রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকা বইপত্রের জন্য বিখ্যাত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে আরেকটি ভিন্নধর্মী বাজার গড়ে উঠেছে। এটি হলো তথাকথিত ‘ডাক্তারদের উপহার সামগ্রীর বাজার’। নামটি শুনলে যদিও অনেকের মনে হতে পারে, এখানে হয়তো চিকিৎসকদের ব্যবহৃত বা চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট পণ্যই বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ডাক্তাররা স্বাভাবিক জীবনে ব্যবহারের জন্য নানা রকম উপহার পায়, সেগুলো এখানে বিক্রি হয়। অনেকের প্রশ্ন এসব জিনিস এখানে আসে কোথা থেকে?
নীলক্ষেতে ‘ডাক্তারদের উপহার’ নামে বিক্রি হওয়া পণ্যগুলো বাস্তবে সরাসরি ডাক্তারদের কাছ থেকে আসে না; বরং একটি বাণিজ্যিক সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমেই এসব বাজারে পৌঁছায় বলে ধারণা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, বেশিরভাগ পণ্যই রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি বাজার ও আমদানিকারকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়, যার মধ্যে শুকনা খাবার, প্রসাধনী সামগ্রী, গৃহস্থালি পণ্য এবং ছোট গ্যাজেট উল্লেখযোগ্য। পরে সেগুলো আকর্ষণীয়ভাবে প্যাকেজিং করে ‘ডাক্তারদের উপহার’ হিসেবে বিক্রি করা হয়। তবে অনেক পণ্য ওষুধ কোম্পানির লোকদের কাছ থেকেও কিনে নেয় ব্যবসায়ীরা।
খুব সীমিত ক্ষেত্রে অব্যবহৃত বা অতিরিক্ত উপহার বাজারে এলেও সেটি সামগ্রিক সরবরাহের বড় অংশ নয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘ডাক্তারদের উপহার’ নামটি মূলত ক্রেতা আকৃষ্ট করার একটি বিপণন কৌশল, যার মাধ্যমে সাধারণ গিফট আইটেমকে নির্দিষ্ট একটি পেশাভিত্তিক উপহার হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
নীলক্ষেতের ফুটপাতজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই ‘ডাক্তারদের উপহার’ পণ্যের স্টলগুলোতে মূলত পাওয়া যায় নানা ধরনের দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী। গৃহস্থালির ছোটখাটো জিনিসপত্র থেকে শুরু করে রান্নাঘরের উপকরণ, প্লাস্টিকের পণ্য, স্টোরেজ সামগ্রী সবকিছুই এখানে সহজলভ্য।
একইসঙ্গে ক্রেতাদের নজর কাড়ে বিভিন্ন ধরনের শুকনো খাবার, যেমন বিদেশি বিস্কুট, চকলেট, স্ন্যাকস ইত্যাদি, যেগুলো অনেক সময় সাধারণ বাজারে স্বাভাবিক দামে কিনতে হয়। এছাড়া প্রসাধনী সামগ্রীও আছে। একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের স্কিন কেয়ার, মেকআপ পণ্য, পারফিউম ইত্যাদি। প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য রয়েছে ছোটখাটো ইলেকট্রনিক গ্যাজেট হেডফোন, চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক কিংবা অন্যান্য আনুষঙ্গিক ডিভাইস।
বিজ্ঞাপন
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ‘ডাক্তারদের উপহার’ নামটি থাকলেও প্রকৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম বা মেডিকেল ইকুইপমেন্ট এখানে খুব একটা দেখা যায় না। অনেকেই ধারণা করেন, এই পণ্যগুলো হয়তো বিভিন্ন করপোরেট বা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের দেওয়া উপহার, যা পরে বিক্রির জন্য বাজারে আসে। যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, তবুও এই ধারণাটিই বাজারটির একটি আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে।
দামের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি শক্ত ধারণা রয়েছে যে নীলক্ষেতে গেলে কম দামে ভালো জিনিস পাওয়া যাবে। বাস্তবে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে দাম তুলনামূলক কম হতে পারে, তবে তা খুব বেশি নয়। তবে সব পণ্যের ক্ষেত্রে এই সুবিধা প্রযোজ্য নয়। অনেক সময় বাজারদরের সঙ্গে খুব বেশি পার্থক্য দেখা যায় না, আবার কিছু ক্ষেত্রে দাম প্রায় সমানই থাকে। ফলে ‘অল্প দামে পাওয়া যায়’ এই ধারণাটি পুরোপুরি সত্য নয়, বরং আংশিক বাস্তবতা।
এই বাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পণ্যের উৎস ও মানের বৈচিত্র্য। অনেক পণ্যই বিভিন্ন উৎস থেকে আসে। কিছু স্থানীয়ভাবে তৈরি, কিছু আমদানিকৃত, আবার কিছু হতে পারে ওভারস্টক, ডিসপ্লে আইটেম বা গিফট আইটেম। ফলে একই ধরনের পণ্যের মান একেক দোকানে একেক রকম হতে পারে। এজন্য ক্রেতাদের সচেতনভাবে পণ্য যাচাই করে কেনাকাটা করা জরুরি।
তবুও প্রশ্ন আসে যদি দাম খুব একটা কম না হয় এবং পণ্যের মানে ভিন্নতা থাকে, তাহলে মানুষ কেন এখনো ভিড় করে নীলক্ষেতে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে এই বাজারের বৈচিত্র্য ও সহজলভ্যতায়। এক জায়গায় এত ধরনের পণ্য পাওয়া, কিছু ইউনিক বা ভিন্নধর্মী আইটেমের উপস্থিতি, দরদামের সুযোগ এবং পরিচিত পরিবেশ- সব মিলিয়ে এটি এখনো ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটার স্থান।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, নীলক্ষেতের ‘ডাক্তারদের উপহার’ বাজার একটি মিশ্র অভিজ্ঞতার জায়গা। এখানে যেমন পণ্যের বৈচিত্র্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে দামের ভিন্নতা এবং মানের অনিশ্চয়তা। তাই অন্ধভাবে কম দামের আশায় না এসে সচেতনভাবে পণ্য নির্বাচন করলে এই বাজার থেকে ভালো কেনাকাটার অভিজ্ঞতা পাওয়া সম্ভব।
এ বিষয়ে কথা বললে একাধিক ক্রেতা ও বিক্রেতা ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানান। নীলক্ষেতে কেনাকাটা করতে আসা এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা ভাবি এগুলো সরাসরি ডাক্তারদের ব্যবহৃত বা পাওয়া জিনিস। গিফট হিসেবে দিতে খারাপ না। ‘ডাক্তারদের উপহার’ বলার কারণে মনে হয় বিশেষ কিছু, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। দাম একটু বেশি মনে হয়েছে, কারণ এখানের গ্যাজেটগুলো অনলাইনে কমেও পাওয়া যায়।’
অন্যদিকে বিক্রেতাদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা মূলত পাইকারি বাজার থেকে জিনিস এনে বিভিন্ন ওষুধের ল্যাবেল (স্টিকার) গায়ে লাগিয়ে সাজাই। অনেক পণ্য আমরা ওষুধ কোম্পানির লোকদের কাছ থেকে কিনে থাকি। তারা একটি কমিশনে আমাদের কাছে বিক্রি করে থাকে। মানুষ ‘ডাক্তারদের উপহার’ জেনে কিনতে আসে, তাই এই নামেই বিক্রি করি। এখানে সব ধরনের পণ্য পাওয়া যায়- খাবার, কসমেটিকস, গ্যাজেট।’
ইবনে সিনা হাসপাতালের চিকিৎসক মো. আনিস বলেন, ‘ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের রিপ্রেজেন্টেটিভদের মাধ্যমে চিকিৎসকদের কিছু উপহার দিয়ে থাকে। এসব উপহারের একটি অংশ চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছায়, আর কিছু হয়তো রিপ্রেজেন্টেটিভদের মাধ্যমেই বিক্রি হয়ে যায়, এমনটাই শোনা যায়।’
এই চিকিসক বলেন, ‘চিকিৎসকদের মধ্যে কেউ সরাসরি এ ধরনের বিক্রির সঙ্গে জড়িত এমন তথ্য আমার জানা নেই, এমনকি আমি এ বিষয়ে কখনও শুনিনি। সাধারণত কোনো চিকিৎসক উপহার পেলে তা নিজে ব্যবহার করেন অথবা আত্মীয়স্বজনদের দিয়ে দেন, কিন্তু বিক্রি করেন না। আমিও মাঝে মাঝে ব্যক্তিগতভাবে কিছু উপহার পেলে সেগুলো ব্যবহার করি বা আত্মীয়দের দিয়ে থাকি।’
ডা. আনিসের মতে, এসব উপহারপণ্য বিক্রির কিছু নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে, যার মধ্যে নীলক্ষেত ও মোহাম্মদপুর একটি উল্লেখযোগ্য এলাকা।
এম/ক.ম



