দেশ বর্তমানে এক জটিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, কৃষির অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, নগরজট, পরিবেশ বিপর্যয় এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা জনগণের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে।
নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন এবং জনআকাঙ্ক্ষার বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরের জন্য একটি ‘মানবিক, উৎপাদনমুখী ও সামাজিক নিরাপত্তাভিত্তিক’ বাজেট প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় একটি সম্ভাব্য ৯ লাখ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট কল্পনা করা যেতে পারে, যেখানে জনগণের প্রত্যক্ষ কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
এই বাজেটের মূল দর্শন হতে পারে—
* উৎপাদন বৃদ্ধি
* কর্মসংস্থান সৃষ্টি
* সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার
বিজ্ঞাপন
* দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ
* কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্জাগরণ
* মানবসম্পদ উন্নয়ন
* পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন
* রাষ্ট্রীয় সেবায় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা
* আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, এবং
* কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা
সম্ভাব্য বাজেট কাঠামো (২০২৬–২৭)
খাত প্রস্তাবিত পরিমাণ:
মোট বাজেট ৯ লাখ কোটি টাকা
মোট রাজস্ব আয় ৭ লাখ কোটি টাকা
কর রাজস্ব ৬.২৫ লাখ কোটি টাকা
বৈদেশিক অনুদান ও সহায়তা ৮০ হাজার কোটি টাকা
বাজেট ঘাটতি ১.২০ লাখ কোটি টাকা
এডিপি ৩ লাখ কোটি টাকা
সামাজিক নিরাপত্তা ১.৮০ লাখ কোটি টাকা
প্রতিরক্ষা খাত ৮০ হাজার কোটি টাকা
ক) কৃষকের জন্য সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তা
কৃষকরা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। অথচ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার অস্থিরতায় তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হতে পারে ‘জাতীয় কৃষক সহায়তা।’
এর সুবিধা
* ভর্তুকিযুক্ত সার ও ডিজেল
* সহজ কৃষিঋণ
* কৃষি বীমা
* সরাসরি নগদ সহায়তা
* ন্যায্যমূল্যে ফসল ক্রয়
* কৃষক পর্যায় থেকে বাজারে পণ্য পৌঁছার সুবিধা
* দুর্যোগকালীন প্রণোদনা
সম্ভাব্য বরাদ্দ
* কৃষক সহায়তা তহবিল: ৩০ হাজার কোটি টাকা
* কৃষি ভর্তুকি: ৪৫ হাজার কোটি টাকা
খ) সবার জন্য চিকিৎসা নিরাপত্তা
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত জনগণের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো চিকিৎসা ব্যয়। একটি বড় রোগ পুরো পরিবারকে দরিদ্র করে দিতে পারে।
জাতীয় স্বাস্থ্য সহায়তা কর্মসূচি
প্রত্যেক নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারকে স্বাস্থ্য সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।
সুবিধাসমূহ
* সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা
* নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে ছাড়
* মাতৃত্ব ও শিশুসেবা
* জরুরি চিকিৎসা সহায়তা
* ডায়াগনস্টিক সুবিধা
* দারিদ্র্যসীমার নিচে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য বিনামূল্যে সেবাদান
সম্ভাব্য বরাদ্দ
* স্বাস্থ্য সহায়তা কর্মসূচি: ২৫ হাজার কোটি টাকা
* স্বাস্থ্যখাতে মোট বরাদ্দ: ১ লাখ কোটি টাকা
গ) বয়স্ক সহায়তা: মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের নিশ্চয়তা
বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
বয়স্ক সহায়তা প্রকল্পের সুবিধা:
* মাসিক ভাতা
* বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা
* ওষুধ সহায়তা
* গণপরিবহনে ছাড়
* জরুরি সেবায় অগ্রাধিকার
সম্ভাব্য বরাদ্দ
* বয়স্ক ভাতা ও সহায়তা: ৩৫ হাজার কোটি টাকা
ঘ) খাল খনন ও নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচি
বাংলাদেশের পরিবেশ, কৃষি ও জলাবদ্ধতা সমস্যার অন্যতম সমাধান হলো খাল ও নদী পুনরুদ্ধার।
জাতীয় খাল খনন কর্মসূচির লক্ষ্য:
* জলাবদ্ধতা নিরসন
* কৃষিতে সেচ সুবিধা
* নৌপথ পুনরুদ্ধার
* বৃষ্টি এবং ভূপৃষ্ঠস্থ পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার
* বন্যা নিয়ন্ত্রণ
* ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো
সম্ভাব্য বরাদ্দ:
* খাল খনন ও নদী পুনরুদ্ধার: ২০ হাজার কোটি টাকা
কর্মসংস্থান: এই প্রকল্পে গ্রামীণ অঞ্চলে লাখো মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
ঙ) জাতীয় বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দেশ কর্মসূচি
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশে পরিবেশ রক্ষা এখন অর্থনৈতিক প্রয়োজনেও পরিণত হয়েছে।
বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনার লক্ষ্য:
* ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণ
* উপকূলীয় বনায়ন
* নগরে সবুজায়ন
* ফলজ ও বনজ গাছ বিতরণ
* রাস্তা, সরকারী জমি এবং যেকোনো পতিত জমি খালি না রাখা,
* রক্ষণাবেক্ষণ মালিকানা শেয়ারিং কর্মসূচি
সম্ভাব্য বরাদ্দ:
* বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ তহবিল: ১২ হাজার কোটি টাকা
চ) নতুন পে-স্কেল: মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন কাঠামো
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরে জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
সম্ভাব্য নতুন পে-স্কেলের মূল বৈশিষ্ট্য:
* মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন
* নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের বেশি সুবিধা
* মহার্ঘ ভাতা
* চিকিৎসা ও আবাসন সুবিধা
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে আগামী অর্থবছরে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৩০ হাজার কোটি টাকা
ছ) যুব কর্মসংস্থান মিশনের লক্ষ্য:
* বছরে ১৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান
* দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারের দক্ষতা অর্জন
* আইটি, এআই, ফ্রিল্যান্সিং ও সাইবার খাত সম্প্রসারণ
* ডিজিটাল মার্কেটিং
* উদ্যোক্তা সক্ষমতা
সম্ভাব্য বরাদ্দ:
* যুব কর্মসংস্থান তহবিল: ১৮ হাজার কোটি টাকা
জ) গ্রামীণ উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ
গ্রামের অর্থনীতি শক্তিশালী না হলে জাতীয় অর্থনীতি টেকসই হবে না। এ লক্ষ্যে সরকারের অগ্রাধিকার:
* গ্রামীণ রাস্তা
* সেচব্যবস্থা
* ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র
* ডিজিটাল সেবা
* স্থানীয় বাজার ও গ্রোথসন্টার উন্নয়ন
সম্ভাব্য বরাদ্দ
* স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন: ৭৫ হাজার কোটি টাকা
ঝ) শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্য
* শিক্ষার মান যুগোপযোগী করা
* প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা
* গবেষণা বৃদ্ধি
* কর্মমুখী শিক্ষা
* শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপের সুযোগ সৃষ্টি করা
বিশেষ কর্মসূচি:
* প্রত্যেক উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র
* শিক্ষা ঋণ
* গবেষণা অনুদান
সম্ভাব্য বরাদ্দ
* শিক্ষা খাত: ১.৪০ লাখ কোটি টাকা
ঞ) নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন
সম্ভাব্য উদ্যোগ:
* নারী উদ্যোক্তা তহবিল
* ক্ষুদ্রঋণ সহজীকরণ
* কর্মজীবী নারী হোস্টেল
* মাতৃত্ব সহায়তা বৃদ্ধি
সম্ভাব্য বরাদ্দ
* নারী উন্নয়ন কর্মসূচি: ১৫ হাজার কোটি টাকা
ট) নগরজট নিরসন ও গণপরিবহন
অগ্রাধিকার:
* সমন্বিত বাস ব্যবস্থা
* নতুন ফ্লাইওভার নয়, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
* ওয়াটার বাস
* শহরতলী রেল
সম্ভাব্য বরাদ্দ
* নগর পরিবহন: ৫০ হাজার কোটি টাকা
ঠ) প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা:
আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, সাইবার ঝুঁকি এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বিবেচনায় প্রতিরক্ষা খাতে আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অগ্রাধিকার
* সশস্ত্র বাহিনীর প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন
* সীমান্ত নজরদারি বৃদ্ধি
* সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট
* দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ
* দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি
সম্ভাব্য বরাদ্দ
* প্রতিরক্ষা খাত: ৮০ হাজার কোটি টাকা
ড) দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক সংস্কার
একটি বড় জনগোষ্ঠী এখন মনে করে—দুর্নীতি কমানো ছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কার সফল হবে না।
সম্ভাব্য পদক্ষেপ:
* ই-গভর্নেন্স
* সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন
* টেন্ডারে স্বচ্ছতা
* সম্পদ বিবরণী বাধ্যতামূলক
* দুর্নীতি/ঘুষবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল
ঢ) আসন্ন বাজেটে বিশুদ্ধ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। লক্ষ্য:
* বিষমুক্ত কৃষি
* ভেজাল ও বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করা
বাজেটে বিশুদ্ধ খাদ্য নিরাপত্তা আনার পদক্ষেপ:
* প্রতিটি বিভাগে মানসম্মত ফুড সেফটি ল্যাব স্থাপন
* জেলা পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্যের মোবাইল ল্যাব স্থাপন
* কৃষিতে জৈব সার, আইপিএম পদ্ধতি, এবং নিরাপদ ফসল উৎপাদনে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ও ভর্তুকি,
* কোল্ড চেইন, হিমাগার ও পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণে সহজ শর্তে ঋণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি
* ফসলের পুষ্টিমান বাড়াতে এবং প্রতিকূল পরিবেশসহনশীল জাত উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা
* নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও এসটিআই সক্ষমতা বাড়ানো
* আমদানি পর্যায়ে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ
খাতভিত্তিক বরাদ্দ (%)
শিক্ষা ১৫%
স্বাস্থ্য ১১%
কৃষি ৮%
সামাজিক নিরাপত্তা ২০%
অবকাঠামো ও এডিপি ২০%
স্থানীয় সরকার ৮%
প্রতিরক্ষা ৯%
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ৪%
পরিবেশ ও জলবায়ু ২%
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন ৩%
রাজস্ব আহরণের সম্ভাব্য উৎস:
৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব অর্জনের সম্ভাব্য পরিকল্পনা
উৎস সম্ভাব্য আয়
আয়কর ২.৮০ লাখ কোটি টাকা
ভ্যাট ২.১০ লাখ কোটি টাকা
আমদানি শুল্ক ১.১০ লাখ কোটি টাকা
অপ্রদর্শিত সম্পদ কর ২০ হাজার কোটি টাকা
ডিজিটাল অর্থনীতি কর ১৫ হাজার কোটি টাকা
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ২৫ হাজার কোটি টাকা
রাজধানীসহ বড় বড় শহরের আয়নির্ভর ভবনগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে করের আওতায় আনা, রাজস্ব ব্যবস্থা পূর্ণ অটোমেশন এবং সকল প্রকার লেনদেন রাজস্ব সিস্টেমে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে রাজস্ব আহরনের লক্ষ অর্জন অসম্ভব হবে না। দুর্নীতি হওয়া বা পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে ট্রুথ কমিশন গঠন, আইনী পদক্ষেপ, এবং শ্বেতপত্র প্রকাশ করা যেতে পারে। বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রক্ষেপণ করে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে এনে রাষ্ট্রের ঋণের দায়ভার কমানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
সারকথা
দেশের এই ধরনের ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট কেবল অর্থনৈতিক দলিল হবে না; এটি হতে পারে একটি সামাজিক চুক্তি—যা হতে পারে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে নতুন আস্থার ভিত্তি।
যদি কৃষক সহায়তা কৃষককে নিরাপত্তা দেয়, স্বাস্থ্য সহায়তা মানুষকে চিকিৎসা নিশ্চয়তা দেয়, বয়স্ক সহায়তা প্রবীণদের মর্যাদা দেয়, খাল খনন কৃষিকে পুনর্জীবিত করে, নতুন পে-স্কেল সরকারি কর্মচারীদের স্বস্তি দেয় এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক উন্নয়ন তরুণদের ভবিষ্যৎ গড়ে—তাহলে বাজেট সত্যিকার অর্থেই ‘জনগণের বাজেট’ হয়ে উঠতে পারে।
দেশ এখন এমন এক সময়ের মুখোমুখি, যেখানে উন্নয়নের সংজ্ঞা কেবল সেতু ও ভবন নয়; বরং মানুষের জীবনে স্বস্তি, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনা।




