সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

শ্রমিকদের বিক্ষোভে দিনভর উত্তাল গাজীপুর, যানজটে ভোগান্তি

জেলা প্রতিনিধি, গাজীপুর
প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম

শেয়ার করুন:

শ্রমিকদের বিক্ষোভে দিনভর উত্তাল গাজীপুর, যানজটে ভোগান্তি

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে আজ সোমবার (২ নভেম্বর) টানা কয়েকদিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন পোশাক শ্রমিকেরা। নতুন মজুরি বোর্ড গঠন হওয়া সত্ত্বেও সকাল থেকেই কোনাবাড়ী, সফিপুর, মৌচাক ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অবস্থান নেন। 

শ্রমিকদের এই অবরোধের কারণে মহাসড়কটিতে দীর্ঘ প্রায় ৭ ঘণ্টা যান চলাচল বিঘ্নিত হয়। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট ও কারখানার প্রবেশদ্বারগুলোতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে থানা ও শিল্প পুলিশ।

পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকাল সাড়ে আটটার দিকে নূন্যতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে মৌচাক এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকরা। তাদের বিক্ষোভের খবরে কোনাবাড়ি, মৌচাক, সফিপুরসহ আশেপাশের দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। 

শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের কারণে বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল। একপর্যায়ে বিজিবি, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাসহ অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর শ্রমিকরা চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন। পরে বিকেলে তাদের সরিয়ে দেওয়ার পর যান চলাচল শুরু হয়।

এদিকে, আন্দোলন চলাকালে নাওজোড় এলাকায় একটি পুলিশ ভ্যানে আগুন ও বেশ কিছু যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এসময় শ্রমিকদের হামলায় আহত হন সময় টিভির সাংবাদিক মেহেদী হাসানসহ বেশ কয়েকজন।

gazipur2

আন্দোলনরত শ্রমিকরা বলেন, নিত্যপণ্যের সবকিছুর দাম বেশি। একটি গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে হয় দুই হাজার ৫০০ টাকায়, বাসা ভাড়া দিতে হয় ৫ হাজার। মজুরি বোর্ড গঠন করলেই হবে না, আমাদের বেতন কত করা হয়েছে তার ঘোষণা দিতে হবে। সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেছি। কারখানা ভাঙচুর ও আগুন দিয়েছে বহিরাগতরা। তারা আমাদের মধ্যে ঢুকে পরিস্থিতি খারাপ করেছে।

কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশসহ ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। তারা বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের ব্লকেড সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

শ্রমিক বিক্ষোভে অরাজকতা ঠেকাতে সড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এসময় স্থানীয় সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান এ আন্দোলনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন।

তিনি বলেন, এটা শ্রমিক বিক্ষোভ বলে আমরা মনে করছি না, এটা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। আপনারা জানেন, শ্রমিকদের বেতন বাড়ে এজন্য মজুরি কমিশন রয়েছে। এখন মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে যেখানে মালিক, শ্রমিকদের প্রতিনিধি রয়েছে। সরকার শ্রমিকদের বেতন বাড়ায় না, মধ্যস্থতা করে। এখন যারা আন্দোলন করছে তাদের আমরা চিহ্নিত করেছি, গত ২০২৪ সালের আগস্টের যারা পরাজিত শক্তি, তাদের সম্পৃক্ততা আমরা পেয়েছি।

গাজীপুর পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনে গত কয়েক দিনে কোনো পুলিশ বা শ্রমিক আহত হননি। কিন্তু দুপুরে নাওজোড় এলাকায় ফ্লাইওভারের ওপর পুলিশের একটি ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। এসময় কয়েকজন পুলিশকে হামলা করে আহত করা হয়েছে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দুপুরের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকে এবং যানবাহন চলাচল শুরু হয়।

gazipur3

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে গতকাল গাজীপুরে শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। আজও বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ হয়। এ অবস্থায় দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

এর আগে, গতকাল সকাল ৯টার দিকে ৩০ হাজার টাকা মাসিক বেতনের দাবিতে কোনাবাড়িতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। একপর্যায়ে তাদের একটি অংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়ে। জবাবে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এমন পরিস্থিতিতে চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, সফিপুর এলাকায় একই সময়ে আন্দোলন শুরু করেন শ্রমিকরা। তারা ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ সৃষ্টি করে বিক্ষোভ করে।

এসময় কোনাবাড়ি এলাকায় দুটি পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় প্রাইভেটকারসহ বেশ কিছু যানবাহন। এ ছাড়া কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিকাল নিটেক্স লিমিটেডের নামে একটি কারখানার গোডাউনে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ থেকে কোনাবাড়ি এলাকা পর্যন্ত শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এসময় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ২০ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে বিকেল ৩ টার দিকে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়া হলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর