প্রদীপ আর মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে ১৯৯ বছরের পুরানো বরিশাল মহাশ্মশান। ফুলে ফুলে সাজানো হয়েছে প্রয়াত স্বজনদের সমাধি। কোথাও ধূপের সুবাস, কোথাও নামকীর্তন, আবার কোথাও প্রিয়জনের স্মৃতি স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন স্বজনরা। এভাবেই পূর্বপুরুষ ও প্রয়াত আত্মীয়-স্বজনদের স্মরণে বরিশালে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী শ্মশান দীপাবলি উৎসব।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে নগরীর কাউনিয়া এলাকার বরিশাল মহাশ্মশানে শুরু হয় এ উৎসব। চলে গভীর রাত পর্যন্ত। প্রতিবছর কালীপূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশী তিথিতে এ আয়োজন করা হয়। ১৯২৭ সাল থেকে এখানে দীপাবলি উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে।
প্রায় ছয় একর জমির ওপর বিস্তৃত প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো এ মহাশ্মশানে রয়েছে ৭০ হাজারের বেশি মঠ। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মহাশ্মশান হিসেবে পরিচিত। প্রয়াত স্বজনদের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে ভারত, নেপালসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো মানুষ সমবেত হন। কেউ সমাধিতে প্রদীপ ও মোমবাতি জ্বালান, কেউ ফুল দিয়ে সাজান। আবার প্রয়াত স্বজনদের পছন্দের ইলিশ মাছ, পায়েসসহ নানা খাবারও নিবেদন করেন অনেকে।
এ মহাশ্মশানে সমাহিত রয়েছেন কবি জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশ। এছাড়া ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, কালিচন্দ্র ঘোষ ও মনোরমা বসু মাসিমাসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির সমাধি রয়েছে এখানে। রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক অশ্বিনী কুমার দত্তের চিতাভস্মও সংরক্ষিত রয়েছে এ মহাশ্মশানে।
উৎসবে আসা জয়দেব সাহা বলেন, প্রয়াত স্বজনদের আত্মার শান্তি কামনা ও তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই প্রতিবছর এখানে আসেন তাঁরা। প্রিয়জন জীবিত অবস্থায় যেসব খাবার পছন্দ করতেন, সেগুলোও সমাধিতে নিবেদন করেন।
উজ্জ্বল দাস বলেন, দীপাবলির আগে স্বজনদের সমাধি পরিষ্কার করে রং করিয়েছেন। উৎসবের দিন মোমবাতি ও প্রদীপ দিয়ে সাজিয়েছেন। অনেক সমাধিতে স্বজনরা আসেন না। সেসব সমাধিতেও মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানান তিনি।
শ্মশান পরিচালনা কমিটির তথ্যমতে, প্রতিবছর দীপাবলি উপলক্ষে দেশ-বিদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে এখানে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে উৎসবটি পরিণত হয় মিলনমেলায়।
বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয় ভক্ত বলেন, শনিবার বিকেল থেকেই দর্শনার্থীদের সমাগম শুরু হয়। তাঁদের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত রয়েছেন। পুরো মহাশ্মশান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শনিবার শ্মশান দীপাবলি ও রবিবার কালীপূজা উপলক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সুশান্ত সরকার জানান, উৎসবের নিরাপত্তায় প্রায় ৩০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি এসআরবি-৮, সাদা পোশাকের পুলিশ, ডিবি ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নজরদারি করছেন। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় মহাশ্মশানের ভেতরে ও আশপাশে ফুট প্যাট্রোলও পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রতিনিধি/এএম




