বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

দেশের যে বনে ঝুঁকি নিয়ে চলে ট্রেন

পুলক পুরকায়স্থ, মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম

শেয়ার করুন:

দেশের যে বনে ঝুঁকি নিয়ে চলে ট্রেন
লাউয়াছড়ায় বনের ভিতরে জীর্ণ রেললাইনে ট্রেন চলাচল

আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ও জীর্ণ রেললাইন। লাইনটিতে কখনো ইঞ্জিন বিকল, কখনো বগি বিচ্ছিন্ন, আবার কখনো লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। এ কারণে প্রায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্জন ওই পথের মধ্যে আটকে থাকতে হয় যাত্রীদের। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই ওই পথে অন্তত ২০ বার বিকল হয়েছে ট্রেনের ইঞ্জিল। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি হয় শিডিউল বিপর্যয়ও।

এই খবর দেশের বাইরের কোনো ঘটনার নয়, এটি দেশের মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া আখাউড়া-সিলেট রেলপথের। এই রেলপথের মাত্র পাঁচ কিলোমিটার অংশ এখন ট্রেন ট্রেনযাত্রীদের কাছে আতঙ্কের নাম। 

সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর রাতে লাউয়াছড়ার ভেতরে আন্তনগর কালনী এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। পরদিন ২ অক্টোবর দুপুরে চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের হুক ছিঁড়ে ৯টি বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে প্রায় তিন ঘণ্টা বন্ধ থাকে ট্রেন চলাচল। এমন ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

Rail2

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৮৯৮ সালে তৎকালীন আসাম-চট্টগ্রাম যোগাযোগের জন্য নির্মিত হয় এই রেলপথ। শতবর্ষের বেশি পুরনো এ পথে বর্তমানে ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্রীমঙ্গল ও ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী লাউয়াছড়া বনের ভেতরের অংশে রেললাইনের স্লিপারে থাকা বেশির ভাগ নাট-বল্টু ও ক্লিপ নেই। কোথাও ঢিলে হয়ে যাওয়া ক্লিপে নামমাত্র ঝালাই দেওয়া হয়েছে। আবার কোনো কোনো স্থানে নাট তার দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে। রেললাইনের এমন অবস্থায় ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চলাচল করছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, রেললাইন যথাযথভাবে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ না করা হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, লাউয়াছড়া বনের ভাঙা ব্রিজ এলাকায় রেললাইনের ঢাল অনেক বেশি। পাহাড়ি উঁচু পথে ট্রেন টেনে তুলতে শক্তিশালী ইঞ্জিন প্রয়োজন। কিন্তু সিলেট রুটে ব্যবহার করা হচ্ছে ১৮-১৯ বছরের পুরনো ২৯০০ ও ২৬১০ সিরিজের ইঞ্জিন।

Rail31

শ্রীমঙ্গল ও ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে যে ইঞ্জিন নিয়ে ট্রেন সিলেটে যায়, পর্যাপ্ত বিকল্প না থাকায় সেই একই ইঞ্জিন দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ফিরতি ট্রেন চালাতে হয়। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ওঠার সময় পুরনো ইঞ্জিনের চাপ কমে গিয়ে ট্রেন মাঝপথে থেমে যায়। কোনো কোনো ট্রেনে বগির সংখ্যা বাড়ানো হলেও ইঞ্জিনের সক্ষমতা না বাড়ায় যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা কমছে না।

রেলওয়ে সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি লাউয়াছড়ায় পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে থাকে। ১ মার্চ রাতে উপবন এক্সপ্রেস পাঁচ ঘণ্টা আটকে ছিল। ৭ ও ১৯ মার্চ কালনী এক্সপ্রেস যথাক্রমে দেড় ও দুই ঘণ্টা বিলম্বিত হয়। ১ এপ্রিল কালনী এক্সপ্রেস পাঁচ ঘণ্টা আটকে থাকে। ২৯ মে তেলবাহী ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়। সর্বশেষ ১ ও ২ অক্টোবর কালনী ও পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের ঘটনায় আবারও ব্যাহত হয় ট্রেন চলাচল।

শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল ইসলাম বলেন, প্রায়ই লাউয়াছড়া বনের ভেতর মাগুরছড়া এলাকায় ট্রেন আটকে পড়ার খবর পান তারা। বন বিভাগের কর্মীরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করে থাকেন।

Rail3

ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার গৌড় প্রসাদ দাস পলাশ বলেন, লাউয়াছড়ার পাহাড়ি ঢাল বেয়ে উঠতে গিয়ে প্রায়ই আন্তনগর ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়। গত আট মাসে অন্তত ২০ বার এমন ঘটনা ঘটেছে।

শ্রীমঙ্গল রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সাইফুল্লাহ বলেন, লাউয়াছড়ার পথটি পাহাড়ি হওয়ায় গতি কমিয়ে সতর্কতার সঙ্গে ট্রেন চালাতে হয়। প্রকৌশল দল নিয়মিত রেললাইন পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করছে।

প্রতিনিধি/এসআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর