- মৌসুমি অনিশ্চয়তা থেকে স্থায়ী আয়ে ঝোঁক
- কৃষির তুলনায় শিল্পে পারিশ্রমিক বেশি
- গত দেড় বছরের কৃষক কমেছে চার-পাঁচ লাখ
- বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তা শ্রমিকদের শিল্পে আকৃষ্ট করছে
- কৃষি শ্রমিকদের জন্য কোনো সুসংগঠিত কাঠামো নেই
- বাজার সিন্ডিকেটে চাপে কৃষক, নীতিমালা প্রয়োজন
দেশের শ্রমবাজারে এক নীরব কিন্তু গভীর রূপান্তর ঘটছে। একদিকে কৃষিখাতে শ্রমিক সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিকের চাপ বাড়ছে প্রতিদিনই। গ্রাম থেকে শহরে এই স্থানান্তরের মূল কারণ হয়ে উঠেছে স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা, মাসিক বেতন কাঠামো এবং অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ। তবে এই পরিবর্তনের আড়ালে তৈরি হচ্ছে আরেকটি বাস্তবতা-নিয়মিত আয় থাকলেও শ্রমিকদের জীবন কতটা স্বস্তিদায়ক হচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখন আরও বড় হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপন
কৃষিকাজে অনিশ্চয়তা, আয় টেকসই নয়
দেশের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান অঞ্চলে ধান রোপণ, কাটা কিংবা ফসল ঘরে তোলার সময় শ্রমিক সংকট এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে স্থানীয়ভাবে শ্রমিক পাওয়া যেত, এখন সেখানে বাইরে থেকে শ্রমিক আনতে হচ্ছে, তাও বেশি মজুরিতে। বর্তমানে কৃষি শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি অঞ্চলভেদে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা, কোথাও কোথাও ৯০০ টাকাও ছাড়াচ্ছে। কিন্তু এই আয় পুরো বছরজুড়ে থাকে না। মৌসুমের ওপর নির্ভর করায় বছরের বড় একটি সময় শ্রমিকদের আয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ফলে অনিশ্চয়তার এই পেশা থেকে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেকেই।
লোকসানের চাপে কৃষি ছাড়ছেন শ্রমিকরা
কৃষিতে এমন পরিবর্তনের পেছনে অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন গাজীপুরের মাওনা এলাকার একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক আলমগীর কবির। একসময় কৃষির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন তিনি কারখানায় কাজ করছেন। ঢাকা মেলকে আলমগীর কবির বলেন, ‘প্রতিবছর কোনো না কোনো দুর্যোগে ফসল নষ্ট হয়। কখনো বন্যা, কখনো খরা, আবার কখনো অকাল বৃষ্টি। তার ওপর সারের দাম বাড়ছে, শ্রমিক খরচ বাড়ছে—সব মিলিয়ে কৃষিতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে গেছে।’
বিজ্ঞাপন
তিনি আরো জানান, বর্তমানে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। অথচ বাজারে বিক্রির সময় সেই ধানের দাম পাওয়া যায় মাত্র ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা। ফলে প্রতি মৌসুমেই কৃষককে লোকসান গুনতে হয়। এই ক্ষতির চক্র থেকে বের হতে না পেরে অনেকেই কৃষি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
আলমগীর কবির আরো বলেন, ভারত থেকে কম দামে চাল আসায় আমাদের দেশের ধান-চালের বাজার ধসে যায়। আমরা ন্যায্য দাম পাই না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই কারখানায় কাজ নিতে শুরু করেছে।
তিনি আরো জানান, পোশাক কারখানায় একজন শ্রমিকের বেতন শুরু হয় ১১ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা দিয়ে। একটি পরিবারের দুই সদস্য কারখানায় কাজ করলে একজনের আয়ে শহরের সংসার চলে যায়, আরেকজনের আয়ে গ্রামের পরিবারও চালানো সম্ভব হয়। এমনকি কিছু সঞ্চয়ও থাকে, যা কৃষিতে প্রায় অসম্ভব।
কৃষির এই অনিশ্চয়তার বিপরীতে গার্মেন্টস খাতে রয়েছে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা। মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তা শ্রমিকদের আকৃষ্ট করছে। প্রবেশ পর্যায়ের শ্রমিকরা মাসে প্রায় ১১ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা আয় করেন, আর অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রে তা আরও বাড়ে। এর সঙ্গে ওভারটাইমের সুযোগ থাকায় অনেকেই অতিরিক্ত আয় করতে পারেন, যা কৃষিখাতে প্রায় নেই বললেই চলে।
তবে আইনে নির্ধারিত সুবিধা থাকলেও বাস্তবে সব শ্রমিক সেই সুবিধা পুরোপুরি পান না। শ্রম আইন অনুযায়ী মৌলিক বেতন, বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা সহায়তা, উৎসব বোনাস, ওভারটাইম ভাতা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে এর ঘাটতি রয়ে যায়। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলে বসবাস ব্যয় বাড়ায় শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। ফলে নিয়মিত বেতন থাকলেও জীবনযাত্রার মান প্রত্যাশিতভাবে উন্নত হচ্ছে না।
কৃষিজীবী শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি গোলাম রাব্বানী ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশে আড়াই কোটিরও বেশি শ্রমিক কৃষি খাতে কাজ করছে। তাদের উৎপাদনের ওপরই আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভরশীল। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা নেই।
এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের টিকিয়ে রাখতে ভর্তুকি বাড়ানো, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরাসরি ক্রয়ের তাগিদ
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি ফয়জুল হাকিম লালা ঢাকা মেইলকে বলেন, কৃষিখাতে বর্তমান ভর্তুকি যথেষ্ট নয়।
তিনি আরো বলেন, সরকারকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য ক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কৃষক ন্যায্য দাম পাবে।
দেশে ভূমি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন জানিয়ে ফয়জুল হাকিম বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে জমির প্রকৃত মালিক শহরে থাকেন এবং জমি ভাড়ায় দিয়ে দেন। ফলে সেই জমিতে উৎপাদন হলেও সঠিক বিনিয়োগ হয় না। একইসঙ্গে কৃষি শ্রমিকের সংকট দিন দিন বাড়ছে। অনেক এলাকায় শ্রমিক না পেয়ে ফসল মাঠেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এজন্য কৃষি মন্ত্রণালয় ও আবহাওয়া অধিদফতরের মধ্যে সমন্বয় আরো জোরদার করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক ক্ষতির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। ফসল নষ্ট হওয়ায় তারা এখন চরম অনিশ্চয়তায় আছেন।
বাজার সিন্ডিকেটে চাপে কৃষক, নীতিমালা প্রয়োজন
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, ‘কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু কৃষক সেই অনুযায়ী পণ্যের দাম পান না। সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কিনে গুদামজাত করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। এর সুযোগ নিচ্ছে বাজার সিন্ডিকেট। কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করছেন, আর লাভ যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে।’
তিনি আরও বলেন, উৎপাদন খরচ ও বিক্রয় মূল্যের এই অসামঞ্জস্য কৃষকদের নিরুৎসাহিত করছে। অনেকেই কৃষি পেশা ছেড়ে অন্য খাতে চলে যাচ্ছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তিনি সুনির্দিষ্ট কৃষি বাজারজাতকরণ নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দেন।
কৃষক কমছে, জমিও কমছে
এদিকে কৃষিজমি কমে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। আইজনীবী আতিকুর রহমান বলেন, শিল্পায়ন, আবাসন প্রকল্প এবং অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে প্রতিনিয়ত কৃষিজমি কমছে। যদিও কৃষকের সংখ্যা হঠাৎ করে কমে যাচ্ছে না, তবে ধীরে ধীরে এই সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, দেশে কৃষকের সংখ্যা ২ কোটি ৫৩ লাখ থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ৪৭-৪৮ লাখে নেমে এসেছে।
কাঠামোগত সুরক্ষা নেই কৃষি শ্রমিকদের
অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি এস এম নাজির হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, কৃষি শ্রমিকদের জন্য কোনো সুসংগঠিত কাঠামো নেই। তারা মজুরি বৈষম্যের শিকার হন, বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা কম পারিশ্রমিক পান।”
তিনি জানান, ছোট কৃষকেরা অনেক সময় শ্রমিক নিয়োগ করতে পারেন না, ফলে নিজেরাই সব কাজ করতে গিয়ে লোকসানে পড়েন এবং পুঁজি হারান। এতে পরবর্তী মৌসুমে তারা আর চাষাবাদে ফিরতে পারেন না।
নাজির হোসাইন বলেন, আগে গ্রামে প্রচুর কৃষি শ্রমিক পাওয়া যেত। এখন তারা শহরের বিভিন্ন কারখানা বা ছোটখাটো পেশায় চলে যাচ্ছে, কারণ সেখানে আয় তুলনামূলক এর ফলে কৃষি খাতে শ্রমিক সংকট তৈরি হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া বাড়বে সংকট
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি থেকে গার্মেন্টস খাতে শ্রমিক স্থানান্তর এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বিস্তৃত প্রবণতা। একদিকে এটি শিল্পখাতকে শক্তিশালী করছে, অন্যদিকে কৃষিখাতকে চাপে ফেলছে। শ্রমিকদের প্রকৃত স্বস্তি নিশ্চিত করতে হলে শুধু বেতনের অংক নয়, বরং বাস্তব জীবনের ব্যয়, ভাতা, নিরাপত্তা এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে কৃষিখাতকে টিকিয়ে রাখতে কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সামনে আরও বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে দেশ।
এমআর/এমআর




