রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

অস্তিত্বহীন 'আপার মডেল কলেজের’ সবাই ফেল, খুঁজে পাওয়া গেল না ক্যাম্পাস!

মাহবুবুর রহমান, নোয়াখালী
প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৩৬ এএম

শেয়ার করুন:

অস্তিত্বহীন 'আপার মডেল কলেজের’ সবাই ফেল, খুঁজে পাওয়া গেল না ক্যাম্পাস!
এবার এইচএসসি ফলাফলে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি নোয়াখালী জেলার একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান 'আপার মডেল কলেজ'। ছবি- এআই

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে মোট ১৩টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। এর মধ্যে নোয়াখালী জেলার একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম 'আপার মডেল কলেজ'। শনিবার (৩১ অক্টোবর) ফলাফল প্রকাশের পর কলেজটির নাম সামনে আসে। তবে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ভিন্ন চিত্র। অনলাইনে ফেসবুকে আপলোড করা যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, সেখানে নেই কোন প্রতিষ্ঠান।!

​কলেজের প্রথম ঠিকানা দেওয়া ছিল- বেগমগঞ্জের কন্ট্রাক্টরের মসজিদ এলাকায়।  তবে, সেখানে গিয়ে দেখা যায় অন্য প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড।

পরবর্তিতে গন্তব্য ছিল চৌমুহনী পূর্ব বাজারের কেএইচ টাওয়ারের মণ্ডল পাড়ায়; সেখানে গিয়েও কলেজের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

চৌমুহনী কলেজ গেটের পাশে লিফলেটে দেওয়া নম্বরগুলোতে ফোন করেও গেলে সেখানেও নেই প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি ‘আপার মডেল কলেজের’!

এ বিষয়ে অনলাইনে দেওয়া একাধিক নাম্বারে কথা বললে কেউ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেই বলেও জানান।

স্বপন নামে একজনের নম্বর পেয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি ৫ বছর আগে কলেজের দায়িত্বে ছিলাম, এখন নাই।’

​পরে সংগৃহীত অন্য একটি নম্বরে ফোন দেওয়া হলে রফিকুল আলম রুবেল নামের একজন জানান, তিনি কলেজের দায়িত্বে আছেন, তবে তা ‘কাগজে-কলমে নয়’।

রুবেলের দাবি, তাকে কলেজের প্রিন্সিপাল হওয়ার জন্য গভর্নিং বডি প্রস্তাব দিয়েছে এবং জেলা প্রশাসকের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। কিন্তু তিনি রাজি হননি।

‘আপার মডেল কলেজের’ নামে এ বছর ৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের সবাই ফেল করেছেন বোর্ড ফলাফলের তথ্যানুযায়ী।

​কলেজের ক্যাম্পাস কোথায় জানতে চাইলে রুবেল জানান, তাদের ‘কোনো ক্যাম্পাস নেই’।

‘চৌমুহনী কলেজের পাশে একটি রুমে কলেজের অফিস ছিল, এখন সেটিও নেই। তবে চৌমুহনী গণিপুর গার্লস একাডেমির সামনে একটি ভবন ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ভবনের নিচে ফুচকার দোকান থাকায় সমস্যা হচ্ছে, তাই অন্য কোথাও রুম দেখতে হবে।’

কলেজের অধ্যক্ষ কে জানতে চাইলে তিনি জানান, বর্তমানে কোনো অধ্যক্ষ নেই, নেই কোনো স্থায়ী শিক্ষকও। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী ক্লাস করান, তবে তাদের নামও তিনি জানেন না।

​কলেজ সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন নাকি অনেক শিক্ষার্থী এ+ পেয়েছিলেন এবং তাদের অনেকে এখন ডাক্তার।

​রফিকুল আলম রুবেল আরও জানান, কলেজটি এখন ৩ জন মিলে নিয়ন্ত্রণ করেন। এর মধ্যে একজন নূরনবী (যিনি চৌমুহনী কলেজ রোডে কসমেটিকসের ব্যবসা করেন), অন্যজন আফাজ উদ্দিন এবং তিনি (রুবেল) নিজে কাগজপত্র দেখাশোনা করেন।

বর্তমানে কলেজে ৭০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে তাদের ক্লাসের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা ক্লাস করে না। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষা হয় চৌমুহনীর একটি মাদ্রাসায়, তবে তার নাম তিনি জানেন না।

​অভিযুক্ত ৩ জনের একজন নূরনবীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি কলেজের কোনো দায়িত্বে নেই এবং বর্তমানে কে দায়িত্বে আছেন তাও তিনি জানেন না।

অন্যদিকে, আফাজ উদ্দিনের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

​উল্লেখ্য, এ বছর নোয়াখালীতে এইচএসসি পরীক্ষায় চরম ফল বিপর্যয় হয়েছে।  ১৬ হাজার ২৩৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬ হাজার ৩১৭ জন। অর্থাৎ, পাসের হার ৩৮.৯০ শতাংশ। জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ১১২ জন।

‘আপার মডেল কলেজের’ বিষয়ে জানতে চাইলে বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাওছার রহমান বলেন, ‘এমন প্রতিষ্ঠান কীভাবে অনুমোদন পেল তা খতিয়ে দেখা হবে। বিষয়টি নিয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

নোয়াখালী জেলার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কাশেম বলেন, ‘আমি তো আপনার কাছে গল্পের মতো শুনছি! শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এত বড় একটি অনিয়ম সামলে কীভাবে একটি কলেজ চলে, ভেবে অবাক হচ্ছি। আমরা সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

প্রতিনিধি/এএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর