জীবনের পথ কখনো মসৃণ হয় না। কারও জীবনে আসে সাফল্যের আলো, আবার কারও জীবনে প্রতিটি দিনই যেন নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। বয়সের ভারে শরীর যখন ক্লান্ত, তখনও থেমে থাকার সুযোগ নেই। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিন ছুটে চলতে হয় জীবিকার সন্ধানে। এমনই এক জীবনসংগ্রামের নাম মো. নূরুল হক। ৭০ বছর বয়সী এই প্রবীণ দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে রেলপথে চলাচলকারী ট্রেনের এক বগি থেকে অন্য বগিতে ঘুরে পান ও সিগারেট বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার কামালখানি বড়বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. নূরুল হক বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে বসবাস করেন। জীবনের দীর্ঘ সময় পার করেছেন ট্রেনে ট্রেনে ফেরি-দোকানদারি করে। সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে, শরীরের শক্তি কমেছে, বদলে গেছে জীবনের অনেক হিসাব-নিকাশ। কিন্তু বদলায়নি জীবিকা নির্বাহের সংগ্রাম। শরীর আর আগের মতো সায় না দিলেও পরিবারের ভরণপোষণের তাগিদে আজও হাতে তুলে নিতে হয় পান-সিগারেটের পসরা।
সম্প্রতি শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে ঢাকা মেইলের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে নিজের দীর্ঘ জীবনের গল্প তুলে ধরেন নূরুল হক। তার কথায় উঠে আসে কঠোর পরিশ্রম, আত্মসম্মানবোধ, জীবনের নানা পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব এবং বুকের গভীরে জমে থাকা কিছু নীরব আক্ষেপের কথা।
জীবনের দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে ট্রেনে ট্রেনে ফেরি দোকানদারি করছেন নূরুল হক। রেলপথের চলন্ত ট্রেন, যাত্রীদের ভিড় আর এক বগি থেকে অন্য বগিতে ঘুরে পণ্য বিক্রি করাই তার প্রতিদিনের কাজ। এভাবেই কেটেছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
এই দীর্ঘ সময়ে কত মানুষ দেখেছেন, কত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, তার হিসাব হয়তো তার নিজের কাছেও নেই। ট্রেনের যাত্রীরা কেউ তার কাছ থেকে পান কিনেছেন, কেউ সিগারেট নিয়েছেন, আবার কেউ হয়তো দেখেও না দেখার ভান করে চলে গেছেন। কিন্তু প্রতিটি দিন শেষে তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল-দিনের উপার্জন দিয়ে কীভাবে পরিবারের প্রয়োজন মেটানো যাবে।
এই পেশায় নেই নির্দিষ্ট মাসিক বেতন, নেই নিশ্চিত আয়ের নিশ্চয়তা। প্রতিদিনের পরিশ্রমের ওপরই নির্ভর করে উপার্জন। তারপরও অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমকে সম্বল করেই জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
জীবনের নানা দায়িত্বের মধ্যে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন নূরুল হক। সংসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করেছেন। বয়সের এই পর্যায়ে এসে শরীর আর আগের মতো কাজ করতে চায় না। দীর্ঘদিনের শ্রমের ক্লান্তি যেন শরীরজুড়ে। তবুও জীবিকার প্রয়োজনে ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই।
বয়স হয়েছে বলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি, শরীর দুর্বল হয়েছে বলে জীবনের প্রয়োজনও থেমে থাকেনি। তাই প্রতিদিন আবারও তাকে বের হতে হয় কাজের সন্ধানে। ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে পান-সিগারেট বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেন।
একজন মানুষের জীবনে ৭০ বছর বয়স যেখানে বিশ্রাম নেওয়ার সময় হতে পারে, সেখানে নূরুল হকের কাছে এই বয়সও উপার্জনের সংগ্রাম থেকে অব্যাহতি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়নি।
আলাপকালে নূরুল হক জানান, সরকারি সহায়তা কিংবা অন্য কারও দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করেই তিনি পরিবারের ভরণপোষণ করছেন। সৎপথে থেকে যতটুকু আয় করা যায়, তা দিয়েই চলতে চান তিনি।
তার কথায়, জীবনের গল্প বলে কী লাভ? জীবিকার জন্য প্রতিদিনই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। কারও কাছে কিছু চাইতে কিংবা নিজের কষ্টের কথা বলে সহানুভূতি আদায় করতে চান না তিনি। সৎভাবে উপার্জন করে বেঁচে থাকাই তার কাছে বড় কথা।
নূরুল হকের এই কথাগুলো যেন একজন শ্রমজীবী মানুষের আত্মসম্মানবোধেরই প্রতিচ্ছবি। অভাব কিংবা প্রতিকূলতার কাছে নিজেকে অসহায় হিসেবে তুলে ধরার পরিবর্তে তিনি বেছে নিয়েছেন শ্রমের পথ। তার কাছে উপার্জনের পরিমাণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই উপার্জন যেন আসে সৎপথে।
দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে একই পেশায় থেকে তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তা কেবল একটি জীবিকার গল্প নয়; বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের অবস্থান ধরে রাখার এক নিরন্তর প্রচেষ্টা।
আলাপের একপর্যায়ে নূরুল হক জানান, তার মতো আরও অনেকেই ট্রেনে উঠে ফেরি দোকানদারি করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে পেশা পরিবর্তন করে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। অনেকে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়েছেন, লাখপতি হয়েছেন এবং সুখ-শান্তিতে জীবনযাপন করছেন।
অন্যদের জীবনের এই পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে যেন এক ধরনের আক্ষেপের সুর অনুভূত হয়। দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে একই পেশায় শ্রম দিয়ে চলার পরও জীবনে কতটুকু পরিবর্তন এসেছে, সেই হিসাব হয়তো তাকে ভাবায়। যাদের সঙ্গে একসময় একই ধরনের কাজ করেছেন, তাদের কেউ কেউ আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করেছেন। আর তিনি এখনও জীবিকার তাগিদে ট্রেনের বগিতে বগিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

তবে অন্যদের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে কাউকে দোষারোপ করেননি তিনি। বরং সবকিছুকে ভাগ্যের বিষয় হিসেবে দেখেছেন। জীবনের এই তুলনা তার মনে যে কিছু না-পাওয়ার অনুভূতি তৈরি করেছে, তা তার কথার মধ্য দিয়েই কিছুটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এ আক্ষেপ শুধু অর্থনৈতিক সচ্ছলতার নয়; দীর্ঘ জীবনের পরিশ্রমের বিনিময়ে একটু স্বস্তিতে বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষাও হতে পারে। যে মানুষটি জীবনের ৪২টি বছর শ্রম দিয়ে কাটিয়েছেন, তার মনেও হয়তো কখনো প্রশ্ন জাগে-আর কত দিন এভাবে চলতে হবে?
জীবনের গল্পে নেই বড় কোনো দাবি, আছে সৎভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যয়
নূরুল হকের জীবনের গল্পে বড় কোনো প্রাপ্তির বর্ণনা নেই। নেই সম্পদ গড়ার সাফল্য কিংবা বিলাসী জীবনের স্বপ্ন পূরণের কথা। আছে কেবল কাজ করে যাওয়ার অভ্যাস, পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমে বেঁচে থাকার প্রত্যয়।
তিনি জানিয়েছেন, এভাবে ফেরি দোকানদারি করে চলতে পারায় তিনি আনন্দিত। তার এই সন্তুষ্টির মধ্যে যেমন রয়েছে নিজের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা, তেমনি রয়েছে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা।
জীবন তাকে হয়তো অনেক কিছু দেয়নি, কিন্তু তিনি নিজের শ্রমকে অবহেলা করেননি। বয়সের ভারে শরীর ক্লান্ত হলেও তার কর্মজীবনের গল্পে এখনও বিরতির সুযোগ আসেনি। প্রতিদিনের উপার্জনই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।
মো. নূরুল হকের মতো অসংখ্য মানুষ রয়েছেন, যারা জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে ছোট ছোট পেশার সঙ্গে যুক্ত থেকে পরিবার ও সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অবদান রাখছেন। তাদের শ্রম হয়তো বড় কোনো পরিসংখ্যানে উঠে আসে না, তাদের জীবনের গল্পও সচরাচর সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয় না। অথচ তাদের পরিশ্রমেই চলে অনেক পরিবার, পূরণ হয় নিত্যদিনের প্রয়োজন।
বিশেষ করে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়া শ্রমজীবী মানুষের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ কতটা রয়েছে, তা ভেবে দেখার অবকাশ আছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে শ্রম দিয়ে জীবন পার করেছেন, তাদের বার্ধক্যে ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
নূরুল হকের গল্প তাই কেবল একজন ফেরিওয়ালার ব্যক্তিগত জীবনের বর্ণনা নয়। এটি শ্রম, আত্মমর্যাদা, জীবনের অনিশ্চয়তা এবং বার্ধক্যে নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশার গল্প।
শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা চলন্ত ট্রেনের বগিতে ঘুরে বেড়ানো পান-সিগারেট বিক্রেতা নূরুল হককে দেখে হয়তো অনেকেই সাধারণ একজন ফেরিওয়ালা হিসেবেই ভাববেন। কিন্তু তার জীবনের পেছনে রয়েছে ৪২ বছরের শ্রম, দায়িত্ব পালনের ইতিহাস এবং নীরবে বয়ে চলা অসংখ্য অভিজ্ঞতা।
শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না, বয়সও কম হয়নি। তারপরও থেমে নেই তার পথচলা। কারণ জীবনের বাস্তবতা তাকে এখনও কাজ করতে বাধ্য করে। অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজের উপার্জনে বেঁচে থাকার যে প্রত্যয় তিনি ধারণ করেন, সেটিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
তার জীবনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়- মানুষের সাফল্য শুধু সম্পদ কিংবা অর্থের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। সৎভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা, দায়িত্ব পালনের নিষ্ঠা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও আত্মমর্যাদা ধরে রাখার মধ্যেও রয়েছে এক ধরনের মহত্ত্ব।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, জীবনের দীর্ঘ ৪২ বছর শ্রম দিয়ে কাটানো একজন মানুষকে কেন ৭০ বছর বয়সেও জীবিকার তাগিদে একইভাবে ছুটে চলতে হবে? তার মতো শ্রমজীবী মানুষের বার্ধক্য কি আরও একটু নিরাপদ, স্বস্তিময় ও মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে না?
মো. নূরুল হকের জীবনের গল্প সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে আসে-যে মানুষটি সারাজীবন নিজের শ্রমে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন, জীবনের শেষ অধ্যায়ে তার জন্য কি একটু স্বস্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়?
প্রতিনিধি/এসআই




