মাদারীপুরে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে একের পর এক অবৈধ প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বছরের পর বছর নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করায় এখানে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন রোগীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় সেবার নামে কোটি টাকার ব্যবসা চললেও কর্তৃপক্ষ দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন প্রতিষ্ঠানগুলো মালিকরা। যদিও শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানায় প্রশাসন।
সরেজমিনে দেখা যায়, টেকেরহাট জেনারেল হাসপাতাল। গোপালগঞ্জ-মাদারীপুরের সীমানাবর্তী রাজৈর উপজেলার টেকেরহাটে গড়ে উঠেছে এই বেসরকারি হাসপাতালটি। নিয়ম না মানায় ও শর্ত পূরণে গাফিলাথি থাকায় ২০২২ সালে এর লাইসেন্স বাতিল করে স্বাস্থ্য বিভাগ। অথচ, ৪ বছর ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্ন এক ভুতুড়ে পরিবেশের মধ্যেই চলছে হাসপাতালটির কার্যক্রম। সার্বক্ষনিক একজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও কক্ষে ঝুলছে তালা।
এদিকে পাঁচতলার মোড় এলাকায় লাইফ কেয়ার ডিজিটাল ল্যাব ও হাসপাতালের সেবা দেওয়া হচ্ছে দোতলার টিনশেট ঘরে। বাহিরে চকচকে সাইনবোর্ড সাটিয়ে সরকারি অনুমোদন ছাড়াই সুনামধন্য ডাক্তারের ছবি আর তথ্য দিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও এখানে বসেন না অনেক চিকিৎসক। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের কড়া নির্দেশনা রয়েছে টিনশেট ঘরে চলবে না কোনো স্বাস্থ্যসেবা। কিন্তু কে মানে এই নিয়ম।
একইভাবে টেকেরহাট বন্দরে গড়ে ওঠা এক ডজনের বেশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টারে না জেনেই সেবা নিতে আসছেন রোগীরা। এমন হাসপাতালের দৃশ্যমান অনিয়মের মধ্যেই লাইসেন্সের আবেদন করে মালিকপক্ষ। এ কারণে নবায়ন পেতে একাধিক দফতরের কাগজপত্র সংগ্রহে তৈরি হয় জটিলতা। এরপর অনেক ক্লিনিক মালিক লাইসেন্স পাওয়া নিয়ে যায় পিছিয়ে।
জানা যায়, মাদারীপুরের ৫টি উপজেলায় ৭১টি প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতালের মধ্যে লাইসেন্স আছে মাত্র ৭টির। অপরদিকে ১০৬টি ডায়গনস্টিক সেন্টারের মধ্যে অনুমতি নিয়ে চলছে ৭টির কার্যক্রম। লাইসেন্সছাড়া বছরের পর বছর এসব ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান চালু থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। ফলে প্রতিনিয়তই প্রতারিত হচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা।
টেকেরহাট জেনারেল হাসপাতালের স্টাফ সুজন মৃধা বলেন, ‘লাইসেন্স আছে কি নেই, সেটা আমরা কেউই বলতে পারি না। সেটি জানে মালিকপক্ষ। আমরা শুধু দায়িত্ব পালন করি।’
লাইফ কেয়ার ডিজিটাল ল্যাব ও হাসপাতালের পরিচালক মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের পূর্বেও লাইসেন্স ছিল। শুধু একবছর আমরা মালিকানা জটিলতায় লাইসেন্স করতে পারি নাই। বর্তমানে নতুন ভবনে হাসপাতালের পুরো কার্যক্রম চালানোর জন্য সরিয়ে নিচ্ছি। আগামীতে লাইসেন্স নবায়ন করা হবে।’
রোকেয়া হাসপাতাল ও মলি ডায়গনস্টিক সেন্টারের পরিচালক মলি আক্তার বলেন, ‘আমরা লাইসেন্স করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করছি। অনেক দফতরের কাগজ লাগে। এজন্য সময়ও লাগছে। হয়তো, আগামী মাসের মধ্যে লাইসেন্স নবায়নের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরে আবদেন করতে পারব।’
স্কয়ার ডায়গনস্টিক সেন্টারের সত্ত্বাধিকারী মন্টু বিশ্বাস বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানের বয়স একমাস। লাইসেন্স তো আকাশে থেকে পড়বে না। পেতে সময় লাগে। আমরাও চেষ্টায় আছি, দ্রুত লাইসেন্স করার জন্য।’
মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. শরিফুল আবেদিন কমল জানান, এসব অবৈধ ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে। এরইমধ্যে অনুমোদনহীন হাসপাতালের তালিকা করেছে জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ। উপজেলা ও জেলা প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার জানান, অবৈধভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান চলার সুযোগ নেই। লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক-হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টার বন্ধ করতে সিভিল সার্জনকে বলা হয়েছে। যদি ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজন হয়, তাহলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে জেলা প্রশাসন। কোনো অবস্থাতেই কাউকেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে দেওয়া হবে না।’
প্রতিনিধি/এসআই




