- গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ আমদানিনির্ভর
- সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে লোডশেডিং বাড়ার শঙ্কা
- ২০ দিনের জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে
- শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে
- সংঘাত দীর্ঘ হলে প্রবাসী আয়েও ভাটা পড়বে
- জ্বালানির দাম বাড়লে বাড়বে মূল্যস্ফীতি
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি ও সামগ্রিক অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে গ্যাস, বিদ্যুৎ, রফতানি, রেমিট্যান্স—সব খাতেই চাপ বাড়বে।
বিজ্ঞাপন
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, করোনা পরিস্থিতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে পারেনি বিশ্ব। এরই মধ্যে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলা এবং ইরানের পাল্টা পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই প্রভাব ছুঁয়ে যাবে বাংলাদেশকেও।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমাদের আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত নিয়ে সামনে আরও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন সংরক্ষণ না বাড়ালে ঝুঁকি বাড়তেই থাকবে।
এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা
দেশে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এর সঙ্গে আমদানি করা এলএনজি থেকে যুক্ত হচ্ছে আরও ৮০০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ মোট সরবরাহের একটি বড় অংশ এখন আমদানিনির্ভর।
বিজ্ঞাপন
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আনা প্রায় পুরো এলএনজি হরমুজ প্রণালি হয়ে দেশে আসে। ২০১৮ সালে জিটুজি ভিত্তিতে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। পরে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ওমান থেকেও আমদানি শুরু হয়। বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ টনই আসে কাতার থেকে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, চলতি মাসে অন্তত নয়টি এলএনজি কার্গো মহেশখালীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে মাসের মাঝামাঝি এক-দুটি কার্গো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। যদিও যেসব কার্গো ১৫ তারিখের মধ্যে আসার কথা, সেগুলোর বেশির ভাগই ইতোমধ্যে প্রণালি অতিক্রম করেছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, চলতি মাসে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার পরিকল্পনা নেই। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বিকল্প উৎস বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে বাড়তি চাপ
দেশে দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প খাতে গ্যাস সংকট তীব্র। টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, সিরামিক, স্টিলসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্প পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। উদ্যোক্তারা জানান, বর্তমান সরবরাহ ঘাটতির মধ্যেই এলএনজি আমদানি ব্যাহত হলে শিল্প উৎপাদন বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়বে।
বিদ্যুৎ খাতও ঝুঁকির বাইরে নয়। বর্তমানে গ্যাস থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। গ্রীষ্ম মৌসুম সামনে রেখে চাহিদা বাড়ছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে লোডশেডিং বাড়তে পারে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও পড়ুন
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দুই সপ্তাহের বেশি দীর্ঘ হলে গ্যাস, এলপিজি, কয়লা ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের সরবরাহে বড় চাপ তৈরি হবে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন চাপ সৃষ্টি হবে।
জ্বালানি তেলে আপাত স্বস্তি, তবে আছে শঙ্কাও
পরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক সংকট দেখছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ দিনের জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে। সমুদ্রপথে ও খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে আরও ২০ থেকে ২৫ দিনের সরবরাহ।
সরকার জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৮ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। এর বড় অংশ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হবে। ফলে এ ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা তুলনামূলক কম।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। এতে ভর্তুকির চাপ বাড়বে এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে মূল্যস্ফীতি ছড়িয়ে পড়বে।
রফতানি ও পরিবহন ব্যয়ে চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা শুধু জ্বালানি নয়, রফতানি বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। শীর্ষ রফতানি বাজারের তালিকায় রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। এসব দেশে গত অর্থবছরে কয়েকশ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপগামী বহু জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে। বিকল্প পথে গেলে সময় ও খরচ দুই-ই বাড়বে। শিপিং খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম বাড়লে রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।
রেমিট্যান্সে বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের মোট প্রবাসী আয়ের অর্ধেকের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। কুয়েত, কাতার, ওমান ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
জনশক্তি রফতানিকারকদের মতে, নির্মাণ ও সেবা খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ ধরনের পরিস্থিতিতে। ওভারটাইম কমে গেলে বা কাজ বন্ধ হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হারে চাপ সৃষ্টি হবে।
নীতি সমন্বয়ের তাগিদ
অর্থনীতিবিদদের মতে, সংঘাত স্বল্পমেয়াদি হলে প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘ হলে সরকারকে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিকল্প জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা, কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা এবং রফতানিকারকদের সহায়তা দেওয়া জরুরি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলে বড় সংকট নাও হতে পারে। তবে দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যয়ে বড় চাপ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন কোনো বৈশ্বিক ধাক্কা সামাল দেওয়া সহজ হবে না। তাই জ্বালানি নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া, জরুরি পণ্যের মজুত বাড়ানো এবং প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের জ্বালানি ও অর্থনীতির আগামী পথচলা।
এদিকে সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, আমরা বিষয়টি আরও কয়েক দিন পর্যবেক্ষণ করব। অতীতেও এ ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহে সরকার সতর্ক রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারে বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি এবং বহুমুখী হতে পারে।
এই অর্থনীতি বিশ্লেষক বলেন, ইরান যদি প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে যাবে। এ ছাড়া শিপিং কস্ট (পণ্য পরিবহন খরচ) এবং ইন্স্যুরেন্স কস্ট বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, বিশ্বের কয়েকটি শীর্ষ তেল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বালানি তেলের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর বাংলাদেশের উচ্চ নির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সরাসরি আমদানি ব্যয় ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে।
এমআর/জেবি

