চুরির অভিযোগে বাবাকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের পর রুটি-চা নিয়ে ছুটে এসে খাইয়েছিল ছোট্ট মেয়েটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই দৃশ্য এবার বদলে দিচ্ছে একটি পরিবারের ভাগ্য।
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারের সেই শিশুর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা। একই সঙ্গে শিশুটির বাবা রায়হানুল হক অনিক শিকদার স্বাভাবিক জীবনে ফিরলে তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
রোববার বিকেলে উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকায় ওই পরিবারটির খোঁজ নিতে যান ইউএনও মো. আলী সুজা। এ সময় তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং শিশুটির পড়াশোনাসহ পরিবারের সার্বিক বিষয়ে খোঁজ নেন।
ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, অনিক খারাপ অভ্যাস পরিবর্তন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলে তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেব। তার শিশু কন্যার লেখাপড়ার দায়িত্বও নিয়েছি।
সম্প্রতি বামরাইল বাজারে চুরির অভিযোগ তুলে রায়হানুল হক অনিক শিকদারকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধরের অভিযোগ ওঠে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। পরে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে অনিকের পরিবারের দাবি, তিনি চুরির সঙ্গে জড়িত নন। পূর্বশত্রুতার জেরে তাকে অপমান ও নির্যাতন করা হয়েছে।
ঘটনার পর অনিকের ছোট্ট মেয়ের বাবার প্রতি ভালোবাসার দৃশ্যটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, খুঁটির সঙ্গে বাঁধা বাবার কাছে গিয়ে তাকে রুটি ও চা খাওয়াচ্ছে শিশুটি। বাবার কষ্ট দেখে শিশুটির এই মমতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের আবেগাপ্লুত করে।
অনিকের মেয়ে বলে, ‘আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। বাবা কখনো চুরি করতে পারেন না।’
অনিকের স্ত্রীও দাবি করেন, তার স্বামী কোনোদিন চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তবে কয়েকজন বন্ধুর প্ররোচনায় তিনি একসময় মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে জানান তিনি। তার অভিযোগ, এই সুযোগ নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন তাকে নির্যাতন করে চুরির অপবাদ দিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রবাসফেরত ওমর খসরু তুহিন বলেন, পারিবারিকভাবে অনিক সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত পরিবারের সন্তান। তবে মাদকের কারণে তার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি শিক্ষিত ও মার্জিত ছেলে বলেও উল্লেখ করেন।
এদিকে ভাইরাল ভিডিওটি নজরে আসার পর ‘উই আর বাংলাদেশ’ (WAB) নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা শিশুটির খোঁজে ছুটে যান। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এস এম আকবর জানান, তারা অনিককে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করবেন।
তিনি জানান, অনিক গ্রামাঞ্চলে চলাচলের জন্য একটি অটোভ্যান চেয়েছেন। WAB Foundation-এর পক্ষ থেকে তাকে একটি অটোভ্যান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিশুটির লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ারও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তারা।
এস এম আকবর বলেন, অনিক ভুল-ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাভাবিক ও কর্মমুখী জীবনে ফিরতে চান। তাকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে তারা পাশে থাকবেন। এ বিষয়ে উজিরপুর থানা পুলিশের সঙ্গেও কথা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অনিকের পরিবারের ভাষ্য, অসুস্থ বাবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে অনিকও নানা সমস্যায় জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে তিনি কর্মহীন। এ অবস্থায় মেয়ের পড়াশোনা ও পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশ-বিদেশের অনেক মানুষ অনিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ছিচকে চুরির অভিযোগে শুক্রবার রাতে বামরাইল বাজারের একটি খুঁটির সঙ্গে রায়হানুল হক অনিক শিকদারকে বেঁধে নির্যাতন করেন স্থানীয় কয়েকজন। শনিবার ভোরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে তার ছোট্ট মেয়ে। সারারাত অনাহারে থাকা বাবার জন্য রুটি ও চা এনে নিজের হাতে খাইয়ে দেয় সে। এ দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়।
প্রতিনিধি/এলএ




