-
- পাইকারি বাজারে সরবরাহ কম, চাহিদা বেশি
- আড়তে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে খুচরা ব্যবসায়ীদের
- দুই মাসের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বাজারে
- প্রতি মণ ইলিশের দাম ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে
- বাজার তদারকিতে নীরবতায় ব্যবসায়ীদের কারসাজি
পহেলা বৈশাখ ঘিরে রাজধানীর বাজারে ইলিশের দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। সরবরাহ কম ও মৌসুমি চাহিদা বাড়ায় মাঝারি আকারের ইলিশও এখন অনেক ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে। পাইকারি বাজারে বড় ইলিশের মণপ্রতি দাম ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
সোমবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, কারওয়ান বাজার ও হাতিরপুল কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২,৫০০ টাকায়। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ২,৮০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ কিনতে গুনতে হচ্ছে ৩,০০০ থেকে ৩,২০০ টাকা। অনেক ক্রেতাই বাজারে এসে দাম জেনে না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: পহেলা বৈশাখেও চড়া সবজির বাজার
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা গৃহিণী সাবিনা আক্তার বলেন, আধা কেজির একটু বেশি ওজনের একটি ইলিশ কিনতেই তাকে প্রায় ১,৩৮০ টাকা দিতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, বৈশাখ এলেই ইলিশের দাম বাড়ে—এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবারের দাম অনেক বেশি। সংসারের অন্যান্য খরচ সামলে ইলিশ কেনা এখন সত্যিই কঠিন হয়ে গেছে।
বাজারে বিক্রেতারাও একই ধরনের বাস্তবতার কথা বলছেন। সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের মাছ বিক্রেতা রাব্বি মিয়া জানান, ইলিশের আমদানি কম থাকায় দাম বেড়েছে। জেলেদের জালে যদি বেশি মাছ ধরা পড়ত, তাহলে দাম কিছুটা স্বাভাবিক থাকতে পারত। তবে সরবরাহ কম থাকায় চাহিদার চাপ সরাসরি বাজারদরে প্রতিফলিত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর বাজারে ইলিশের দাম বাড়ার পেছনে শুধু মৌসুমি চাহিদা নয়, রয়েছে সরবরাহ সংকটের বিষয়টিও। চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা নদীপাড়ের আড়তগুলোতেও দেখা গেছে একই চিত্র। সেখান থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মাছ সরবরাহ করা হয়। সেখানে এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৭,৫০০ থেকে ৭,৬০০ টাকা কেজি দরে। ফলে বড় আকারের ইলিশের মণপ্রতি দাম দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ থেকে ৩ লাখ ৪ হাজার টাকার মধ্যে। আড়তদাররা বলছেন, ঢাকাসহ আশপাশের বড় বাজারের পাইকাররা বেশি দামে ইলিশ কিনে নিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারেও সরবরাহ কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেঘনা নদীতে দুই মাসের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা, যা বাজারে ইলিশের স্বাভাবিক প্রবাহে প্রভাব ফেলেছে।
খুচরা ব্যবসায়ীদের মতে, বৈশাখ এলেই ইলিশের চাহিদা বাড়ে। তবে এবার চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম। ফলে দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। যদিও কিছু জেলে সাগর থেকে মাছ এনে বাজারে দিচ্ছেন, তবুও তা চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।
আরও পড়ুন: উৎসবের ঢেউ রমনায়, আনন্দ-উচ্ছ্বাসে বর্ষবরণ
শুধু ইলিশ নয়, অন্যান্য মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। পাঙ্গাশ মাছ একদিনেই ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ২২০ টাকায় পৌঁছেছে। রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং বড় আকারের রুই ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকায়। তেলাপিয়া, পাবদা, শোল ও টেংরাসহ প্রায় সব ধরনের মাছেই কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে ইলিশের বিকল্প হিসেবে অন্য মাছ কিনতে চাইলেও ক্রেতারা খুব একটা স্বস্তি পাচ্ছেন না।
মুরগির বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এক মাসের ব্যবধানে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ৮০ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগির দামও একদিনে ২০ টাকা বেড়ে ১৯০ টাকায় পৌঁছেছে। লালবাগের মুরগি ব্যবসায়ী কাউসার মিয়া বলেন, তারা নিজেরাও বেশি দামে কিনে আনছেন। উৎপাদন কমে যাওয়া এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
সবজির বাজারেও বৈশাখের আগে স্বস্তি নেই। গোল বেগুন, বরবটি, ঝিঙা, করলা, শসা, শিম ও পটলসহ প্রায় সব সবজির দামই কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, ঢেঁড়স ৮০ টাকা, টমেটো ৫০ টাকা এবং লাউ ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। নিউমার্কেটে বাজার করতে আসা সরকারি চাকরিজীবী জহির মিয়া বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় প্রতিদিনই বাজারে দাম বাড়ছে। এতে মাসের বাজেট সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
সবজি বিক্রেতা তারেক জানান, পাইকারি বাজারে দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং মৌসুম শেষ হওয়ার কারণে সরবরাহ কমে গেছে। তবে নতুন মৌসুমের সবজি উঠতে শুরু করলে দাম কিছুটা কমতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে ভোজ্যতেলের বাজারেও সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় খোলা তেলের ওপর চাপ বেড়েছে। বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল ২০০ থেকে ২১০ টাকা এবং পাম তেল ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা চিনির দামও বেড়ে ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় পৌঁছেছে। খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, ডিলারদের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে এই চাপ তৈরি হয়েছে এবং নতুন অর্ডারও সময়মতো আসছে না।
আরও পড়ুন: বর্ষবরণে উৎসবের রঙ, গান-নৃত্যে মুখর ঢাবির বটতলা
যাত্রাবাড়ী মৎস্য আড়তের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশাখকে ঘিরে প্রতি বছরই ইলিশের দাম বাড়ে। তবে এবারের বৃদ্ধি তুলনামূলক বেশি। তাদের ধারণা, নববর্ষের পর চাহিদা কিছুটা কমলে বাজারও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।
সব মিলিয়ে রাজধানীর বাজারের বর্তমান চিত্র বলছে, এবার বৈশাখের ইলিশ শুধু উৎসবের স্বাদ নয়, বরং অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি হিসাব-নিকাশের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ঐতিহ্য ধরে রাখার ইচ্ছা আছে, কিন্তু সেই ইচ্ছার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেটের ওপর চাপও কম নয়। বৈশাখের আনন্দ তাই অনেকের কাছে এবার একটু সংযত, একটু হিসাবি।
এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, নিত্যপণ্যের বাজার তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিতদের নীরবতার কারণে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কারসাজিতে লিপ্ত রয়েছে। নানা ছলচাতুরির মাধ্যমে তারা সরকারকে বিভ্রান্ত করে এবং বিভিন্ন অজুহাতে মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা করছে। এভাবে অর্জিত বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এমআর/এআর




