋণের পরিমাণ ছিল ৩৮ হাজার ২২৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ৩৯৯ কোটি ৮০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বকেয়া বেড়েছে ১৭ হাজার ১৭০ কোটি টাকার বেশি, যা প্রবৃদ্ধির হিসাবে ৪৪ দশমিক ৯১ শতাংশ।

এছাড়াও ২০২৫ সালের মার্চে কৃষিখাতে মোট ওভারডিউ ঋণ ছিল ১০ হাজার ৯৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার ৭৩১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বৃদ্ধি পেয়েছে ১২৫ দশমিক ১৩ শতাংশ।

টিএই/ক.ম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর