রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

পরিত্যক্ত স্টিল মিলস থেকে কেইপিজেড: ২০ বছরে ১৪ বিলিয়ন ডলারের রফতানি!

ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৩ এএম

শেয়ার করুন:

পরিত্যক্ত স্টিল মিলস থেকে কেইপিজেড: ২০ বছরে ১৪ বিলিয়ন ডলারের রফতানি!
কর্ণফুলী ইপিজেডে গড়ে উঠেছে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডসহ নানা প্রতিষ্ঠান

*কেইপিজেডে গড়ে উঠেছে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড নাইকি, আডিডাসের মতো প্রতিষ্ঠান

*রয়েছে পোর্টসওয়্যার, ক্যাম্পিং টেন্ট ও হাই-টেক গিয়ার, বাইসাইকেলসহ নানা পণ্যের কারখানা

*দেশের ৮০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান

*বিদেশি বিনিয়োগে আগ্রহ থাকলেও খালি নেই প্লট

এক সময় জমজমাট ছিল চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর পাশে গড়ে ওঠা জমিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান স্টিল মিলস। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৮০ দশক থেকে যেখানে শুরু হয় অস্থিরতা। এই অস্থিরতার মূলে ছিল শ্রমিকদের রাজনীতি। যারা দলীয় পরিচয়ে শ্রমিক সংগঠন সিবিএ‘র নামে নানা দাবি নিয়ে প্রায়ই আন্দোলন কর্মসূচি চালাত।

করত মিছিল-সমাবেশ ও কর্মবিরতি কর্মসূচি। কমেই শুরু হয় যন্ত্রাংশ চুরি ও পাচারসহ লুটপাট। যার ফলে কারখানাটি ক্রমেই লোকসানের মুখে পড়ে। এভাবে কালক্রমে বন্ধ হয়ে যায় এই স্টিল মিলস। মিলের যন্ত্রাংশে ধরে জং, শেড হয়ে পড়ে পরিত্যক্ত। আর সেই পরিত্যক্ত কারখানার জায়গায় গড়ে উঠে কর্ণফুলী রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল-কেইপিজেড।

যেখাানে গড়ে উঠে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড নাইকি, আডিডাস, জারা, পুমা ও এইচ অ্যান্ড এম, এর মতো প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলোর টেকনিক্যাল স্পোর্টসওয়্যার, ক্যাম্পিং টেন্ট ও হাই-টেক গিয়ার, বাইসাইকেল, সেফটি জুতা ও চামড়াজাত পণ্য তৈরির কারখানা।

The_state_owned_Steel_Mills_in_Chattogram_Patenga
কর্ণফুলী ইপিজেডে গড়ে উঠেছে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডসহ নানা প্রতিষ্ঠান। ছবি- ঢাকা মেইল

এসব কারখানায় অটোমেটেড মেশিনে তৈরি হচ্ছে দামি সব রফতানি পণ্য। যেখানে সরাসরি দেশের ৮০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আর এ পর্যন্ত রফতানি আয় হয়েছে ১৪.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সম্প্রতি এমন তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (বেপজা)-এর সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মোহাম্মদ তানভির হোসেন।

 

তিনি বলেন, ২০০৬ সালে যখন পতেঙ্গায় চট্টগ্রাম স্টিল মিলসের পরিত্যক্ত জমিতে এই ইপিজেড চালু করা হয়, তখন প্রথম বছরে মোট বিনিয়োগ এসেছিল মাত্র ১.৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অবকাঠামোগত সুবিধা, সরাসরি কর্ণফুলী নদী ও চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে অবস্থান এবং দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে দ্রুত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বড় গন্তব্যে পরিণত হয় কেইপিজেড।

আরও পড়ুন: সামুদ্রিক বাণিজ্যের নতুন হাব লালদিয়া, বিনিয়োগ ৫৫০ মিলিয়ন ডলার

দুই দশকের ব্যবধানে সেই প্রাথমিক বিনিয়োগ এখন ৭৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। বর্তমানে চীন, তাইওয়ান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ বিশ্বখ্যাত উদ্যোক্তাদের ৪০টি পূর্ণাঙ্গ কারখানা এখানে নিয়মিত পণ্য উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।

বিনিয়োগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেইপিজেড থেকে বিশ্ববাজারে রফতানি বৃদ্ধির চিত্রটি আরও বেশি ঈর্ষণীয়। শুরুর বছরে যেখানে রফতানি হয়েছিল প্রায় ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য। সেখানে গত ২০ বছরে কর্ণফুলী ইপিজেডের মোট রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৪.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক জানান, এই বিশাল রফতানি আয়ের সিংহভাগই এসেছে বিশ্বমানের প্রোডাক্ট ডাইভারসিফিকেশন বা পণ্যের বৈচিত্র থেকে। সাধারণ টি-শার্ট বা ট্রাউজার তৈরির গন্ডি পেরিয়ে কেইপিজেড এখন উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত হাবে রূপান্তরিত হয়েছে।

বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড যেমন, নাইকি, আডিডাস, জারা, পুমা ও এইচ অ্যান্ড এম, এর মতো প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলোর টেকনিক্যাল স্পোর্টসওয়্যার, ক্যাম্পিং টেন্ট ও হাই-টেক গিয়ার, বাইসাইকেল, সেফটি জুতা ও চামড়াজাত পণ্য এখন তৈরি হচ্ছে ইপিজেডে।

কর্ণফুলী ইপিজেডের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে ধরা হয় স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে এর ইতিবাচক প্রভাবকে। ২০০৬ সালে যখন উৎপাদন শুরু হয়, তখন পুরো ইপিজেডে শ্রমিক ও কর্মকর্তা মিলিয়ে মোট জনবল ছিল মাত্র ১৭৪ জন। দুই দশক পর আজ সেখানে সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের।

আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম বন্দরে একের পর এক কনটেইনার গায়েব, আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা

মাহবুব আহমেদ সিদ্দিকের মতে, কেইপিজেডের মোট ৮০ হাজার কর্মীবাহিনীর প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। কুমিল্লা, বরিশাল, নোয়াখালী, চাঁদপুর, রংপুর, খুলনাসহ চট্টগ্রাম উপকূলীয় এলাকার সুবিধাবঞ্চিত নারীরা এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী সামাজিক পরিবর্তন এনেছে নারীকর্মীদের বিশাল এই অংশগ্রহণ।

এর ফলে স্থানীয় হাউজিং, ব্যাংক, রিটেইল মার্কেট ও লজিস্টিকস খাত মিলিয়ে পরোক্ষভাবে আরও দেড় লাখের বেশি পরিবার অর্থনৈতিক সুরক্ষার আওতায় এসেছে বলে মত প্রকাশ করেছেন কর্ণফুলী ইপিজেডের অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ খালিদ চৌধুরী। তিনি বলেন, নির্মাণাধীন আরও ৫টি নতুন কারখানা চালু হলে মোট প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান দ্রুতই ১ লাখ ছাড়িয়ে যাবে।

The_state_owned_Steel_Mills_in_Chattogram_Patenga_1
কর্ণফুলী ইপিজেডে গড়ে উঠেছে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডসহ নানা প্রতিষ্ঠান। ছবি- ঢাকা মেইল

বেপজার নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) আনোয়ার পারভেজের ভাষ্য, কেইপিজেড দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে যে ব্রান্ড ইমেজ তৈরি করেছে তাতে প্রচুর আগ্রহ আছে। কিন্তু ইপিজেড এলাকায় এখন খালি কোনো প্লট নেই।

তাঁর মতে, দুই দশক আগে স্টিল মিলসের জায়গায় ইপিজেড গদে তোলা হলেও পরে তার আওতা বাড়েনি। কিন্তু জ্যামিতিক হারে বেড়েছে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রফতানি আয়। কেইপিজেডে বিদেশি বিনিয়োগ আগ্রহ থাকলেও কোনো প্লট খালি নেই। সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে ইপিজেডের পরিধি বাড়ানো হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চেহারা আরও পাল্টে যেত।

আরও পড়ুন: গাম থেকে ক্রিস্টাল মেথ, মাদকে ভাসছে চট্টগ্রাম

অর্থনীতিবিদদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে একটি পরিত্যক্ত জমি যে রাষ্ট্রের সম্পদে পরিণত হয়ে অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে কেইপিজেড তার বড় উদাহরণ। এমন পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। নিতে হবে নতুন উদ্যোগ।

উল্লেখ্য, বন্দরসংলগ্ন হওয়ার কারণে কাঁচামাল খালাস এবং ফিনিশড গুডস জাহাজীকরণে কেইপিজেড অনন্য সুবিধা পায়। সে সুবিধা আরও বাড়াতে হবে। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ও নদীর কাছাকাছি ভৌগোলিক সংযোগ ‘লিড-টাইম’ বা পণ্য সরবরাহের সময় আরও কমিয়ে আনার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

প্রতিনিধি/এএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর