কারও কাছে একবেলা খাবার হয়তো খুব সাধারণ বিষয়, কিন্তু কারও জীবনে সেটিই দিনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। শেরপুরে এমন মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছেন একদল তরুণ। যারা প্রতিদিনই খাবার দিয়ে প্রায় শত মানুষের মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন।
করোনা মহামারির কঠিন সময়ে তরুণদের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল এই মানবিক কাজ। এজন্য তারা গড়ে তুলেছিলেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘নৃ ফাউন্ডেশন’। সেই ছোট উদ্যোগই এখন পেরিয়েছে ছয় বছর।
নৃ ফাউন্ডেশনের ‘অনাহারীর আহার’ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিদিন শেরপুরের বিভিন্ন এলাকার অসহায় মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে খাবার।
খাবার জোগাড়ে হিমশিম খাওয়া অসচ্ছল, আশ্রয়হীন ও কর্মক্ষমতা হারানো ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে একবেলার খাবার তুলে দেওয়ার এই কাজই হয়ে উঠেছে সংগঠনটির নিয়মিত মানবিক কার্যক্রম।
শেরপুর শহরের দারোগালী পার্কসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে দুপুরের দিকে দেখা যায় কর্মসূচিটির কার্যক্রম। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন মানুষ খাবারের জন্য আসেন।
তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বয়স্ক ব্যক্তি, দিনমজুর, পথশিশু ও বিভিন্ন কারণে অসহায় হয়ে পড়া মানুষ। খাবার বিতরণের নির্ধারিত সময়ের আগেই অনেকে এসে অপেক্ষা করেন।
দুপুর ২টার দিকে খাবার নিয়ে একটি ভ্যান পৌঁছালে শুরু হয় বিতরণ। প্রতিদিনের খাবারে থাকে ভাত, ডাল ও সবজি। পাশাপাশি পালা করে দেওয়া হয় ডিম, মাছ কিংবা মাংস।
খাবার সংগ্রহের সময় উপকারভোগীদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় থাকে। খাওয়া শেষে তাঁরা নিজেদের থালা পরিষ্কার করে নির্ধারিত স্থানে রেখে চলে যান।
সারা বছর নিয়মিতভাবে খাবার বিতরণ করাই ‘অনাহারীর আহার’ কর্মসূচির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বৃষ্টি, ঝড় কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ায়ও যথাসম্ভব কার্যক্রম চালু রাখে সংগঠনটি। মৌসুমভেদে কখনো খাবারের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ফলও দেওয়া হয়।
উপকারভোগীদের প্রয়োজন বিবেচনায় খাবার বিতরণের স্থানটির পাশেই একটি কক্ষ ভাড়া নেওয়া হয়েছে। সেখানে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে খাবার খেতে আসা মানুষ সহজেই পানি পান করতে পারেন।
এই উদ্যোগে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুবার্ষিকী, সন্তানের জন্মদিন কিংবা বিবাহবার্ষিকীর মতো বিশেষ দিনগুলোতে অনেকেই সংগঠনটির মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য খাবারের আয়োজন করেন। এতে ব্যক্তিগত আনন্দ কিংবা স্মরণীয় মুহূর্তকে অসহায় মানুষের সহায়তায় কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
খাবার নিতে আসা কয়েকজন উপকারভোগী জানান, শারীরিক অসুস্থতা, বয়স কিংবা কাজের অভাবে তাঁদের অনেকের পক্ষেই নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না।
নৃ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে তাঁরা প্রতিদিন অন্তত একবেলা পেট ভরে খেতে পারেন। তাঁদের ভাষ্য, প্রতিকূল আবহাওয়াতেও খাবারের ব্যবস্থা থাকায় দুশ্চিন্তা কিছুটা কমে।
নৃ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক রাজিব আহমেদ জানান, ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় লকডাউনে বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন। ওই পরিস্থিতিতে অসহায় মানুষের খাদ্যসংকট দেখে কয়েকজন তরুণ নিজ উদ্যোগে রান্না করা খাবার বিতরণ শুরু করেন।
মো. মাশরেকুল হক, মাজাহারুল হক ও রাজিব আহমেদসহ ১৫ থেকে ২০ জন তরুণের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগে তাঁরা নিজেদের অর্থ ব্যয় করে খাবার তৈরি ও বিতরণ করতেন।
পরে কাজটি আরও সংগঠিত করার প্রয়োজন দেখা দিলে গড়ে তোলা হয় নৃ ফাউন্ডেশন। একই বছরের ৮ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর থেকে নিয়মিতভাবে অসহায় মানুষের জন্য একবেলার খাবার সরবরাহ করে আসছে সংগঠনটি।
বর্তমানে শেরপুর শহরের মাধবপুর এলাকার একটি অস্থায়ী কার্যালয় থেকে সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান ও বিদেশে অবস্থানরত শুভাকাঙ্ক্ষীরাও এ উদ্যোগে সহযোগিতা করছেন। ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
সংগঠনটি ২১ সদস্যের কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম তদারকির জন্য রয়েছে সাত সদস্যের একটি কার্যকরী কমিটি।
নৃ ফাউন্ডেশনের কো-অর্ডিনেটর ফেরদৌসী আক্তার সীমা বলেন, ‘সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের প্রতিদিন পর্যাপ্ত খাবার জোটে না। তাঁদের খাদ্যসংকট কিছুটা কমিয়ে প্রতিদিন অন্তত একবেলা খাবার নিশ্চিত করতেই ‘অনাহারীর আহার’ কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।’
করোনা মহামারির দুঃসময়ে শুরু হওয়া ছোট্ট উদ্যোগটি এখন নিয়মিত মানবিক কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনের খাবার বিতরণের মধ্য দিয়ে নৃ ফাউন্ডেশন অসচ্ছল মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছে। সংগঠনটির এই কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও।
ক্ষুধার্ত মানুষের সব সমস্যা একবেলার খাবারে দূর হয় না। তবে নিয়মিত আহারের ব্যবস্থা তাঁদের দৈনন্দিন অনিশ্চয়তা কমাতে এবং কঠিন সময় পার করতে সহায়তা করে। শেরপুরে নৃ ফাউন্ডেশনের ছয় বছরের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য সেই মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা।
প্রতিনিধি/এএম




